Cvoice24.com

চালের বাজারে অস্থিরতা, মজুদের কারণেই লাগামহীন দাম

সিভয়েস প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২২:০৯, ১৭ মে ২০২২
চালের বাজারে অস্থিরতা, মজুদের কারণেই লাগামহীন দাম

মজুদের কারণেই লাগামহীন দাম।

 # শিল্পপতিদের দুষলেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা

গত বছর থেকেই অস্থির চালের বাজার। বছরের ব্যবধানে দফায় দফায় বেড়েছে চালের দাম। এত বছর মিল মালিকরা চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করলেও সেখানে এখন আধিপত্য বিস্তার করছে বড় বড় শিল্পগ্রুপ। প্যাকেটজাত চাল বিক্রি করার উদ্দেশে মিলারদের কাছ থেকে চাল কিনে মজুদ করছে তারা। এ কারণে সরবরাহ থাকলেও চালের বাজার নিয়ন্ত্রণহীন বলে দাবি করছেন চট্টগ্রামের পাইকারি ব্যবসায়ীরা। এর প্রভাবে সব ধরনের চালের বস্তায় ৩শ’ থেকে ৫শ’ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। আর এর প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে। চালের বাজার নিয়ন্ত্রণহীন হওয়ায় ভবিষ্যতে চালের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

চালের বাজারের বর্তমান অবস্থা নিয়ে কথা হয় চট্টগ্রাম নগরের পাহাড়তলী বাজারের আজিজ স্টোরের মালিক মো. আজিজের সঙ্গে। এসময় চালের বাজারের অবস্থা ভালো নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতদিন চালের বাজারদর এমনিতেই বাড়তি ছিল। তার উপর দু’দিন আগে নতুন করে বস্তায় ২৫০ থেকে ৫শ’ টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন হারে চালের দাম বেড়েছে। চালের বাজার এখন মিল মালিক ও বড় বড় শিল্প গ্রুপগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে। সয়াবিন, চিনির মত এখন চালও মজুদ হচ্ছে। এ কারণে চালের বাজার দিনে দিনে লাগামহীন হয়ে পড়ছে।

চট্টগ্রামের ব্যবসার প্রাণকেন্দ্র নগরের চাক্তাই চালপট্টির ব্যবসায়ী এম সরোয়ার আলম চৌধুরীর সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, বাজারে যে হারে চালের দাম বাড়ছে সে হারে ধানের দাম বাড়েনি।  এ কারণে ধানের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে বাজারে অনেক কৃষক হা-হুতাশ করছেন।

তিনি আরও বলেন, সবকিছুর দাম বেড়ে গেছে। চালের দামইবা আর বাকি থাকবে কেন? বাজারে পর্যাপ্ত চালের সরবরাহ আছে। কিন্তু আমরা মিলারদের কাছ থেকে বেশি দামে চাল কিনে আনছি; তাই বেশি দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। এখানে আমাদের কিছু করার নাই। সাধারণ মানুষ মোটা চাল খেয়ে বেঁচে থাকে। সে মোটা চালের দামই বেড়েছে বস্তায় ২৫০ টাকা। চিনিগুঁড়া ও সব ধরনের আতপ চালের দাম বেড়ে গেছে।

বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে নগরের বিভিন্ন চালের বাজারে ঘুরে দেখা যায়, দু’দিনের ব্যবধানে পাইকারি বাজারে চিনিগুঁড়া চালের দাম বেড়েছে ৫শ’ টাকা। অন্যান্য চালে গড়ে ৩শ’ টাকা করে দাম বেড়েছে। দু’দিন আগে ২ হাজার ৭শ’ টাকায় বিক্রি হওয়া জিরাশাইল ৩ হাজার টাকায়, ১ হাজার ৯৫০ টাকায় বিক্রি হওয়া পাইজাম স্বর্ণা ২ হাজার ২৫০ টাকায়, ১ হাজার ৭শ’ টাকায় বিক্রি হওয়া মোটা চাল ১ হাজার ৯শ’ টাকায়, ১ হাজার ৯৫০ টাকায় বিক্রি হওয়া পারিজা এখন ২ হাজার ২৫০ টাকায়, ২ হাজার ৫০ টাকায় বিক্রি হওয়া মিনিকেট সিদ্ধ ২ হাজার ৩৫০ টাকায় ও বস্তায় ৫শ’ টাকা বেড়ে চিনিগুঁড়া ৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

চালের পাইকারি ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে বলেন, বড় শিল্প গ্রুপগুলো চালের বাজারে একচেটিয়া ব্যবসা শুরু করেছে। এভাবে শিল্প গ্রুপগুলোর একচেটিয়া ব্যবসা চলতে থাকলে পুরো চালের বাজার একটা সময় তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। যদিও চালের বাজার পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজার। কিন্তু শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর একচেটিয়া ব্যবসার কারণে ক্ষতির মুখ দেখবেন পাইকারী ব্যবসায়ীরা।

এভাবে হুট করে দাম বাড়া প্রসঙ্গে পাহাড়তলী বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এসএম নিজাম উদ্দিন সিভয়েসকে বলেন, দেশের অবকাঠামো তো ভেঙ্গে গেছে। প্রশাসনের যে ভূমিকা থাকার কথা তা কিন্তু নেই। অন্যান্য চালের বস্তায় দু’দিনের ব্যবধানে ৩শ’ টাকা বেড়েছে। চিনিগুঁড়া চালের দাম বস্তায় বেড়েছে ৫শ’ টাকা। সব ধরনের চালের দাম আরও বাড়বে। চিনি, সয়াবিনের ভালো সরবরাহ থাকলেও তা মজুদের কারণে দাম বেড়ে গেছে। ঠিক তেমনি আগে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতো মিল মালিকরা। আমরা মিলারদের কাছ থেকে পাইকারিতে চাল কিনে খুচরা ও সরাসরি ভোক্তার কাছে চালের যোগান দিয়ে আসছি। এখন সেখানে বড় বড় শিল্প গ্রুপ ঢুকে গেছে। তারা প্যাকেটজাত করে বিক্রি করার জন্য চাল মজুদ করে ফেলছে। ফলে মিল পর্যায়ে দাম বেড়ে যাচ্ছে। একদিকে আমরা বাড়তি দরে চাল কিনে তা বাড়তি দরে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি। অন্যদিকে বড় শিল্পগ্রুপগুলো কম দামে চাল কিনে তা প্যাকেটজাত করে চড়া দামে চাল বিক্রি করছে। বড় শিল্প গ্রুপের মজুদ প্রবণতা না কমাতে পারলে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে আসবে না। বরং এখন আমরা যে পরিস্থিতি দেখছি তাতে মনে হচ্ছে চালের দাম আরও বাড়বে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম সূত্রে জানা গেছে, ২০২১-২২ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রামে ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৪০ হেক্টর জমিতে হাইব্রিড ও উফশী জাতের রোপা আমন জাতের ধান চাষ হয়। বিগত নয় মাসে এসব জমিতে ২৫ হাজার ৭২৪ মেট্রিকটন হাইব্রিড ও ৪ লাখ ৪৩ হাজার ৪১ মেট্রিকটন উফশী জাতের ধান উৎপাদন করা হয়। এদিকে কক্সবাজারে ৭৬ হাজার ৪৪১ হেক্টর জমিতে ১১ হাজার ৩৩৯ মেট্রিকটন হাইব্রিড ও ২ লাখ ১২ হাজার ৪৩২ মেট্রিকটন উফশী জাতের ধান চাষাবাদ করা হয়। তাছাড়া চলতি অর্থ বছরের বিগত দশ মাসে চট্টগ্রামে ৬৫ হাজার ৫৯৩ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষাবাদ করা হয়েছে।

এদিকে কৃষকদের সঠিকভাবে ধান চাষ করতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে সার বরাদ্দ ও বিতরণ করা হচ্ছে। গত এপ্রিল মাসে চট্টগ্রামের কৃষকদের ধান চাষের জন্য ১ হাজার ৪১২ মেট্রিকটন ইউরিয়া, ১ হাজার ১০৭ মেট্রিকটন টিএসপি, ১ হাজার ২৭৭ মেট্রিকটন ডিএপি, ৪৩৮ মেট্রিকটন এমওপি সার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। অপরদিকে কক্সবাজারের কৃষকদের জন্য ৩১৬ মেট্রিকটন ইউরিয়া, ১১৮ মেট্রিকটন টিএসপি, ১৭৩ মেট্রিকটন ডিএপি, ১১৮ মেট্রিকটন এমওপি সার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মো. মোফাজ্জল করিম সিভয়েসকে বলেন, চট্টগ্রামে খরিপ ১ ও খরিপ ২ মৌসুমে রোপা আমন, বোনা আমন উৎপাদন করা হয়ে থাকে। বর্তমানে চট্টগ্রামের বিভিন্ন জমিতে ২৭ জাতের হাইব্রিড ও ৫৩ জাতের উফশী জাতের ধান চাষাবাদ করা হচ্ছে। আমরা কৃষকদের কাছে সার সরবরাহ ও বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছি। সবমিলিয়ে চট্টগ্রামে ধানের উৎপাদন বেড়েছে এবং আমরা সব ধরনের সহযোগিতা করে যাচ্ছি।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. আনিছুর রহমান সিভয়েসকে বলেন, ভোক্তার অধিকার রক্ষা করাই আমাদের কাজ। আমরা নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। প্রতিদিন অভিযান পরিচালনা করছি। অভিযোগ পেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। পাশাপাশি অসাধু ব্যবসায়ীদের শাস্তির আওতায় আনছি। এত সয়াবিন তেল আমদানির পরেও ক্রেতা বাজারে সয়াবিন তেল খুঁজে পেতেন না। পেলেও বাড়তি দাম দিয়ে কিনেছেন। তখনই আমরা অভিযান পরিচালনা করে বিপুল পরিমাণে তেল উদ্ধার করেছি। তেলের মত চাল মজুদ করে বাজার পরিস্থিতি খারাপ করতে চাইলে আমরা অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।

কনজ্যুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ চট্টগ্রাম অঞ্চলের ভাইস-প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন সিভয়েসকে বলেন, বাজারে কোন পণ্যই ক্রেতার নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নেই। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বিভিন্নভাবে চাল, সয়াবিন, চিনিসহ বিভিন্ন পণ্য মজুদ করে বাজার দর বাড়িয়ে দিচ্ছেন। কারা চালের বাজার অস্থির করে তুলছে, সমস্যাটা আসলেই কোথায়? সেটা আগে খুঁজে বের করতে হবে। পাশাপাশি প্রশাসন ও সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলকে আরও বেশি কঠোর হতে হবে।

-সিভয়েস/টিএম

Add

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়