Cvoice24.com

১৪ দিনে ১৪ রুম বদলে কারাগারে করোনা নিয়ন্ত্রণ! 

সিভয়েস প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৫:৪০, ২১ এপ্রিল ২০২১
১৪ দিনে ১৪ রুম বদলে কারাগারে করোনা নিয়ন্ত্রণ! 

করোনা ভাইরাস ঠেকাতে সামাজিক দূরত্ববিধি মানতে সরকার যেখানে জোর দিচ্ছে সেখানে এক জনের জায়গায় তিন জন গাদাগাদি করে থাকার পরও সেভাবে করোনার সংক্রমণ হয়নি চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে। ধারণ ক্ষমতার তিনগুণ বন্দি নিয়ে চলা কারাগারের অভ্যন্তরে এ পর্যন্ত কেউ করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাননি। তবে গত বছর উপসর্গ নিয়ে এক হাজতি ও সম্প্রতি চট্টগ্রাম মেডিকেলে চিকিৎসাধীন এক হাজতি করোনায় মারা যান। এছাড়া দুই ডেপুটি জেলার ও কারা হাসপাতালের এক নার্স আক্রান্ত হয়েও সুস্থ হয়ে উঠেছেন। এর বাইরে কারা কর্তৃপক্ষ ও হাজতি মিলে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার মানুষের এ কারাগারে কেউ করোনা আক্রান্ত হননি চট্টগ্রামে করোনা আসার পর থেকে গত তের মাসে। 

কীভাবে করোনার সংক্রমণ ঠেকানো হচ্ছে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কারাগারের জেলার দেওয়ান তারিকুল ইসলাম গত সোমবার (১৯ এপ্রিল) সিভয়েসকে বলেন, ‘আদালত হয়ে নতুন কোনো হাজতি কারাগারে আসলেই তাকে প্রথমে আলাদা করা হয়। কারো সাথে তাকে মিশতে দেয়া হয় না। কারাগারের প্রথম ফটকে চিকিৎসক নতুন হাজতিকে চেকআপ করেন। করোনার লক্ষণ থাকলে সাথে সাথেই তাকে সেল্ফ কোয়ারান্টাইনে রাখা হয়। তাপমাত্রাসহ সব কিছু স্বাভাবিক থাকলেও তাকে কোয়ারান্টাইনের জন্য নির্ধারিত হালদা ভবনের পাঠানো হয়। সেখানে ১৪টি পৃথক রুম করা রয়েছে। নতুন হাজিত একেক দিন একেক রুমে থাকবেন। সেখানে যদি কারো শরীর খারাপ হয় তাহলে সে পরবর্তী রুমে যেতে পারবে না। প্রতিদিনই শরীরের তাপমাত্রা পরিমাপসহ সুস্থতা যাচাই করে এরকম পালা করে প্রতিদিন ১, ২,৩ নম্বর করে রুম পরিবর্তন করবেন। এভাবে ১৪ দিন পর চূড়ান্তভাবে শরীর চেকাপের পর তাকে স্বাভাবিক ওয়ার্ডে প্রবেশ করানো হয়।’ 

জেলার আরও বলেন, 'কারাগারের প্রবেশ পথে স্প্রে মেশিনের ব্যবস্থা করা আছে। যার মাধ্যমে আদালত হয়ে আসা নতুন হাজতিরা কারাগারের ভেতর প্রবেশ করেন। এছাড়া করোনা ঠেকাতে পুরো কারাগারের চারপাশে জিরো ভাইরাস স্প্রে'এর (বিশুদ্ধ ফ্লোরিন) ব্যবস্থা করা হয়েছে। এসব কিছুর কারণেই এখন পর্যন্ত অকেটাই করোনা থেকে নিরাপদে রয়েছে কারাগার।'

কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, কারাগারের অভ্যন্তরে থাকা বন্দি ও কারাগার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কর্মচারী প্রত্যকের মাস্ক পড়া নিশ্চিত করা হয়েছে। কারা অভ্যন্তরে মাস্ক পরাটা সবার জন্য বাধ্যতামুলক। এখানে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি কঠিনভাবে দেখা হচ্ছে। যারা মানছে না তাদের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এছাড়া বন্দি ও কর্মকর্তা কর্মচারীদের নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করা হয়েছে। কোনো স্টাফ কারা সীমানার বাইরে যেতে পারেনা। যদি অতি প্রয়োজন হয় তাহলে সুরক্ষা মেনেই যেতে হয়।
 
কারা কর্তৃপক্ষ আরও বলছে, কারাগারের জন্য যারা বাজার করেন তারা কেউ কারাগারের ভেতরে ঢুকতে পারেন না। তারা বাইরে থেকেই কাজ করেন। কারাগারে বাজার বুঝিয়ে দিয়ে তারা তাদের গন্তব্যে চলে যান। এছাড়া বন্দিদের কোনো স্বজন কারাগারের ভেতর ঢুকতে পারেন না। কয়েদিদের সাথে করোনাকালের আগে যেভাবে তারা সাক্ষাৎ করতেন সেটি বন্ধ রয়েছে। প্রয়োজনে রুলস মেনে কয়েদিদের সাথে স্বজনরা ফোনে প্রতি সপ্তাহে একজনে ১০ মিনিট করে মিনিট প্রতি এক টাকার বিনিময়ে কথা বলেন।

গত ১৩ মাসের মধ্যে করোনায় এক হাজতির মৃত্যুর বিষয়ে জেলার দেওয়ান তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘ওই হাজতি আগে থেকেই যক্ষ্মা রোগী ছিলেন। আমাদের কারাগারে করোনা আক্রান্ত হননি। তার যক্ষ্মার চিকিৎসা চলাকালীন চট্টগ্রাম মেডিকেলেই তিনি করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তবে আমাদের দুই ডেপুটি জেলার ও একজন নার্স আক্রান্ত হয়ে সুস্থও হয়ে গেছেন। তারা বর্তমানে হোম আইসোলেশনে আছেন।’ 

তবে ওয়ার্ডের ভেতর সামাজিক দূরত্ব মানা কিংবা মাস্ক পরার বিষয়টি মানা হচ্ছে না বলে স্বীকার করে জেলার বলেন, ‘আমরা ওয়ার্ডের বাইরে মাস্ক পরা শতভাগ নিশ্চিত করতে পারছি। এখন কেউ যদি ওয়ার্ডে তার রুমে মাস্ক না পরে কি করার আছে। এছাড়া এক জনের স্থানে তিনজনকে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে। সো সেভাবে বলার কিছু থাকেনা। এরপরও আমরা বাইরে থেকে আসা ও যাওয়ার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করেছি যাতে সবাই যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মানে।’ 

বেসরকারি কারা পরিদর্শক কারা পরিদর্শক আব্দুল হান্নান লিটন বলেন, 'করোনা মোকাবেলায় শুরু থেকে তৎপর ছিল কারা কর্তৃপক্ষ। আমরা যারা পরিদর্শক আছি তারাও বিভিন্নভাবে সুরক্ষা সামগ্রী দিয়ে এগিয়ে এসেছি। সব মিলিয়ে সঠিক ও যথাযত ব্যবস্থাপনার কারণেই কারাগারের মত সেনসেটিভ ও ঘনবসতিপূর্ণ একটি স্থাপনায় করোনাকে মোটামোটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে।’       

প্রসঙ্গত, কারাগারে বর্তমানে ৭ হাজারের বেশি বন্দি রয়েছেন। এর মধ্যে হাজারের উপর রয়েছে সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি এবং বাকিরা সবাই হাজতি আসামি। যাদের মামলা আদালতে বিচারাধীন রয়েছেন। এরবাইরে সিনিয়র জেল সুপার, জেলার, ৬ জন ডেপুটি জেলারসহ ৪৫০ জনের মতো কারা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক, কর্মকর্তা, কর্মচারী রয়েছেন।

উল্লেখ্য, করোনাকালের আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ আসামিকে কারাগার থেকে আদালতে নিয়ে যাওয়া হতো আবার তাদেরকে আদালত থেকে কারাগারে নিয়ে আসা হতো। বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী এটি বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে সেটি ২৫ থেকে ৩০ জনে নেমে এসেছে। 

Add

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়