Cvoice24.com

‘বড় ভাইয়ের’ দাপট দেখাতেই রাফি খুন!

রবিউল রবি, সিভয়েস২৪

প্রকাশিত: ১৮:২২, ১০ জুন ২০২৪
‘বড় ভাইয়ের’ দাপট দেখাতেই রাফি খুন!

‘আমরা বসে ঝালমুড়ি খাচ্ছিলাম। সেখানে কোন একটা সভাপতি মাসুদ ভাইয়ের ভাই লোকজন নিয়ে এসে আমাকে ডেকে নেয়। সেখানে আরেকটা ছেলে ছিল কাটগড় এলাকার তানজিব। আমি এই এলাকার না, আমি কিছু জানিও না। মাসুদ ভাইয়ের ওই ভাইটা আমাকে জিজ্ঞেস করে, আমি কি করছি। পরে ঘটনা খুলে বলার পর সে চলেও যায়। সেখানে তানজিবের সাথে ওদের (ভিকটিম) ঝামেলা হয়।’ — পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে দুই গ্রুপের মারামারিতে ছুরিকাঘাতে খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার এক আসামি এভাবেই ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলেন।  

রবিবার (৯ জুন) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় মোটরসাইকেলের সাইলেন্সার পাইপের শব্দ করাকে কেন্দ্র করে মারামারিতে কিশোর গ্যাং সদস্যদের ছুরিকাঘাতে খুন হন পোশাককর্মী মনিরুজ্জামান রাফি। বন্দর থানার মধ্যম হালিশহরের বাকের আলী ফকিটের টেক ইসমাইল মালুমের বাড়ির মোহাম্মদ রফিকের ছেলে। তিনি একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। 

সোমবার (১০ জুন) দুপুরে পোশাককর্মী মনিরুজ্জামান রাফি হত্যাকাণ্ডে ৭ আসামি গ্রেপ্তারের ঘটনায় বন্দর জোনের উপ-কমিশনারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে ওই আসামি সাংবাদিকদের কাছে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। 

রাফি হত্যাকাণ্ড নিয়ে ব্রিফিং করছেন বন্দর জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার শাকিলা সোলতানা।

পুলিশ জানায়, গভীর রাতে দুটি গ্রুপ পতেঙ্গা সৈকত এলাকায় ঘুরতে যায়। একপর্যায়ে সৈকতের গোলচত্বর এলাকায় মোটরসাইকেলের সাইলেন্সার পাইপে শব্দ করাকে কেন্দ্র করে উভয়পক্ষের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। বিষয়টি তাৎক্ষণিক সমাধান হলেও একপক্ষ প্রতিশোধের অপেক্ষায় টানেলের মুখে অবস্থান নেয়। সেখানে মারামারি একপর্যায়ে ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হন রাফি। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। পুলিশ এমনও বলছে, এটি তাৎক্ষণিক সৃষ্ট একটি ঘটনা। দুপক্ষই ঝগড়ায় লিপ্ত।

হত্যাকাণ্ডের ১৫ ঘণ্টার মধ্যে পতেঙ্গা থানা পুলিশ এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করে ৭ জনকে। তারা হলেন— কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণপাড়া থানার আকবর বাড়ির জাহিদুল ইসলাম (২২), কোতোয়ালী থানার কাজীর দেউড়ি এলাকার মোবারক হোসেন (২৩), সন্দ্বীপ উপজেলার মাইঠভাঙা ইকবাল হোসেন ইমন (২২), পতেঙ্গা থানার মাইজপাড়া এলাকার শাহরিয়ার আল আহমেদ (২০), একই থানার উত্তর পতেঙ্গা আবুল বাশারের বাড়ির জোবায়ের বাশার (৩৪), বন্দর থানার গোসাইলডাঙ্গা এলাকার তাহরিয়ার আহমেদ বাঁধন (২০) এবং হাটহাজারী থানার কাটিরহাট গ্রামের মো. মারুফ চৌধুরী (২১)।

কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় নিহত রাফি।

গ্রেপ্তার পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে নগর পুলিশের উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) শাকিলা সোলতানা বলেন, ‘গতকাল (রবিবার) ভোর ৪টার দিকে আমাদের কাছে সংবাদ আসে দুটি পক্ষের মধ্যে মোটরসাইকেলের সাইলেন্সারের শব্দ নিয়ে মারামারি হয়। এ সময় ৪ থেকে ৫ জনের যে গ্রুপটি ছিল তাদের ওপর ১০ থেকে ১৫ জনের একটি গ্রুপ হামলা করে। তাদের কাছে ছুরিও ছিল। এ সময় ছুরিকাঘাতে আহত দুজনকে তাৎক্ষণিকভাবে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সকাল ৯টার দিকে আহত ভিকটিম মনিরুজ্জামান রাফি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। এটি তাৎক্ষণিক সৃষ্ট একটি ঘটনা। দুপক্ষই ঝগড়া করেছে।’

৭ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এ ঘটনায় আমরা হালিশহর, বন্দর, পতেঙ্গা ও কোতোয়ালী থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে মোট ৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছি। তাদের জবানবন্দী অনুযায়ী আমাদের মনে হয়েছে, রাফি খুনের ঘটনার প্রকৃত আসামিদের আমরা ধরতে পেরেছি। তাদের মধ্যে মোবারক হোসেনের কাছ থেকে আমরা ছুরি উদ্ধার করেছি। আমরা তাদের আজ আদালতে পাঠাবো।’

খুনের নেপথ্যে ‘কিশোর গ্যাং’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সম্প্রতি বন্দর-পতেঙ্গা কেন্দ্রিক কয়েকটি কিশোর গ্যাং গ্রুপ তৈরি হয়েছে। এসব গ্যাং এর সদস্যরা চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক কারবার ও মারামারির সাথে জড়িত। স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী নেতাদের ছত্রছায়ায় তারা নিজেদের হিরোইজম দেখাতে খুন করতেও দ্বিধা করে না। অনেক সময় তারা মাদকের টাকা জোগাড় করতেও এসব অপকর্ম করে থাকে। 

মনিরুজ্জামান রাফির খুনের ঘটনার নেপথ্যেও রয়েছে কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা—এমন তথ্য দিয়েছে খোদ পুলিশ। নগর পুলিশের বন্দর জোনের ডিসি শাকিলা সোলতানা এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘এই খুনের সাথে জড়িতদের কিশোর গ্যাং হিসেবে ধরে নেওয়া যায়। কারণ যারা ঘটনাস্থলে ছিল তারা বয়সে বেশিরভাগ কিশোর। তারা যে সময়টিতে বিচে ছিল সেটি কোনোভাবেই বয়স হিসেবে উপযুক্ত ছিলো না। তারা বিচে গিয়েছিলো আনন্দ করতে। পূর্বপরিকল্পিত না হলেও যারা সেখানে গিয়েছিলো আমার মনে হয় তারা ভালো পরিবারের সন্তান না। আমার মনে হয় তারা কিশোর গ্যাং সদস্য হতে পারে।’ 

রাজনৈতিক পরিচয় আছে কিনা—এমন প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘রাজনৈতিক পরিচয় আমরা খতিয়ে দেখিনি। তবে এটা আমরা দেখবো তারা কোনো রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় আছে কিনা।’

এসব ঘটনার জন্য সামাজিক অবক্ষয়কে দায়ী করে তিনি বলেন, ‘এটা এক ধরনের সামাজিক অবক্ষয়। কেউ কাউকে সম্মান না করা বা সহ্য না করা। কিশোর বা তরুণদের ছোট খাটো বিষয়কেও ধৈর্যের সাথে মোকাবিলা না করার প্রবণতাও আমাদের সমাজে কমে গেছে।’

‘মা আমি ঈদে বোনাস পেলে কোরবানির টাকা দিব’

‘আমার একটা ছেলে। আমার ছেলে ছাড়া আর কেউ নাই। আমার ছেলেকে ওরা কিভাবে মারলো? আমার ছেলেটা কই? সোনার টুকরাটা কই? আমার কলিজাটা আর আমার কাছে আবদার করবে না। এবার কোরবানির ঈদে বোনাস পেয়ে আমাকে টাকা দিবে বলেছিলো। আমার ছেলে আর আমার সাথে কথা বলবে না।’— ছেলেকে হারিয়ে এমন আহাজারি পতেঙ্গায় কিশোর গ্যাংয়ের ছুরিকাঘাতে খুন হওয়া মো. মনিরুজ্জামান রাফির (২৫) মা জান্নাতুল ফেরদৌস মেরীর।

সোমবার (১০ জুন) দুপুরে বন্দর জোনের উপ-কমিশনারের কার্যালয়ে তাঁর এমন আহাজারিতে উপস্থিত অনেকের চোখে দেখা যায় জল। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে রাফির জন্মের এক বছরের মাথায় আমার ডিভোর্স হয়। এরপর আমি আর বিয়ে করিনি শুধু ওর দিকে চেয়ে। আমার মা নৌ বাহিনীতে চাকরি করার সুবাদে তার অবসর ভাতার টাকায় আমি তাকে মানুষ করেছি। কখনো বাজে কোনো কিছুর সাথে তাকে জড়াতে দিইনি।’

ছেলের সাথে কখন শেষ কথা হয়েছে— জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গতকাল রাত আড়াইটার দিকে তাকে আমি ফোন করি। জানতে চাই কই আছে? সে বলে, ‘মা তুমি চিন্তা করিও না। আমি চলে আসবো। তুমি গেইট লক করে দরজা বন্ধ করে ঘুমাও’। কিন্তু আমার তখন থেকেই দুশ্চিন্তা হয়। কারণ আমার ছেলে এত রাত পর্যন্ত বাইরে থাকে না। এরপর সকালবেলা ওর এক বন্ধু আমার কাছে ফোন দেয়। বলে রাফি নাকি এক্সিডেন্ট করে চট্টগ্রাম মেডিকেলে ভর্তি। এরপর আমি গিয়ে দেখি আমার ছেলেটা আর নাই।’ 

‘আমার ভাইকে বলে আমি ওকে চাকরিতে ঢুকিয়ে দিয়েছি। আমার ছেলে আমাকে বলেছে, ‘মা আমি ঈদে বোনাস পেলে কোরবানির টাকা দিব’। এখন আমার ছেলেটাকেই ওরা মেরে ফেললো। আমার কলিজার টুকরার মায়াভরা মুখ আমি আর দেখবো না। আমি আমার ছেলে হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই, ওদের ফাঁসি চাই।’ আহাজারি করতে করতে বলছিলেন মা ফেরদৌস মেরী।

আসামিদের চিৎকার—‘আমরা নির্দোষ’

বন্দর উপ-পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের একপর্যায়ে সাংবাদিকদের সামনে উপস্থিত করা হয় গ্রেপ্তার ৭ আসামিকে। তাদের মধ্যে কয়েকজন চিৎকার করে নিজেদের নির্দোষ দাবি করতে থাকেন।

গ্রেপ্তার একজন বলেন, ‘আমি রাত আড়াইটার দিকে গরুর হাটে ছিলাম। সেখান থেকে ফেসবুকে লাইভ দিয়েছি। এরপর হোটেলে ভাত খেয়ে বাসার দিকে রিকশায় চড়ে যাচ্ছি তখন পুলিশ আমাকে নিয়ে যায়।’

আরেকজন ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘আমার বাড়ি হাটহাজারী। পতেঙ্গায় আমার নানুবাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলাম। সেখানে একটা অনুষ্ঠান থেকে আমরা তিন খালাতো ভাই মিলে বিচে বেড়াতে যাই। সেখানে আমরা হাঁটছিলাম। এর মধ্যে কয়েকজন বাইক নিয়ে শোডাউন দিচ্ছিলো। তখন আমি একজনকে গালি দিই। পরে আবার আমি সরি বলে তাদের সাথে মিটমাট করে কোলাকুলি করি। ঘটনা সেখানেই শেষ।’

তিনি আরো বলেন, ‘এরপর আমরা বসে ঝালমুড়ি খাচ্ছিলাম। সেখানে কোন একটা সভাপতি মাসুদ ভাইয়ের ভাই লোকজন নিয়ে এসে আমাকে ডেকে নেয়। সেখানে আরেকটা ছেলে ছিলো কাটগড় এলাকার তানজিব। আমি এই এলাকার না, আমি কিছু জানিও না। মাসুদ ভাইয়ের ওই ভাইটা আমাকে জিজ্ঞেস করে, আমি কি করছি। পরে ঘটনা খুলে বলার পর সে চলেও যায়। সেখানে তানজিবের সাথে ওদের (ভিকটিম) ঝামেলা হয়।’ 

‘তখন আমরা এই মারামারি ঘটনা দেখে নিজেরাই এগিয়ে যাই। এরপর পুলিশ আমাদের সেখান থেকে ধরে নিয়ে আসে।’— বলেন গ্রেপ্তার ওই আসামি।

ওই সময় উপ-পুলিশ কমিশনার শাকিলা সোলতানা বলেন, ‘এখানে যারা আছে (গ্রেপ্তার) তারা কিছুই স্বীকার করবে না। এখানে যারা আছে তারা অনেকে হয়তো সম্পৃক্ত ছিলও না। এগুলো আমরা তদন্তের সময় যাচাই করবো।’ 

রাতের সৈকতে ‘মাদকের হাট’

অনুসন্ধান বলছে, পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে শতাধিক দোকানপাট। এসব দোকানের মধ্যে বেশিরভাগই কসমেটিকস, খাবার, খেলনা ও চা-কফির। এসব দোকান থেকে  দৈনিক ৩০০ টাকা করে চাঁদা তোলা হচ্ছে ‘পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত হকার ক্যামেরাম্যান শ্রমজীবী সমবায় লিমিটেড’ সমিতির ব্যানারে। এসব চাঁদাবাজির সাথে জড়িত ওই কথিত সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মাসুদ করিম ও স্থানীয় আরেকটি সিন্ডিকেটের প্রধান ওয়াহিদ মাস্টার। এদের মধ্যে মাসুদ করীম স্থানীয় সংসদ সদস্যের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনে পর্যটকমুখর এই সৈকত এলাকায় দোকানদারি স্বাভাবিকভাবে চললেও রাত হলেও যেন বসে ‘মাদকের হাট’। সমুদ্র এলাকায় মাদক ব্যবসা যেন এখন ‘ওপেন সিক্রেট’। সম্প্রতি সৈকতে ঘুরতে যাওয়া বন্দর এলাকার এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সৈকতের দোকানগুলোতে রাতে যে কেউ মাদক চাইলেই ‘ম্যানেজ’ করে দেন দোকানিরা। সেখানে বেশিরভাগ সময় গাঁজা, ইয়াবা এবং মদপান চলে প্রকাশ্যেই। এছাড়া পতিতাবৃত্তির সঙ্গে জড়িত কিছু নারী সেখানে ঘোরাফেরা করে পর্যটকদের বিরক্ত করে।

তবে, এতকিছু চললেও এসবের কোনো তথ্য নেই পুলিশের কাছে। উল্টো পুলিশের বিরুদ্ধেই অভিযোগ উঠেছে— দৈনিক ও মাসিক ভিত্তিতে পুলিশ এসব অবৈধ দোকান বাবদ মাসোহারা পায় তারা।  

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে এই জোনের উপ-কমিশনার শাকিলা সোলতানা সিভয়েস২৪-কে বলেন, ‘মাদক সংশ্লিষ্ট কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। তবে ওখানের দোকানগুলো অবৈধ সেটির বিষয়ে আমরাও জানি। আমি শুনেছি মাসুদ করিম নামে এক ব্যক্তি বিচ নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু অফিসিয়ালি কেউ অভিযোগ না করায় আমাদের পক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না।’

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়