image

আজ, শনিবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২০


মানসম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষা এবং আমাদের করণীয়

মানসম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষা এবং আমাদের করণীয়

মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন, জেলা প্রশাসক।

একটি শিশু বড় হয়ে কেমন হবে, শিশুটি কি রকম চরিত্রবান হবে, সে কতটুকু জাতীয় চেতনা বা আদর্শ ধারণ করবে কিংবা সমাজের প্রতি, দেশের প্রতি কতটুকু দায়িত্বশীল হবে তা অনেকাংশেই নির্ভর করে তার শৈশবের শিক্ষার উপর। নীতি নৈতিকতা বা আদর্শের এই বীজ রোপিত হয় পরিবারে, এরপর প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। প্রাথমিক পর্যায়েই শিশুর ছোট্ট কাঁধকে অধিক তাত্ত্বিক পড়াশোনার চাপে ভারি না করে দৈহিক, মানসিক, সামাজিক, নৈতিক ও নান্দনিক বিকাশ সাধন এবং উন্নত জীবনের স্বপ্ন দর্শনে উদ্বুদ্ধ করা উচিত। তাই একটি উন্নত মানবিক গুণাবলীসম্পন্ন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের image জন্য একটি আধুনিক প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার কোন জুড়ি নেই।

শিশুরাই একদিন শিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদ হয়ে দেশের হাল ধরবে এবং সার্বিক উন্নয়নে কাজ করবে। উন্নত রাষ্ট্র হওয়ার লক্ষ্যে সরকারের যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তা বাস্তবায়নে বর্তমান প্রজন্মকে এখন থেকে প্রস্তুত করতে হবে এবং সে প্রস্তুতির সূচনা হওয়া উচিত প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে। বর্তমান সরকার মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা এবং প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ মানবসম্পদ গড়ার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছে। বাস্তবায়িত হতে চলেছে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রণীত ‘রূপকল্প ২০২১’। 

বিদ্যালয়ে আনন্দময় পরিবেশ সৃষ্টি করে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ; মৌলিক বিষয়সমূহে এক ও অভিন্ন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচিতে পাঠদান; শিশুর মনে ন্যায়বোধ, কর্তব্যবোধ, শৃংখলা ও শিষ্টাচারের প্রতি অনুরাগ সৃষ্টি; শিশুকে কুসংস্কারমুক্ত ও বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা; মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্দীপ্ত করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মনে দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলাসহ আরো অনেকগুলো লক্ষ্য নিয়ে ২০১০ সালে প্রণয়ন করা হয় জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০।

‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)’ এর ৪ নং অভিষ্ঠ হলো ‘সকলের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং জীবনব্যাপী শিক্ষালাভের সুযোগ সৃষ্টি’। যার ৪.২ নং লক্ষ্যমাত্রা হলো ২০৩০ সালের মধ্যে সকল ছেলে মেয়ে যাতে প্রাথমিক শিক্ষার প্রস্তুতি হিসেবে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাসহ শৈশবের একেবারে গোড়া থেকে মানসম্মত বিকাশ ও পরিচর্যার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠে তার নিশ্চয়তা বিধান করা। 

‘সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি)’ অর্জনে বাংলাদেশ যে সফলতা দেখিয়েছে একই ভাবে এসডিজি অর্জনেও সফলতার জন্য প্রয়োজন গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করা। বর্তমান সরকার সেই লক্ষ্যে নির্বাচনী ইশতেহারে প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে তাদের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা তুলে ধরেছে। ইশতেহারের ৩.১৮ অনুচ্ছেদে আছে, ‘বাংলাদেশকে সম্পূর্ণভাবে নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করা হবে। প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হার শূণ্যে নামিয়ে আনতে হবে। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ঝরে পড়ার হার ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে।’ সর্বজনীন এবং গুণগত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণের জন্য সরকার কাজ শুরু করেছে এবং বিগত ১০ বছরে ব্যাপক সফলতাও লাভ করেছে। ২০১৩ সালে ২৬ হাজার ১৫৯টি রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারিকরণ করা হয়েছে। 

বিসিএস নন-ক্যাডার থেকে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ করে প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা প্রদান এবং সহকারী শিক্ষকদের বেতন দুই ধাপ উন্নীত করা হয়েছে। বিনামূল্যে বই বিতরণের পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী শিক্ষার্থীদের জন্য নিজেদের ভাষায় ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য ব্রেইল পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করা হচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ঝরে পড়া রোধে এবং অভিভাবকদের উৎসাহী করতে সকল ছাত্র-ছাত্রীকে শিক্ষাবৃত্তিসহ আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।

এছাড়া শিশুদের স্বাস্থ্য রক্ষা ও শারীরিক উন্নতির জন্য সারাদেশব্যাপী চালু করা হয়েছে ‘স্কুল ফিডিং’ প্রকল্প ও মিড-ডে মিল কার্যক্রম। কম্পিউটার ল্যাবসহ আধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্পন্ন স্কুল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য সহশিক্ষা কার্যক্রমের নতুন সংযোজন হল ‘বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্ট’ এবং ‘বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট’।

উন্নত বিশ্বের মতো প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এখনো কিছু চ্যালেঞ্জ আছে, যেগুলো মোকাবেলায় সামগ্রিকভাবে আমাদের কাজ করতে হবে। সকল শিশুর বিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিত করে এদের ঝরে পড়া রোধ করতে হবে, বিদ্যালয়সহ সকল স্থানে লিঙ্গ সমতা বিধান করতে হবে, পূর্ণ যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে, শ্রেণিকক্ষ অনুপাতে শিক্ষার্থী নিশ্চিত করতে হবে, দুর্বল শিক্ষার্থী চিহ্নিত করে তাদের বাড়তি যত্ন নিতে হবে।

এছাড়া দেখা যায় শহরতলী, প্রত্যন্ত এলাকা বা দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় কর্মজীবী শিশু, প্রতিবন্ধী শিশু ও মেয়ে শিশুরা শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে নিরাপত্তার ঘাটতির কারণে যৌন হয়রানি ও যৌন নিপীড়নের ভয়ে অভিভাবকেরা সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে নিরুৎসাহিত হয়ে থাকে। মেয়ে ও প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য উপযুক্ত পয়:নিষ্কাশন অবকাঠামো ও পানির ব্যবস্থা না থাকায় শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ এবং উপস্থিতিতে প্রভাব ফেলে। ফলে অনেক সময় অভিভাবকেরা বাল্য বিবাহের মতো সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়।

উল্লেখিত চ্যালেঞ্জগুলোর পাশাপাশি আরেকটি অনিবার্য চ্যালেঞ্জ আছে সেটা হল গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ। পাশের হারের চেয়ে গুরুত্ব দিতে হবে শিক্ষার মানের দিকে। প্রাথমিক পর্যায়ে তাত্ত্বিক পড়ালেখার পাশাপাশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত নৈতিক শিক্ষা ও দেশ প্রেমের দিকে। মূলত এই পর্যায়ে মানবিক গুণাবলী সম্পন্ন ভাল মানুষ কীভাবে হওয়া যায় সেটার প্রতি শিক্ষকদের গুরুত্ব দিতে হবে। আর বিদ্যালয়ের কার্যকারিতা, শিশুর উপযুক্ত শিক্ষণ পদ্ধতি ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের বিষয়গুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা উচিত। এছাড়া আমাদের দরকার বিবেচনাবোধসম্পন্ন একটি সচেতন নাগরিক সমাজ। যারা ঢালাওভাবে শুধু সিস্টেমের দোষারোপ করবে না, সমাজের বিভিন্ন সমস্যা মোকাবেলার মাধ্যমে একটি সুন্দর জাতি গঠনে নিজেরাও এগিয়ে আসবে।

শিক্ষাখাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করে একটি শিক্ষিত ও উন্নত জাতি গঠনের লক্ষ্যে, সর্বোপরি রূপকল্প ২০২১, ২০৪১ ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাকে বিবেচনায় নিয়ে সরকার যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সেক্ষেত্রে উল্লেখিত চ্যালেঞ্জগুলো অবশ্যই মোকাবেলা করতে হবে। তবেই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দক্ষ মানবসম্পদরূপে পরিণত হয়ে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন ও গতিশীল সমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়নে অবদান রাখতে পারবে।

লেখকঃ জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রাম।

সিভয়েস/এমআইএম/এএস

আরও পড়ুন

যুগের যাত্রায় যুবলীগ, জীবনের জয়গান যুবলীগ

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অন্যতম সহযোগী সংগঠন যুবলীগ। যার জন্মই হয়েছিল সময়ের বিস্তারিত

তারুণ্যকে টেনে নামানোর অপসংস্কৃতির রাহুগ্রাসে ‘এলিট’

একটি কৌতুক জীবনে চলার পথে দেখলাম বারবার সত্য প্রমাণ হয়, একজন আরেকজনকে বিস্তারিত

এলিটকে নিয়ে ‘অপপ্রচার’ ও কয়েকটি প্রশ্ন

একটা মহল বা গোষ্ঠী গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়েছেন, নিয়াজ মোরশেদ এলিটের পিতা বিস্তারিত

মার খেয়েও বলতে হবে, খবর ছাপব

‘আর মাইরেন না, নিউজ করব না’—এ কথাকে সমসাময়িক সাংবাদিকতার বাস্তবতা বলে বিস্তারিত

ওরা ধর্ষক, আমরা দর্শক!

ডিসকভারি চ্যানেলে বাঘ যখন তার হিংস্র থাবায় শিকারীকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে বিস্তারিত

আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ!

৫ জানুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সারা বাংলাদেশে একাধারে বিস্তারিত

একজন পুলিশ কনস্টেবল নেকবারের জন্য সহকর্মীর শোকগাথা  

পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি এ জীবন মন সকলি দাও। তার মত সুখ কোথাও কি বিস্তারিত

করোনা-আইসিইউ-শিল্পপতির মৃত্যু!

পানিভর্তি ড্রাম কিংবা পুকুরে নাক মুখ চেপে ধরলে যেমন হয় ঠিক সেই অবস্থা। অথবা বিস্তারিত

এক কোটি মানুষ বাঁচাতে পারে ১৬ কোটি মানুষকে!

ফেসবুকে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জিউসেপ কোঁতের কান্নার ছবিটি ভাইরাল হতে বিস্তারিত

সর্বশেষ

মাস্ক না পরে ঘোরাঘুরি, ১১৭ জনকে জরিমানা

করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়ে গেলেও সামাজিক দূরত্ব ও বিস্তারিত

ট্রেনে কাটা পড়ে ভাই-বোনের মৃত্যু

ছুটির দিনে মিরসরাই উপজেলার বাওয়াছড়া লেকে বেড়াতে গিয়ে বাড়ি ফেরার পথে বিস্তারিত

৯ মাস পর ‘পিতার গৌরবগাঁথা’য় খুললো শিল্পকলা

দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের শুরুতেই বন্ধ হয়ে যাওয়া চট্টগ্রাম শিল্পকলা বিস্তারিত

তর সইছে না রেজাউলের, পরিস্থিতি দেখছেন শাহাদাত

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) স্থগিত নির্বাচন ঘিরে মাঠের লড়াইয়ে ফের সরব বিস্তারিত

সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত, এই ওয়েব সাইটের যেকোন লিখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ন বেআইনি

close image