Cvoice24.com
corona-awareness

৯ বছর ধরে মর্গে পড়ে আছে মৃতদেহ, জানে না চমেক কর্তৃপক্ষ!

সিভয়েস প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২০:২১, ২২ জুন ২০২১
৯ বছর ধরে মর্গে পড়ে আছে মৃতদেহ, জানে না চমেক কর্তৃপক্ষ!

৩ থেকে ৯ বছর ধরে চমেকের মর্গে পড়ে আছে ৪ বিদেশি বেওয়ারিশ মৃতদেহ। ছবি : সিভয়েস।

১১ জুন রাত ৯টায় বাদশা মিয়া সড়ক থেকে মুমূর্ষু অবস্থায় অজ্ঞাত এক বৃদ্ধকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করায় ‘স্বার্থহীন পথচলা’ সংগঠনের সদস্যরা। ১৪ জুন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। এবার মৃতদেহ দাফন নিয়ে তৈরি হয় জটিলতা। অজ্ঞাত মৃতদেহ বলে আইনগতভাবে পরিচয় নিশ্চিতে অন্তত ৪৮ ঘণ্টা মর্গে রাখতে বলে পুলিশ। তবে এ মৃতদেহ চমেকের মর্গের মেঝেতে এতো সময় রাখলে তা ফুলে যাওয়াসহ নানা সমস্যার আশঙ্কা প্রকাশ করে ফ্রিজারে সংরক্ষণ করার দাবি করেন স্বেচ্ছাসেবীরা। কিন্তু ফরেনসিক বিভাগ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয় ফ্রিজারে স্থান সংকট ও যান্ত্রিক ত্রুটি রয়েছে। তাই মৃতদেহের অবস্থা খারাপ হলেও সামনের ৪৮ ঘন্টা মেঝেতেই রাখতে হবে। 

শুধু তাই নয়, প্রতিদিন ময়নাতদন্তের জন্য নগর ও গ্রামের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা মৃতদেহ ফ্রিজারে সংরক্ষণের প্রয়োজন পড়লেও ঠিকমতো সেসব মৃতদেহ সংরক্ষণ করতে পারছেন না মর্গের কর্মীরা। যার ফলে দু’টি ফ্রিজেই কয়েক ঘণ্টা পর পর পালাক্রমে মৃতদেহ রেখে কোনো রকমে কাজ চালাতে হচ্ছে মর্গকর্মীদের। কর্তৃপক্ষকে ভোগান্তির বিষয়ে জানালেও রহস্যজনকভাবে তারা নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছেন বলে অভিযোগ করেছেন স্বয়ং মর্গের দায়িত্বরতরা। এসব বিষয়ে উদাসীন দায়িত্বশীলরা। বহুবছর ধরে এসব অব্যবস্থাপনা ও দুর্দশার মধ্য দিয়ে চললেও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) ফরেনসিক বিভাগের দায়িত্বরতরা এ বিষয়ে মুখ খুলতে রাজি হচ্ছে না। এমনকি এ বিষয়ে কিছুই নাকি জানেন না স্বয়ং চমেক অধ্যক্ষ! 

ফ্রিজারের স্থান সংকুলান না হওয়ায় এভাবেই মর্গের মেঝেতে পড়ে থাকে মৃতদেহ।

জানা যায়, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ফরেনসিক মেডিসিন মর্গে পড়ে আছে ৪ বিদেশি বেওয়ারিশ মৃতদেহ। এগুলোর কোনও দাবিদার না থাকায় বছরের পর বছর পার হয়ে গেলেও মর্গেই পড়ে রয়েছে। ৩ থেকে ৯ বছরের বেশি সময় ধরে মর্গের প্রায় অকেজো ফ্রিজারে পড়ে থাকায় মৃতদেহগুলো রয়েছে খুবই শোচনীয় অবস্থায়। মর্গে ২টি ফ্রিজারে ২০টি মৃতদেহ ধারণ ক্ষমতা থাকলেও বেশ কয়েকবছর ধরে ৪টি চেম্বার দখল করে আছে মৃতদেহগুলো। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত হওয়া সত্ত্বেও ১৬টি চেম্বার নিয়ে খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলতে হচ্ছে ফরেনসিক বিভাগের। অভিযোগ আছে, মৃতদেহ মর্গে আসা থেকে এখন পর্যন্ত দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও এখনো পর্যন্ত সৎকার বা তাদের পরিবারের কাছে ফেরত পাঠানোর কোন ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ।

চমেকের ফরেনসিক বিভাগ জানায়, ২০১২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মর্গে আসা মৃতদেহ ৪টিই মিয়ানমার নাগরিকের। এদের প্রত্যেকেই পুরুষ, যাদের একজন বৌদ্ধ বাকি তিনজন মুসলিম। সর্ব প্রথম ২০১২ সালের ১২ জুন কালাম হোসেনের (৫০) মরদেহ হাসপাতাল মর্গে আনা হয়। মৃতদেহ আনায়নকারী ছিলেন কনস্টেবল বিদ্যলাল চাকমা (৪৩৬)। পাঁচলাইশ মডেল থানায় জিডি নং- ৬৫৫।

একই মাসের ১৭ জুন মর্গে আসে দ্বিতীয় মিয়ানমার নাগরিক মো. তৈয়বের (২০) মৃতদেহ। এটি কনস্টেবল মো. রফিকুল আলম (৪২১১) হাসপাতালে নিয়ে আসেন। পাঁচলাইশ মডেল থানায় জিডি নং- ৯৭০।

তৃতীয় মিয়ানমার নাগরিক সহিং মং প্রো'র (৫০) মৃতদেহ মর্গে আনা হয় ২০১৪ সালের ২৩ জুলাই। কনস্টেবল শুভাশিষ বড়ুয়া (৩৬২৪) মৃতদেহটি হাসপাতালে নিয়ে আসেন। পাঁচলাইশ মডেল থানায় জিডি নং- ১২৩৯।

সর্বশেষ মৃতদেহটি মিয়ানমার নাগরিক হাফেজ সিরাজের (৪০)। কনস্টেবল মো. হাবিব উল্লাহ হাসপাতালের মর্গে মৃতদেহটি আনেন ২০১৭ সালের ১৪ মে। পাঁচলাইশ মডেল থানায় জিডি নং- ১০৫০। ময়নাতদন্তের জন্য আসা এসব মৃতদেহ আরো কত দিন হিমঘরে থাকবে স্পষ্ট করে সে বিষয়ে কেউ বলতে পারছেন না। 

সোমবার (২১ জুন) সরেজমিনে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ফরেনসিক মেডিসিন মর্গে গিয়ে দেখা গেছে, একটি বক্স ফ্রিজের ভেতরে একই সারিতে চারটি চেম্বারে শুইয়ে রাখা হয়েছে চারজনের মৃতদেহ। যার একটিতে কালাম হোসেন, অন্যটিতে মো. তৈয়বের, আরেকটিতে সহিং মং প্রো এবং আরেকটিতে রাখা হয়েছে হাফেজ সিরাজের মৃতদেহ।  এসব মৃতদেহ পঁচে বিদঘুটে গন্ধে নিশ্বাস নেওয়ার কোনও জো নেই।

চমেক মর্গে থাকা ২টি ফ্রিজের একটিতে (৮টি চেম্বার সম্বলিত) রাখা আছে মৃতদেহগুলো। দীর্ঘদিন নষ্ট থাকা দু’টি ফ্রিজে বিশটি চেম্বারে ২০টি মৃতদেহ রাখার ব্যবস্থা থাকলেও ওই চারটি মৃতদেহের কারণে মাত্র ১৬টি মৃতদেহ সংরক্ষণের সুযোগ থাকছে। এ কারণে মর্গে প্রতিদিন যে মৃতদেহ আসে তা সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে গিয়ে সমস্যার সম্মুখীন হতে দেখা গেছে মর্গ সংশ্লিষ্টদের।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ফরেনসিক মেডিসিন মর্গের ডোম (মৃতদেহ কাটার কাজে নিয়োজিত) কদম আলী সিভয়েসকে বলেন, ‘৪ মিয়ানমার নাগরিকের মৃতদেহ দীর্ঘ সময় ধরে মর্গে পড়ে আছে। এমনিতেই মর্গে ফ্রিজার সংকট, তার উপর এই মৃতদেহগুলোর কারণে প্রতিদিন আগত মৃতদেহ রাখতে আমাদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এসব মৃতদেহ পঁচে-গলে খুবই বাজে অবস্থা হয়ে আছে। কর্তৃপক্ষের কাছে বেশ কয়েকবার বলেও এ বিষয়ে কোনো সুরাহা পাইনি।’

তবে এ বিষয়ে জানতে চমেক ফরেনসিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. সুমন মুৎসুদ্দীর সাথে গত দু’দিন ধরে যোগাযোগ করলে ব্যস্ততার অজুহাতে তিনি বারবার ফোন কেটে দেন। তার মুঠোফোনে ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে বিষয়টি জানিয়ে একাধিকবার ফোন করেও তার কাছ থেকে কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি।

যদিও পরবর্তীতে প্রায় ২০ বারের প্রচেষ্টার পর তিনি কল রিসিভ করে বলেন, ‘যেহেতু এগুলো অফিশিয়াল ব্যাপার তাই এসব বিষয়ে আমি কথা বলতে চাই না। আর সরকারি নিয়ম অনুযায়ী উর্ধতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া আমরা কোনও মন্তব্য করতে পারি না’  একথা বলেই ফোন কেটে দেন ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সুমন।

এদিকে নানা সংকট ও অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে কোনো রকমে কাজ চালিয়ে নেওয়া বৃহত্তর চট্টগ্রামের একমাত্র ফরেনসিক বিভাগটির অভিভাবক হিসেবে আছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. সাহেনা আক্তার। তবে ১২ বছর ধরে পড়ে থাকা মৃতদেহগুলোর ব্যাপারে কিছুই জানা নেই চমেক অধ্যক্ষের। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি সিভয়েসকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার জানা ছিল না। যেহেতু মৃতদেহগুলো অনেক বছর পুরোনো, তাই এগুলো নিয়ে আগে কি কাজ হয়েছে বা এ ব্যাপারে অগ্রগতি কি সেগুলো আমার জানতে হবে। আপনি দয়া করে পরে যোগাযোগ করুন। আমি খবর নিয়ে আপনাকে জানাবো।’ 

তবে মর্গের উন্নয়ন ও সংস্কারের বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেননি তিনি। 

-সিভয়েস/জেআইএস

Add

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়