Cvoice24.com

এমভি আবদুল্লাহর ২৩ নাবিকের ঘরে ফেরা
বড় ঝঞ্ঝাট সামলিয়ে ফিরছে স্বামী, মেহেদি রাঙানো হাতে অপেক্ষা

মিনহাজ মুহী ও রবিউল রবি, সিভয়েস২৪

প্রকাশিত: ২১:২৯, ১৪ মে ২০২৪
বড় ঝঞ্ঝাট সামলিয়ে ফিরছে স্বামী, মেহেদি রাঙানো হাতে অপেক্ষা

পরনে বোরকা আর নেকাব। মেহেদি রাঙানো হাত। ফোনে স্বজনদের জানাচ্ছেন স্বামী ফেরার কথা। বড় এক ঝঞ্ঝাট সামলিয়ে স্বামী ফিরেছে। তাইতো ‘ঘটা’ করে স্বামীকে নিতে এসেছেন জান্নাতুল ফেরদৌস। জান্নাতুলের স্বামী এমভি আবদুল্লাহর জেনারেল স্টুয়ার্ড মোহাম্মদ নুর উদ্দিন।

মঙ্গলবার (১৪ মে) চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি জেটিতে ভিড়ে জলদস্যুমুক্ত ২৩ নাবিকদের বহনকারী লাইটার জাহাজ এমভি জাহান মণি-৩। এর খানিক পরেই একে একে নেমে আসেন নাবিকরা। সেখানে আগে থেকে অপেক্ষায় ছিলেন জান্নাতুল।

জান্নাতুল বলেন, ‘ঈদে মেহেদি দিই নাই। গতকাল রাতে দিয়েছি। আমার কাছে মনে হয়েছে গতকাল ছিল চাঁদরাত। আর আজকে আমাদের ঈদের দিন।’

‘গতকাল (সোমবার) রাতেই তাঁর পছন্দের সব খাবার রান্না করেছি। এরপর সবকাজ শেষ করে হাতে মেহেদি রাঙিয়েছি। আমরা তো কোনো বিশেষ আয়োজনে হাতে মেহেদি দিই। ওনি আসছেন এটা এখন অনেক বড় একটা কারণ, আমার জন্য বিশেষ কিছু। এ মেহেদি ওনার জন্যই দেওয়া।’— বলেন স্টুয়ার্ড নুর উদ্দিনের স্ত্রী জান্নাতুল।

কর্ণফুলী উপজেলার দক্ষিণ শাহমিরপুরে নুর উদ্দিনের বাড়ি। নুর উদ্দিন-জান্নাতুলের ঘরে একমাত্র ছেলে সন্তান। তার নাম সাদ বিন নুর। 

প্রিয়জনকে দেখার আগমূহূর্তের অনুভূতির কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রিয়জনকে দেখার অনুভূতি সবসময় আলাদা। এটা প্রকাশ করার মতো নয়। তিনিসহ বাকিরা দেশে প্রবেশ করেছে, জলসীমার মধ্যে এসেছে; এ খবর পাওয়ায় ছিল আমাদের সবার জন্য আনন্দের। এটা মনকে হালকা করেছে, আনন্দ বাড়িয়ে দিয়েছে। এটা বলে কখনো ভেতরের অনুভূতি প্রকাশ করা যাবে না। তবে ওনাকে কাছ থেকে না দেখা পর্যন্ত টেনশনের শেষ ছিল না। বলতে গেলে এতদিন ঘুমই হয়নি।’

আজ দেখা হবে তাই গতকাল রাতে একটুও ঘুম হয়নি। কাজ শেষ করে দুইটার দিকে ঘুমালেও চারটায় ভেঙে যায়। প্রিয়জনকে দেখবো, প্রিয়জনের জন্য অপেক্ষা করা; এগুলো এক ধরনের ভালো লাগা কাজ করে।’ 

‘দুর্বিষহ’ এক ঘটনার সাক্ষী হয়েও পরেরবার স্বামীকে জাহাজে যেতে দিবেন কিনা— এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘এটা যেহেতু ওনার পেশা; তাহলে তো কোনো সন্দেহ নেই তিনি অবশ্যই ফিরবেন। হয়তো কয়েক মাস রেস্টে থাকবেন, এরপর আবার ফিরবেন।’ 

নাবিকদের অনেকেই বিয়ে করতে চান না; বিয়ের সময় আপনি কোনো সিদ্ধান্তহীনতায় ছিলেন কিনা— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নাবিকরা কি মানুষ না? তবে এটা সত্য প্রথম প্রথম একটু মেনে নিতে কষ্ট হতো। ওনি বিয়ের মাসেই জাহাজে ওঠে যান। তখন একটু কষ্ট লেগেছিল। তবে ধীরে ধীরে তা স্বাভাবিক হয়ে যায়। এখন তো চার বছর পেরিয়েছে, তাই এ বিষয়ে এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছি।’ 

যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন আগের চেয়ে উন্নত জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন জাহাজে ওয়াইফাই আছে। তাই যোগাযোগ ব্যবস্থা সবকিছু স্বাভাবিক। সমুদ্রের মাঝে থাকলেও নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়, তাদের সঙ্গে সহজেই যোগাযোগ করা যায়। তবে বিয়ের প্রথম দিকে যোগাযোগ খুবই কম হতো। ওই সময় পোর্ট বা দেশের এরিয়ায় প্রবেশ না করার আগ পর্যন্ত কথা বলতে পারতাম না। এখন এসবে আর সমস্যা হয় না। সমুদ্রের মাঝেও নেটওয়ার্ক পাওয়ার কারণে সবসময় কথা বলা যায়। এখন যোগাযোগ করতে পারি। জাহাজে ওয়াইফাই সিস্টেম চালু হওয়ার কারণে সুযোগ-সুবিধা বেড়েছে।’

স্বামীকে নিয়ে কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আগে বাসায় যাব। কারণ, বাসায় অনেক মেহমান এসছেন। তারা ওনার জন্য অপেক্ষা করছেন। আরো অনেক আত্মীয়স্বজনরা আসবেন। তাদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করে তিনি বাসায় কিছুদিন রেস্টে থাকবেন। এরপর আমরা পরিবারের সবাই মিলে বাইরে কোথাও ঘুরতে যাব।’

দীর্ঘ দুই মাসের ‘ঝঞ্ঝা’র পর স্বদেশে স্বজনদের মাঝে ফিরেছেন জলদস্যুদের হাত থেকে মুক্তি পাওয়া সেই ২৩ নাবিক। মঙ্গলবার (১৪ মে) চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি টার্মিনালে পৌঁছে স্বজনদের বুকে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁরা। বিকেল ৩টা ৫০ মিনিটের দিকে তাঁদের বহন করা লাইটারেজ জাহাজ এমভি জাহান মণি-৩ জেটিতে নোঙর করে। সেখানে তাদের লালগালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে।

এর আগে, বেলা ১২টার দিকে নতুন নাবিকদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর শেষে জাহাজটিতে করে তাঁরা বন্দর জেটির উদ্দেশে কুতুবদিয়া থেকে রওনা হন।

সোমবার (১৩ মে) সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটের দিকে জাহাজটি কুতুবদিয়ায় বঙ্গোপসাগরে নোঙর করে। একইদিন এমভি জাহান মণি-৩ নামে একটি লাইটারেজ জাহাজে করে ২৩ নাবিকের নতুন একটি টিম কুতুবদিয়ার উদ্দেশে রওয়ানা দেয়।

সিভয়েস/

আরও পড়ুন...

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়