Cvoice24.com
corona-awareness

১ টাকা আয় করতে ই-ভ্যালির ব্যয় সাড়ে ৩ টাকা!

সিভয়েস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৩:৫৪, ২২ জুন ২০২১
১ টাকা আয় করতে ই-ভ্যালির ব্যয় সাড়ে ৩ টাকা!

৪০৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা দেনার বিপরীতে কোম্পানিটির সম্পদের পরিমান কেবল ৬৫ কোটি ১৭ লাখ

গ্রাহক ও মার্চেন্টদের কাছে দেনার পরিমাণ ৪০৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অথচ কোম্পানিটির চলতি সম্পদের পরিমান কেবল ৬৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা, দিয়ে কোনো অবস্থাতেই কোম্পানিটির বিশাল এই দায় পরিশোধের সক্ষমতা নেই। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে দেওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গেল ১৪ মার্চ পর্যন্ত পণ্যমূল্য বাবদ গ্রাহকদের কাছ থেকে অগ্রিম ২১৩ কোটি ৯৪ লাখ টাকা নিয়ে পণ্য সরবরাহ করেনি ই-ভ্যালি। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটি যেসব কোম্পানির কাছ থেকে পণ্য কিনে ওইসব মার্চেন্টদের কাছে তাদের বকেয়া ১৮৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ, ই-ভ্যালির সব চলতি সম্পদ দিয়ে গ্রাহক ও মার্চেন্টদের বকেয়া অর্থের মাত্র ১৬ দশমিক ১৪ শতাংশই পরিশোধ করা সম্ভব হবে। অপরিশোধিত থেকে যাবে ৩৩৮ কোটি ৬২ লাখ টাকার সমপরিমাণ দায়।  
 
‘ই-ভ্যালির চলতি দায় ও লোকসান দুটিই ক্রমান্বয়ে বাড়ছে এবং কোম্পানিটি চলতি দায় ও লোকসানের দুষ্টচক্রে বাঁধা পড়েছে’ উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, ‘ক্রমাগতভাবে সৃষ্ট দায় নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব টিকে না থাকার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।’

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে সম্প্রতি ই-ভ্যালি ডটকমের উপর পরিচালিত বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পরিদর্শন রিপোর্টে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গত বৃহস্পতিবার প্রতিবেদনটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের ছয়জন কর্মকর্তার একটি দল পাঁচ দিনব্যাপী এই পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনা করে। 

বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, কোম্পানিটি শুরু থেকেই লোকসান করে আসছে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ই-ভ্যালি পূর্বের দায় পরিশোধ এবং লোকসান আড়াল করার জন্য বিভিন্ন আকর্ষণীয় অফারের (যেমন-সাইক্লোন, আর্থকোয়েক ইত্যাদি নামে মূলত ব্যাপক হ্রাসকৃত মূল্যে বা লোকসানে পণ্য সরবরাহ) মাধ্যমে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করে তাদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করছে। 

প্রতিষ্ঠানটির সম্পদ ও দায়ের ব্যবধান অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ক্রমাগত নতুন দায় সৃষ্টির মাধ্যমে পুরাতন দায় পরিশোধের ব্যবস্থা করে যাচ্ছে। এ জন্য নতুন গ্রাহক আকৃষ্ট করতে আরও অধিক হারে ডিসকাউন্ট বা অফার করে যাচ্ছে। এতে সম্পদ ও দায়ের ব্যবধান আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অনলাইনভিত্তিক কোম্পানিটির মোট গ্রাহক সংখ্যা ৪৪ লাখ ৮৫ হাজার ২৩৪ জন। ক্রয়াদেশ বাতিল, ই-ভ্যালির দেওয়া ক্যাশব্যাক, বিক্রিত গিফটকার্ডের সমন্বয়ে এসব গ্রাহকদের প্রতিষ্ঠানটির ভার্চুয়াল আইডিতে (একাউন্ট, হোল্ডিং, গিফটকার্ড, ক্যাশব্যাক) মোট ৭৩ কোটি ৩৯ লাক টাকা মূল্যমানের ই-ভ্যালু সংরক্ষিত ছিল। অথচ ওইদিন শেষে ই-ভ্যালি ডটকম লিমিটেডের ১০টি ব্যাংক হিসাবে জমা ছিল কেবল ২ কোটি ৪ লাখ টাকা।

ই-ভ্যালি ডটকম লিমিটেডের কর্মকাণ্ডে সার্বিকভাবে দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিবেদনে তারা উল্লেখ করেছে, লোকসানে পণ্য বিক্রির কারণে ই-ভ্যালি গ্রাহকের কাছ থেকে অগ্রিম মূল্য নেওয়ার পরও মার্চেন্টদের কাছে অস্বাভাবিকভাবে বকেয়া বাড়ছে। বিপুল পরিমাণ লোকসানে পণ্য বিক্রির ফলে ই-কমার্স ব্যবসায় অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে, যা অন্য কোম্পানিগুলোকেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণে উৎসাহিত করবে। ফলে ভালো ও সৎ ই-কমার্স ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং এক সময় এইখাতের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাবে। 

গ্রাহক ও মার্চেন্টের বকেয়া ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় এক সময় বিপুল সংখ্যক গ্রাহক ও মার্চেন্টের পাওনা অর্থ না পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে এবং এর ফলে সার্বিকভাবে দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও জানায় বাংলাদেশ ব্যাংক।  

ক্রয়াদেশ প্রাপ্তির ৪৫ কর্মদিবসের মধ্যে পণ্য সরবরাহে ব্যর্থ হলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে গ্রাহককে তার পরিশোধিত হ্রাসকৃত মূল্যের পরিবর্তে পণ্যটির বাজার মূল্য (যা পরিশোধিত মূল্য অপেক্ষা অধিক) ফেরত দিয়ে তা বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার করে ই-ভ্যালি। এর ফলে বিপুল সংখ্যক গ্রাহক লোভনীয় মূল্যছাড়ে পণ্য বা পরিশোধিত অর্থ থেকে অনেক বেশি অর্থ ফেরত পাওয়ার আশায় ই-ভ্যালির প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে বলেও মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তাই পণ্যমূল্যের অগ্রিম হিসাবে সাধারণ গ্রাহকের বিপুল অর্থ ব্যবহার করে উচ্চ ডিসকাউন্ট প্রদানের মাধ্যমে ই-ভ্যালি গ্রাহকের অর্থ ঝুঁকিতে ফেলেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।  
 
১ টাকা আয় করতে ৩.৫৭ টাকা ব্যয়
২০২০ সালের জুলাই থেকে গত ১৪ মার্চ পর্যন্ত ই-ভ্যালির মোট আয় (রেভিনিউ) ২৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। এই সময়ে কোম্পানিটির সেলস ব্যয় ২০৭ কোটি টাকা। এ তথ্য উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, কোম্পানিটি প্রতি ১ টাকা আয়ের জন্য ৩ টাকা ৫৭ পয়সা বিক্রয় ব্যয় করেছে বলে স্টেটমেন্টে প্রদর্শন করেছে। এই অস্বাভাবিক ব্যয়ের বিষয়ে সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়নি।

২০১৭-১৮ অর্থবছর ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরুর বছর থেকেই ই-ভ্যালি লোকসানে রয়েছে এবং দিন দিন এর লোকসান বাড়ছে। প্রথম বছর কোম্পানিটির নিট লোকসান ছিল ১ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। গত ১৪ মার্চে কোম্পানিটির পুঞ্জিভুত লোকসান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো কোম্পানি কার্যক্রম শুরুর পর প্রাথমিক অবস্থায় কিছু লোকসান দিতে পারে কিন্তু অল্প মূলধন নিয়ে ক্রমাগতভাবে লোকসান দিয়ে গ্রাহক সংখ্যা বৃদ্ধি ও নতুন করে দায় সৃষ্টির মাধ্যমে পুরনো দায় পরিশোধ করা কোম্পানিটির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার অন্যতম ঘাটতি নির্দেশ করে। অদূর ভবিষ্যতে এই পরিমাণ দায়দেনা কাটিয়ে উঠার কোনো গ্রহণযোগ্য পরিকল্পনা বা সম্ভাবনা পরিদর্শনকালে পরিলক্ষিত হয়নি। ফলে ক্রমাগতভাবে সৃষ্ট দায় দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব টিকে না থাকার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, গ্রাহকের কাছ থেকে পণ্যমূল্যের অগ্রিম হিসেবে নেওয়া অর্থ কোনোরূপ লাভ-ক্ষতি বা কমিশন হিসাবায়ন ছাড়াই ই-ভ্যালি উচ্চ হারে পরিচালন ও বিপণনে ব্যয় করছে। অগ্রিম টাকা পেতে হ্রাসকৃত মূল্যে পণ্য সরবরাহ করা এবং কোম্পানির আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিহীন ব্যয়ের কারণে বিপুল পরিমান লোকসানের সৃষ্টি হয়েছে। 
 
অনুসন্ধানে ই-ভ্যালির অসহযোগিতা
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দল গত ১৪ মার্চ ই-ভ্যালি ডটকম লিমিটেডের কার্যালয়ে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ রাসেলসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা শেষে পরিদর্শন কাজ শুরু করে। ই-ভ্যালির আর্থিক ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য সরবরাহ এবং পরবর্তী চার দিনের কর্মসূচি সম্পর্কে অবহিত করে মোহাম্মদ রাসেলের সহায়তা চান বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তারা। কিন্তু বার বার সময় নিয়েও আর্থিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য পরিদর্শক দলকে সরবরাহ করতে সামর্থ্য হয়নি প্রতিষ্ঠানটি।  

২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২১ এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় গ্রাহকের সংখ্যা, ক্রয়াদেশের পরিমান, ক্রয়াদেশ বাবদ গ্রাহকের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের পরিমান, সরবরাহ পণ্যের মূল্য, বাতিল ক্রয়াদেশের পরিমান, বাতিল ক্রয়াদেশের বিপরীতে রিফান্ডের পরিমান, মার্চেন্টকে পরিশোধ করা অর্থের পরিমান, মার্চেন্টের কাছে বকেয়া, ই-ভ্যালির প্রাতিষ্ঠানিক খাতওয়ারী আয়-ব্যয়, পরিশোধিত কর, মুনাফা, ক্রয়-বিক্রয়, মূল্যছাড় ও লাভক্ষতি সম্পর্কিত মাসভিত্তিক তথ্যও সরবরাহ করেনি ই-ভ্যালি। অথচ এসব তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সঠিক চিত্র পাওয়া যেত বলে জানায় বাংলাদেশ ব্যাংক। 

প্রতিবেদনে এও উল্লেখ করা হয়, আর্থিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত তথ্যাদি সংগ্রহ এবং ই-ভ্যালির সরবরাহ করা তথ্য যাচাইয়ের জন্য রেপ্লিকা ডাটাবেজে অনুসন্ধান চালানোর সুযোগ চাওয়া হয়। ওই অনুরোধের প্রেক্ষিতে অল্প সময়ের জন্য সুযোগ দিলে গ্রাহক ও তাদের ই-ভ্যালি ভার্চুয়াল আইডি সম্পর্কিত কিছু তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এরপরে পরিদর্শন দলকে রেপ্লিকা ডাটাবেজে কোনো প্রকার অনুসন্ধান চালানোর সুযোগ দেওয়া হয়নি। মূলত প্রতিষ্ঠানটির আইসিটি সিস্টেমের সীমাবদ্ধতা, মাসভিত্তিক ও পুরাতন ডাটা না থাকা, নিয়মিত হালনাগাদ না করা এবং এর ফলে আইসিটি সিস্টেমে সংরক্ষিত ডাটার সঙ্গে পরিদর্শন দলকে সরবরাহ করা ডাটায় বিস্তর পার্থক্য থাকার বিষয়টি পরিদর্শন দলকে মৌখিকভাবে জানিয়েছে ই-ভ্যালি কর্তৃপক্ষ। তবে এসব সন্তোষজনক নয় বলে জানায় বাংলাদেশ ব্যাংক। 

সূত্র : দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড

Add

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়