Cvoice24.com
corona-awareness

শেষ দিনে গরুর হাটে বেপারিদের কান্না

সিভয়েস প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৫:৩৪, ২০ জুলাই ২০২১

 

চট্টগ্রামে এবারের বাজারে সম্ভাব্য কোরবানি পশুর চাহিদা ৮ লাখ ৯ হাজার। যার বিপরীতে স্থানীয়ভাবে যোগানে কথা ৭ লাখ ৫৬ হাজার পশু। ঘাটতি ছিল ৫২ হাজার পশু। করোনার কারণে ভারত থেকে গরু না এলেও দেশের উত্তর ও দক্ষিণ বঙ্গ থেকে ট্রাকে ট্রাকে গরু এসেছে চট্টগ্রামের হাটগুলোতে। যা ঘাটতির তুলনায় তা চারগুণের বেশি।  কিন্তু স্থানীয় খামারের গরু ও সংক্রমণ এড়াতে অনলাইন থেকেই গরু কিনেছেন বেশিরভাগ ক্রেতা। ফলে ক্রেতারা হাটমুখী খুব কম হয়েছে। তবুও বেপারিরা আশা করেছিলেন, শেষের দুই দিন হয়তো হাটমুখী হবে ক্রেতা। সেজন্য চড়া দাম ধরে রেখেছিলেন তারা। কিন্তু একেবারের শেষ সময়ে এসেও ক্রেতার জন্য হাহাকার করছে বিক্রেতারা। দুদিন আগে যে গরু ১লাখ টাকা দাম হাঁকিয়ে ছিল ৭০ হাজার টাকা দিয়েও সেই গরুর ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না। 

প্রান্তিক কৃষক থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের খামারিরা ট্রাকে ট্রাকে যে বিপুলসংখ্যক গবাদিপশু হাটে জড়ো করেছেন, সে তুলনায় ক্রেতার সংখ্যা অনেক কম তা তারা খেয়ালই করেননি। অথচ এর প্রভাব পড়েছে কোরবানির ঠিক আগ মুহূর্তে। ঈদুল আজহার ঠিক আগের দিনই হাটগুলোতে গরুর যোগান বেশি থাকায় চাহিদা কমে যায়। ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আগের নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক কম দামে ব্যাপারীদের গরু বিক্রি করতে হয়েছে। তাই শেষ দিনে যারা কোরবানির পশু কিনেছেন তারাই জিতেছেন। উল্টো মাথায় হাত পড়েছে অতি মুনাফার আশায় গরু ধরে রাখা ব্যাপারীদের। অনেকটা পানির দামেই শেষ দিনে তাদের গরু বিক্রি করতে হয়েছে।

পাবনা থেকে ১৩টি গরু নিয়ে ১৩ জুলাই সাগরিকা গরু হাটে এসেছিলেন বসিরুল মিয়া। প্রথম দিন একটি এবং পরের দিন আরও ৭টি গরু বিক্রি করেছেন মোটামুটি ভালো দামেই। বাকি ৫টি বড় গরু শেষ সময়ে চড়া দরে বেচবেন এমন আশায় সেগুলোর ভালো দাম উঠলেও তখন বিক্রি করেননি। তবে মঙ্গলবার দুপুরের পর বড় গরুর আর তেমন ক্রেতার দেখা মেলেনি। দু'চারজন ক্রেতা দরাদরি করলেও সবাই অস্বাভাবিক কম দাম বলেছেন। এখন  ট্রাক ভাড়াসহ আনুষঙ্গিক অন্যান্য খরচের যোগ-বিয়োগ করে লস দিয়ে হলেও বিক্রি করে চলে যেতে চান বসিরুল মিয়। শুধু তিনি নয়। এরকম দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা গরু ব্যবসায়ীরা মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। 

শুধু সাগরিকা নয়, পতেঙ্গা টিকের মাঠ, বিবিরহাট সহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে এবং ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সোমবার সকাল থেকেই অনেকটা কমতে থাকে গরুর দাম। শনিবার অনেকেই শুধু গরু দেখেছেন আর রোববার কেউ দেখেছেন কেউ কিনেছেন। তবে দাম তখনও ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের নাগালের মধ্যেই ছিল। যদিও ক্রেতাদের অভিযোগ ছিল বিক্রেতারা গরুর দাম কমাচ্ছে না। এরপরও শনিবার অনেক হাটেই গরু বেচাকেনা ছিল জমজমাট। রোববার সারাদিন এবং বিশেষ করে রাতে বেচাকেনাটা হয় অনেক বেশি। শেষ দিনে গরুর সঙ্কট হতে পারে কিংবা ভালো ও পছন্দের গরু না-ও পাওয়া যেতে পারে- এমন আশঙ্কায় যারা হাটে প্রবেশ করেছেন অধিকাংশই গরু কিনেই ফিরেছেন। তবে বেশির ভাগ ক্রেতা অনলাইনে ও খামার থেকে গরু কেনায় শেষ দিনে যে চাপ থাকে সেটি এবারের গরুর হাটে আর নেই। ফলে ক্রেতা শূণ্য হয়ে পড়েছে বাজার। অস্বাভাবিকহারে কমেছে গরুরু দাম। 

বিবিরহাটের গরু বেপারী ইউনুস আলী জানান, রোববার যে গরু ক্রেতারা ৬০ হাজার টাকা বলেছে, মঙ্গলবার সেই গরুর দাম বলেছে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা। এই দামে গরু বিক্রি করলে লাভ তো দূরের কথা, অনেক টাকা লস হবে। এই ব্যবসায়ী কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘কিছু লাভের আসায় এত দূর থেকে গরু নিয়ে চট্টগ্রাম এসেছি। কিন্তু দুটা টাকা নিয়ে যদি বাড়ি না ফিরি, তাহলে তারা ঈদের জামাতে যাবে না। বাড়ি ফিরব কেমনে?' বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

কুষ্টিয়া থেকে ২২টি বড় বড় গরু নিয়ে হাটে এসেছেন তবিবুর রহমান। তিনি জানান, তার প্রতিটি গরুর দাম দুই লাখ টাকা করে। মানুষ গরুগুলো দেখতে আসে। কিন্তু দাম বলে সর্বোচ্চ দেড় লাখ টাকা করে। এ কারণে তিনি একটা গরুও বিক্রি করতে পারেননি।

চট্টগ্রাম জেলা প্রাণী সম্পদ অধিপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, গতবার শেষের দিকে চট্টগ্রামের কোরবানি বাজারে যখন টানাপোড়েন শুরু হয়েছিল ঠিক সেই মুহূর্তে রাজশাহীর সিরাজগঞ্জ থেকে প্রায় ৩৫ হাজার গরু এনে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছিল।

চট্টগ্রাম জেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ রেয়াজুল হক বলেন, ‘গতবার কোরবানিতে ৮৫ হাজার গরু চট্টগ্রামে আসার কথা ছিল। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে সেই গরু বিক্রি হয় কি না কিংবা চট্টগ্রামে ঢোকার অনুমতি পাওয়া যায় কি না— বিভিন্ন বিষয় মাথায় রেখে ব্যবসায়ীরা আসেনি। ৮৫ হাজারের জায়াগায় মাত্র ১০ হাজার গরু এসেছিল। পরে ৩৫ হাজার গরু সিরাজগঞ্জ থেকে আনা হয়েছিল।’

প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চট্টগ্রামে এবারের বাজারে সম্ভাব্য কোরবানি পশুর চাহিদা রয়েছে ৮ লাখ ৯ হাজার। যার বিপরীতে আনোয়ারা, সাতকানিয়া, ফটিকছড়িসহ বিভিন্ন উপজেলা মিলে চট্টগ্রাম জেলায় স্থানীয় উৎপাদন ৭ লাখ ৫৬ হাজার ৩৩৪টি। যার মধ্যে গবাদি পশু আছে ৫ লাখ ১০ হাজার ৪০টি, মহিষ আছে ৬৩ হাজার ১৩৬টি, ছাগল ও ভেড়া আছে ১ লাখ ৮৩ হাজার ৬৩টি ও অন্যান্য পশু আছে ৯৫টি।

প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, চট্টগ্রামের গত ৫ বছরে চট্টগ্রাম জেলার বছর ওয়ারী পশু জবাই ও উৎপাদনের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০১৫ সালে চট্টগ্রামের স্থানীয় উৎপাদন ছিল ৩ লাখ ২০ হাজার। যার বিপরীতে জবাই হয়েছে ৪ লাখ ৯২ হাজার ২৫০টি পশু। ২০১৬ সালে স্থানীয় উৎপাদন ছিল ৩ লাখ ৩৬ হাজার ১১৯টি। যার বিপরীতে জবাই হয়েছে ৫ লাখ ১৬ হাজার ৮৫২টি। ২০১৭ সালে স্থানীয় উৎপাদন ছিল ৩ লাখ ৫৬ হাজার ১৬৩টি। যার বিপরীতে জবাই হয়েছে ৫ লাখ ৯৫ হাজার ৮৩১টি। 

২০১৮ সালে স্থানীয় উৎপাদন ছিল ৫ লাখ ৮১ হাজার ৬৩৪টি। যার বিপরীতে জবাই হয়েছে ৬ লাখ ৫৫ হাজার। ২০১৯ সালে স্থানীয় উৎপাদন ৬ লাখ ১০ হাজার ২১৯টি। যার বিপরীতে জবাই হয়েছে ৭ লাখ ৩০ হাজার ৭৮৯টি। সবশেষ ২০২০ সালে স্থানীয় উৎপাদন হয়েছে ৬ লাখ ৮৯ হাজার ২২টি।

Add

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়