Cvoice24.com

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে বন্যায় নিহত বেড়ে ৯৫, নিখোঁজ কয়েকশ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২১:৩৬, ২৬ আগস্ট ২০২৬
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে বন্যায় নিহত বেড়ে ৯৫, নিখোঁজ কয়েকশ

নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯৫ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন কয়েকশ মানুষ। নিখোঁজদের মধ্যে ৩৮৪ জন পর্যটক রয়েছেন, যাঁদের ২৯১ জন বিদেশি নাগরিক। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে উদ্ধার তৎপরতা ব্যাহত হচ্ছে।

বুধবার (২৬ আগস্ট) নেপালের রাসুয়া ও আশপাশের এলাকায় ভোতে কোশি নদীতে হিমালয় থেকে বরফ ও পাথরের বিশাল ধস নামার পর আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়। এতে বাড়িঘর, সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও বিবিসির প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

নেপাল পর্যটন বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিকমত সিং আয়র বিবিসি নেপালিকে জানান, নিখোঁজ পর্যটকদের মধ্যে ৩৮৪ জনের তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাদের মধ্যে ২৯১ জন বিদেশি এবং ৯৩ জন নেপালি নাগরিক।

বিদেশি পর্যটকদের বড় একটি অংশ তিব্বতের কৈলাশ-মানস সরোবরের উদ্দেশে যাচ্ছিলেন বলে জানা গেছে। নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ১০৫ জন ভারতীয়, ৩৭ জন অনাবাসী ভারতীয়, ১৭ জন মালয়েশীয়, ১২ জন ব্রিটিশ, ৪ জন দক্ষিণ আফ্রিকান, ৩ জন মার্কিন, একজন অস্ট্রেলীয় ও একজন ডাচ নাগরিক রয়েছেন। আরও ১১১ জন নিখোঁজ ব্যক্তির জাতীয়তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

দক্ষিণ কোরিয়ার বার্তা সংস্থা ইয়োনহাপ জানিয়েছে, ওই এলাকায় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কাজ করা অন্তত আটজন দক্ষিণ কোরীয় নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল সংসদে জানিয়েছেন, স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটের দিকে ওই এলাকায় ভূমিকম্প হয়। এর ফলে হিমবাহে ধস নেমে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হতে পারে।

জার্মান রিসার্চ সেন্টার ফর জিওসায়েন্সেস (জিএফজেড) জানিয়েছে, নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে দেখা ঘটনার প্রায় সাত মিনিট আগে ওই অঞ্চলে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়েছিল।

তবে কাঠমান্ডুভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের বিশেষজ্ঞদের মতে, নেপালের অংশে লেন্দে খোলা নদীতে বরফ-পাথরের ধসই বন্যার সম্ভাব্য কারণ। বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়।

জলবায়ু ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিভাগের প্রধান চিয়াংগং ঝাং বলেন, নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী নদীর উজানে এখনো ধ্বংসাবশেষ জমে আছে। ফলে দ্বিতীয় দফায় বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।

২০ মেগাওয়াটের লাংটাং খোলা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ৬০ কর্মীর সঙ্গেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। প্রকল্পের উদ্যোক্তা বিজয় মোহন ভট্টরাই জানান, তাদের মধ্যে ২৫ জন প্রকৌশলী, চালক ও রান্নাঘরের কর্মী এবং ৩৫ জন সুড়ঙ্গের ভেতরে কাজ করছিলেন।

এ ছাড়া তিমুরে রাসুয়া কাস্টমস কার্যালয়ের ১৫ কর্মী নিখোঁজ রয়েছেন।

নেপাল পুলিশের হিসাবে, রাসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং ও গোর্খাসহ বিভিন্ন এলাকায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। পরে হালনাগাদ তথ্যে মৃতের সংখ্যা ৯৫ জনে পৌঁছেছে।

নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজরাম বসনেত জানিয়েছেন, বন্যায় আটকে পড়া ৮৮ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। মাইলুং গ্রামের আরও ১১৫ জনকে উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ১৩ জনকে কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্যদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

উদ্ধার অভিযানে ১২ থেকে ১৫টি হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্যে নেপাল সেনাবাহিনীর চারটি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হেলিকপ্টার রয়েছে। ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে রাসুয়ার উদ্দেশে বেশ কয়েকটি সামরিক ও বেসরকারি হেলিকপ্টার পাঠানো হয়েছে। তবে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ত্রাণসামগ্রী নিয়ে যাওয়া কয়েকটি হেলিকপ্টার ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছে।

নেপালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদান গুরুং ও সংস্কৃতি, পর্যটন ও বেসামরিক বিমান চলাচলমন্ত্রী খড়ক রাজ পাউডেল ত্রিভুবন বিমানবন্দর থেকে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম সমন্বয় করছেন।

নেপালের অংশে ধসের পর চীনের তিব্বতের জিরং বন্দরেও এর প্রভাব পড়েছে। চীনের সরকারি বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, এতে শিগাৎসে অঞ্চলের সড়ক, যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, জিরং সীমান্তে ৫৭৪ জন উদ্ধারকর্মী পাঠানো হয়েছে। তবে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে সড়কে জমে থাকা প্রায় দেড় মিটার গভীর কাদা-পাথরের কারণে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগছে।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিখোঁজদের উদ্ধারে ‘সর্বাত্মক’ অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি দ্বিতীয় দফার বিপর্যয় ঠেকাতে নজরদারি ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদারের নির্দেশ দিয়েছেন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জানিয়েছেন, মানবিক সহায়তা দিতে ভারত প্রস্তুত। দুই দেশের সংশ্লিষ্ট দলগুলো উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সমন্বয় করছে।

নেপালের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বন্যায় প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। এটি দেশটির মোট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতার ১২ শতাংশের বেশি।

রাসুয়ার স্বাস্থ্যকর্মী তুলা বাহাদুর বিকের ভাষায়, বন্যাদুর্গত এলাকায় ‘যেদিকে তাকানো যায়, শুধু ধ্বংসস্তূপ’। নদীর পাশের বসতিগুলো পুরোপুরি ভেসে গেছে এবং তাঁর পাঁচজন আত্মীয়ও নিখোঁজ রয়েছেন।

জেলা প্রশাসক নরেন্দ্র পারিয়ার ভোতে কোশি নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদের উঁচু স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি আরও বড় ধরনের প্রাণহানি ও সম্পদহানির আশঙ্কা করছেন।

তিব্বত থেকে উৎপন্ন ভোতে কোশি নদী নেপালে প্রবেশ করে ত্রিশূলী নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। পরে ত্রিশূলী নদী গণ্ডক নামে ভারতে প্রবেশ করেছে। বন্যার আশঙ্কায় নেপাল সীমান্তবর্তী ভারতের উত্তর প্রদেশ ও বিহারেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

গত বছরও ভোতে কোশি নদীতে বন্যায় নয়জন নিহত ও ২৪ জন নিখোঁজ হয়েছিলেন। সে সময় নেপাল-চীন সীমান্তের মৈত্রী সেতু ভেসে যাওয়ায় কয়েক মাস দুই দেশের বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছিল।