Cvoice24.com
corona-awareness

‘দান-ভিক্ষা’ নয় দিলে পত্রিকার মূল্য দিন!

সিভয়েস প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৬:৩৬, ১৩ জুন ২০২১
‘দান-ভিক্ষা’ নয় দিলে পত্রিকার মূল্য দিন!

যদি সাহায্য করতে চান, তাহলে একটা পত্রিকা কিনে সাহায্য করুন।

রাস্তায় বের হলে, গাড়িতে উঠলে, কোথাও ঘুরতে গেলে দেখা মিলে অনেক পথশিশুর। অনেকের থাকে না বাবা, অনেকের আবার কেউ নেই। পেটের ক্ষুধায় তারা যাকে পায় তার কাছ থেকেই সাহায্য চাই। অনেকে পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে পড়ায় বাধ্য হয় ভিক্ষা করতে। তবে সবার থেকে যেন আলাদা এক শিশু মো. সাগর (১৩)। সে কারো থেকে টাকা খুঁজে না, কেউ দিলেও নিতে চাই না। তার কথা— যদি সাহায্য করতে চান, তাহলে একটা পত্রিকা কিনে সাহায্য করুন।

সাগরের গ্রামের বাড়ি জামালপুর হলেও জন্ম থেকেই থাকে চট্টগ্রামে। বর্তমানে নগরের ঝাউতলা পানির ট্যাঙ্কি এলাকায় জরাজীর্ণ একটি ঘরে পরিবারসহ ভাড়া থাকে। পরিবার বলতে আছে মা, ছোট বোন আর ভাই। চারজনের সংসার তার। সাগরের বয়স যখন ৩ বছর তখন বাবা তাদের ছেড়ে চলে যায়। সেই থেকে কাগজের ঠোঙা বানিয়ে সংসার চালাতেন সাগরের মা। তবে বিগত ৪ বছর ধরে মা অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় পরিবারের হাল ধরতে হয়েছে সাগরকেই।
 
শনিবার (১২ জুন) রাতে আলাপচারীতার এক পর্যায়ে প্রতিবেদকের পরিচয় জানতে পারে সাগর। এর পর থেকেই সাংবাদিক ভাই, সাংবাদিক ভাই বলে সম্বোধন করতে থাকে সে। কারণ জানতে চাইলে সে বলে, ‘যাদের লেখা বিক্রি করে আমার সংসার চলে তাদের খুব দেখার ইচ্ছা ছিল আমার। কিন্তু আগে কোনো সাংবাদিকের সাথে আমার কথা হয়নি। আজকে আমার ইচ্ছা পূরণ হয়েছে। তাই শ্রদ্ধা নিয়েই আপনাকে এভাবে ডাকছি।’

পারিবারের দায়িত্ব কাধে আসার পর থেকেই পত্রিকা বিক্রি করছে সে। তার পত্রিকা বিক্রির টাকা দিয়েই ৪ বছর ধরে চলছে তাদের সংসার। আগে পড়ালেখার ফাঁকেফাঁকে পত্রিকা বিক্রি করতো। কিন্তু করোনার কারণে গত বছরের ১৮ মার্চ থেকে স্কুল বন্ধ থাকায় পুরোদমে পত্রিকা বিক্রিতে নামে। 

তবে সাগর জানায়, যতই সংকট থাকুক, যতই অভাব আসুক কারও দয়া চায় না সে। ভিক্ষাবৃত্তি সবচেয়ে অপছন্দ তার। পেপার কিনতে অনুরোধ করে সাগর বলে, ভাইয়া একটা পেপার নেন? পেপার না নিয়ে কেউ টাকা দিতে চাইলে সাগর বলে, ‘দান-ভিক্ষা চাই না, সহযোগিতা চাই। যদি পেপার নেন তাহলেই কেবল আমি টাকা নিবো, দিলে পত্রিকার মূল্যটাই দিন।’

সে আরও জানায়, দিনে ১৫০ আবার কখনো তার চেয়েও বেশি পত্রিকা বিক্রি হয়। নগরের জিইসি মোড়ের হকার থেকে কিনে পত্রিকাগুলো বিক্রি করতে ঘুরে বেড়ায় খুলশী, ওয়ার্লেস, টাইগারপাস, আমবাগান এলাকায়। প্রতি পিস ৩ টাকা করে কেনা পত্রিকাগুলো ২ টাকা লাভে বিক্রি হয় ৫ টাকায়। এতেই চলে তাদের চারজনের সংসার। পত্রিকা বিক্রি হলে পরিবারের সবার মুখে উঠে দু’বেলা দু’মুঠো ভাত। আর বিক্রি না হলে পরিবারের সবাইকে থাকতে হয় অনাহারে।  

‘খরচের ১৫-২০ টাকা বাদে দিনের শেষে উপার্জিত টাকা তুলে দেয় মায়ের হাতে। মা হাতে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে পিড়ি পেতে এক গ্লাস পানি তুলে দেন ছেলের হাতে। আর এতটুকুতে রাজ্যের খুশি তার, বুকভরা হাসি দিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে সে। এই ইনকাম দিয়ে কোনো রকমে চলে যায় চারজনের পরিবার।’ তবে নিজের পড়ালেখা আর পরিবারের খরচ চালাতে আরও বেশি টাকা প্রয়োজন বলে জানায় সে।

এতটুকু বয়সে পরিবারকে নিয়ে কত চিন্তা, কত স্বপ্ন তার চোখে। দু’তিনশো টাকা রোজগারের আশায় সকাল হলেই বেরিয়ে পড়ে ছেলেটি। গায়ের রংয়ের মত পড়নে লাল গেঞ্জিটাও কালচে রুপ নিয়েছে। সকালের হাল্কা নাস্তার পর অনেক সময় রাত পর্যন্ত কিছু খায় না সে। তার চিন্তা একটাই, পত্রিকা বিক্রি করতে না পারলে অনাহারে থাকতে হবে পরিবারকে। যেমন গত পরশু বৃষ্টিতে বিক্রি হয়নি কোনো পত্রিকা। সেদিন পুরো পরিবারকে থাকতে হয়েছে না খেয়ে।

ইচ্ছার কথা জানতে চাইলে প্রতিবেদককে সে জানায়, মাঝে মাঝে পত্রিকা বিক্রি হয় না।  তাই তার ইচ্ছা ছোট একটি দোকান দেওয়ার, যেখানে পত্রিকার পাশাপাশি সে পান-সিগারেটও বিক্রি করবে।

-সিভয়েস/জেআইএস

Add

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়