Cvoice24.com

অস্ত্র-বিস্ফোরকসহ ৩০ জলদস্যু গ্রেপ্তার

সিভয়েস২৪ প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৫:৩২, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
অস্ত্র-বিস্ফোরকসহ ৩০ জলদস্যু গ্রেপ্তার

দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার ট্রলারে গণডাকাতির প্রস্তুতিকালে ৩০ জলদস্যুকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র‍্যাব-৭)। এ সময় তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে।

সোমবার (১২ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে পতেঙ্গার ১৫ নম্বর ফিশারিঘাটে সংবাদ সম্মেলন করে এসব তথ্য জানান র‍্যাব-৭ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. মাহবুব আলম।

গ্রেপ্তাররা হলেন করিম (৩৩), মো. রুবেল (৩৩), মো. জফুর (৩৫), শফি আলম (৪০), আব্দুর রহিম (২৫), মো. শামীম (২১), মো. ইউসুফ (২৯), শাজাহান বেগম (৩৭), মো. সাহাব উদ্দিন (৩৫), মো. শওকত (৩৭), মো. ইসমাইল (২৬), দেলোয়ার ইসলাম (৪২), নুর মোহাম্মদ (১৭), আব্দুর রহিম সিকদার (৩৪), মো. মফিজুর রহমান (৩০), ফজল হক (৪০), মো. গিয়াস উদ্দিন (২৬), মো. কাছেদ (১৯), মো. আকিদ খান (৩৭), দিদারুল ইসলাম (৩৩), নাইম (১৯), হারুন (৪৪), ইয়াছিন (২৯), খলিলুর রহমান (২৫), ইকবাল হোসেন (২৪), শাহেদ (২২), হোসেন (২৭), আলী হোসেন (২৪), আব্দুল মান্নান (৪০) এবং মো. সোলায়মান (৩৮)।

র‍্যাব জানিয়েছে, গ্রেপ্তার শাহেদ মাঝী প্রথম গ্রুপের দলনেতা। সে কুতুবদিয়া এলাকার বাসিন্দা। তার দলের কাজ ছিল ডাকাতি করার জন্য অস্ত্র, বোট, জাল এবং আনুসাঙ্গিক যে সকল সরঞ্জামাদি লাগতো সেগুলো সরবরাহ করা। তার দলে কাজ করতো ৯ জন।

গ্রেপ্তার আরেক আসামি ইউসুফ মাঝী ছিল দ্বিতীয় গ্রুপের নেতা। তিনিই ডাকাতির মূল পরিকল্পণাকারী। প্রথমে ডাকাতির জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নিবার্চন করত সে। ডাকাতির স্থান নির্বাচন করে নিজে সশরীরে হাজির থেকে ডাকাতির কার্যক্রম সম্পন্ন করত তিনি। ইউসুফ মাঝীর দলে ১১ জন ডাকাত সদস্য ছিল।

গ্রেপ্তার করিম মাঝী ছিল তৃতীয় ডাকাত গ্রুপের নেতা। তার কাজ ছিল ডাকাতির পরে লুট করা বোট, মাছ, জাল এবং অন্যান্য সরঞ্জামাদি সংগ্রহ করে সুবিধামত বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করা এবং সেই টাকা গ্রুপের সকল সদস্যকে সমানভাবে বন্টণ করা। তার দলে ১০ জন ডাকাত সদস্য ছিল। ডাকাত সর্দার ইউসুফ মাঝী এবং করমি মাঝীর নিজস্ব বোট ও কোম্পানী রয়েছে। যা দিয়ে তারা মাঝীর ছদ্মবেশে সমুদ্রে দস্যূতার কার্যক্রম পরিচলনা করতো বলে তথ্য পেয়েছে র‍্যাব।

র‍্যাব আরও জানায়, প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ জনের ৩টি সশস্ত্র ডাকাত চক্র (ভোলা, বরিশাল, কুতুবদিয়া এবং আনোয়ারা এলাকায়) একত্রিত হয়ে সাগরে বড় পরিসরে দস্যূতার পরিকল্পনা করছে। চক্রটির পরবর্তী ১০-১২ দিনের মধ্যে প্রায় ১৫-২০টি ট্রলারে ডাকাতি করার পরিকল্পনা ছিল। ডাকাতি শেষে লুটপাটকৃত মাছ ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি ভোলা ও বরিশাল অঞ্চলের দিকে নিয়ে বিক্রয় করা হতো। পরবর্তীতে লভ্যাংশ আনোয়ারা-কুতুবদিয়া এলাকার জলদস্যুদের নিকট মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পৌঁছে দেয়া হত। এই ডাকাত দল মূলত তিনটি পর্বে ভাগ হয়ে তাদের দস্যূতার কার্যক্রম পরিচালনা করত।

র‍্যাব-৭ এর অধিনায়ক লে. কর্ণেল মো. মাহবুব আলম বলেন, 'সম্প্রতি বঙ্গোপসাগরের গভীরে ডাকাতির পর অনেক জেলেদের হত্যা করেছিলো জলদস্যুরা। সেসময় আমরা অনেক জলদস্যুকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছিলাম। কিন্তু আমরা নজরদারি অব্যাহত রেখেছিলাম। আমরা জানতে পেরেছি, চট্টগ্রামের পতেঙ্গা এলাকা থেকে ৩০-৪০ জনের একটি গ্রুপ একটি গণডাকাতির প্রস্তুতি নিচ্ছে। সবশেষ আমরা গতকাল (রবিবার) জানতে পারি ডাকাত দলটি রাত ১১টার দিকে গণডাকাতির উদ্দেশ্যে ঘাট এলাকা ত্যাগ করে। পরবর্তীতে র‍্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা দল এবং আমাদের একটি আভিযানিক দল ডাকাতদের ট্রলারটি সনাক্ত করতে সক্ষম হয়। এরপর তাদের আমরা গ্রেপ্তার করি এবং তাদের কাছে থাকা ২টি ট্রলার থেকে ৮টি দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৫টি কার্তুজসহ ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত বিপুল পরিমান সরাঞ্জাম উদ্ধার করি।'

র‍্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, 'এই ডাকাতরা পুরো এক-দুই সপ্তাহ সময় নিয়ে বঙ্গোপসাগরে ডাকাতি করে বেড়ায়। তাদের গডফাদারদের কাজ হলো অস্ত্র, গুলি এবং ট্রলারের যোগান দেয়া। বিভিন্ন নৌ-লঞ্চ বা স্টিমার ঘাটে সোর্সের মাধ্যমে আইনশৃংঙ্খলাবাহিনী সাগরে অভিযানে যাচ্ছে কিনা—তা তদারকি করে জলদস্যুরা উপকূলে আসার সময় অবগত করাসহ বোট মালিক এবং মাছ ব্যবসায়ী হিসেবে ডাকাতির মাছ ও মালামাল বিক্রি করে। এছাড়াও জলদস্যুরা সাগরে গিয়ে ডাকাতি করে মাছ এবং মালামাল বিক্রয়ের টাকা ৪০ শতাংশ টাকা কথিত গডফাদারের, ২০ শতাংশ তেল খরচ এবং বাকী ৪০ শতাংশ ডাকাতি সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত সদস্যদের মাঝে বন্টণ করতো।'

‘গ্রেপ্তার আসামিরা জিজ্ঞাসাবাদে অকপটে স্বীকার করে যে, তারা কয়েকটি সংঘবদ্ধ চিহিৃত শীর্ষ জলদস্যূ ও ডাকাত দলের সক্রিয় সদস্য এবং বাঁশখালী, চকরিয়া, পেকুয়া, কুতুবদিয়া ও মহেশখালী এলাকার সংঘবদ্ধ জলদস্যূ ঘটনায় সম্পৃক্ত সক্রিয় সদস্য। এছাড়াও এই দল গুলো দীর্ঘদিন যাবৎ চট্টগ্রামের বাঁশখালীসহ কক্সবাজার জেলার পেকুয়া, কুতুবদিয়া, মহেশখালী থানা এলাকাসহ সাগর পথে বিভিন্ন চ্যানেলে ডাকাতি করে আসছে। গ্রেপ্তার আসামিদের মধ্যে ১৪ জনের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলার তথ্য পাওয়া গেছে।’ যোগ করেন তিনি।

উল্লেখ্য, বেশ কয়েক বছর ধরে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ভোলা এবং বরিশালের উপকূলীয় অঞ্চলের জলদস্যু বাহিনীদের আক্রমণে সাগরে জেলেদের উপর অমানবিক অত্যাচার, জুলুম, চাঁদাবাজি, অপহরণ, প্রাণনাশের হুমকিসহ হত্যার মত জঘন্য ঘটনাও ঘটছে। এসব ঘটনায় দীর্ঘদিন ধরে বঙ্গোপসাগরে জলদস্যুদের দাপটে তটস্থ জেলেরা। কিন্তু তাদের তথাকথিত গডফাদাররা ধরা ছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়।  ২০১৮ এবং ২০২২ সালে র‍্যাবের কাছে ডাকাতরা আত্মসমর্পণের পর সাগরে ডাকাতি কিছুদিন বন্ধ থাকলেও তথাকথিত গডফাদাররা নতুন ডাকাত সদস্য প্রবেশ করিয়ে ফের জলদস্যু গ্রুপ তৈরি করে। ওই গডফাদারদের নির্দেশনা অনুযায়ী আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে নিজেদের ট্রলার নিয়ে যে কোনো কোম্পানির বোট ডাকাতি করে মাঝি-মাল্লাদের বেধড়ক পিটিয়ে অজ্ঞাত স্থানে নামিয়ে দিয়ে জলদস্যুরা লুট করা কোম্পানির বোট দিয়ে ডাকাতি চালিয়ে যায়। ফলে গডফাদারদের কেউ চিহ্নিত করতে পারে না।

সর্বশেষ