Cvoice24.com

ছয় জোনে ভাগ করে চলবে চট্টগ্রাম ওয়াসার স্যুয়ারেজ প্রকল্পের কাজ

সিভয়েস প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৭:৫২, ৭ আগস্ট ২০২২
ছয় জোনে ভাগ করে চলবে চট্টগ্রাম ওয়াসার স্যুয়ারেজ প্রকল্পের কাজ

প্রতিষ্ঠার ৫৮ বছরে সুপেয় পানি সরবরাহ করে আসছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। তবে নগরের জন্য আধুনিক ও বাস্তবসম্মত স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা ছিল অবহেলিত। ফলে নগরের বর্জ্যসমূহ খাল-নালা হয়ে পড়ছে কর্ণফুলী ও হালদা নদীতে। আইনি জটিলতা কেটে যাওয়ায় সংস্থাটি নগরের জন্য স্যুয়ারেজ (পয়োঃনিস্কাশন) প্রকল্পের কাজ পুরোদমে শুরু করেছে। ছয়টি জোনে ভাগ হয়ে চলবে পুরো প্রকল্পের কাজ। 

ওয়াসার কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে ২০৩৫ সালের মধ্যে চট্টগ্রাম নগরের স্যুয়ারেজ ব্যবস্থার আওতায় আসবে। বাসা-বাড়ির বর্জ্য ও পানি পাইপলাইনের মাধ্যমে পরিশোধনাগার হয়ে নদী ও সাগরে গিয়ে পড়বে। ফলে নগরের কোনো সেপটিক ট্যাংকের প্রয়োজন পড়বে না।   

চট্টগ্রাম ওয়াসা সূত্রে জানা যায়, ওয়াসার স্যুয়ারেজ প্রকল্পটি দুই ধাপে কাজ করবে। এর মধ্যে সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমন্টের আওতায় (এসটিপি) রান্না ঘর, গোসল এবং অন্যটি ফিকেল স্ল্যাজ কালেকশন (এফএসটিপির) আওতায় টয়লেটের বর্জ্য সংগ্রহ করা হবে। এক্ষেত্রে গ্রাহকের বাসায় স্যুয়ারেজের পাইপলাইন বসানো হবে। ওই পাইপলাইনের সহায়তায় গৃহস্থালি ও গোসলের ব্যবহার করা পানি সরাসরি ক্যাচমেন্ট এরিয়ার পরিশোধনাগারে চলে যাবে। সেখানে এসব পানি পরিশোধিত হয়ে নদী ও সাগরে গিয়ে পড়বে। এক্ষেত্রে নগরের ছয়টি ক্যাচমেন্টে এরিয়ায় পানি পরিশোধনাগার বসানো হবে। 

তবে কারিগরি যাচাই-বাছাইয়ের সময় দেখা যায়, নগরের কিছু অলি-গলি ছোট ও সরু হওয়ায় নগরের ৩০ ভাগ এলাকায় স্যুয়ারেজের পাইপলাইন স্থাপনের সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে ফিকেল স্ল্যাজ কালেকশন (এফএসটিপির) আওতায় টয়লেটের বর্জ্যসমূহ ভ্যাকুয়াম ট্রাক ও গাড়িতে করে পরিশোধনাগারে নেওয়া হবে। সেখানে পরিশোধনের পর নদী ও সাগরে গিয়ে মিশবে। এছাড়া প্রকল্পের স্বার্থে নগরের বস্তি এলাকার অস্বাস্থ্যকর টয়লেটগুলো পরিচ্ছন্ন রাখা হবে। স্যুয়ারেজ লাইনের সংযোগের ফলে বৃষ্টি ছাড়া ওই সব এলাকায় ড্রেনে কোনো পানি থাকবে না।

এক্ষেত্রে নগরের হালিশহরের ১৬৩ একর ভূমিতে ক্যাচমেন্টে-১ এর পরিশোধনাগার এরিয়া হিসেবে ধরা হয়েছে। মালয়েশিয়ান কারিগরি প্রতিষ্ঠান জেবিও এরিনকো ক্যাচমেন্ট এরিয়ায় মাঠ পর্যায়ের কার্যাদেশ পায়। এই ক্যাচমেন্ট এরিয়াকে তিনটি প্যাকেজের মাধ্যমে দুটি চীনা ও একটি কোরিয়ান প্রতিষ্ঠানকে দরপত্র দেওয়া হয়েছে। 

এছাড়া ক্যাচমেন্ট-২ (কালুরঘাট) এরিয়া ও ক্যাচমেট-৪ (পূর্ব বাকলিয়ার) অংশের কারিগরি দিক নিয়ে কাজ করছে জাইকা। তিনটি প্যাকেজের মধ্যে নেটওয়ার্কিংয়ের কাজ যৌথভাবে বাংলাদেশ ও চীন এবং আরেকটি কাজ করছে চীনের প্রতিষ্ঠান। 

ক্যাচমেন্ট-১ এর কাজ হলে প্রাথমিকভাবে প্রায় ২০ লাখ নাগরিককে স্যুয়ারেজের সুবিধা দেওয়া। এর মধ্যে ১০ লাখ এসটিপি (সরাসরি পাইপলাইন) এবং ১০ লাখ ফিকেল স্ল্যাজ ম্যানেজমেন্টের (বর্জ্য সংগ্রহ) আওতায় আসবে। এর মধ্যে এসটিপি দৈনিক ১০ কোটি লিটার এবং এফএসটিপিতে তিনশো টন পানি পরিশোধন করা সম্ভব হবে।

অন্যদিকে কোরিয়ান এক্সিম ব্যাংকের অর্থায়নে ক্যাচমেট-৩ (ফতেয়াবাদ) এরিয়ায় কারিগরি বিশেষজ্ঞ নিয়োগের কাজ চলছে। এছাড়া ক্যাচমেট-৫ (উত্তর কাট্টলী) এফডিএর মাধ্যমে কারিগরি সহায়তার কাজ করছে। এরপর প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য একনেকে পাঠানো হবে। একনেকের অনুমোদন পেলে তিন থেকে চার মাসের মধ্যে এই ক্যাচমেন্ট প্রকল্পের দরপত্র নিয়োগ দেওয়া হবে। 

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি (পিপিপি) মডেলের আওতায় ক্যাচমেন্ট-৬ (কাস্টমস মোড়) এরিয়ার কাজ হবে। এক্ষেত্রে জাপানি একটি কোম্পানি অর্থ সহায়তা দেওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে ক্যাচমেন্টে-১ এর উত্তর ও পশ্চিমে ক্যাচমেট-৫ ও ক্যাচমেন্ট-৬ হওয়ায় ১৬৩ একর ভূমির ওপর আরও এই দুইটি ক্যাচমেন্ট পরিশোধনগার স্থাপনের চিন্তা করছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। এছাড়াও স্যুয়ারেজ ব্যবস্থায় পানি পরিশোধনের পর আলাদা হয়ে যাওয়া বর্জ্য মিথেন গ্যাস তৈরি করে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা ভাবছেন তারা। 

প্রকল্পের কাজে বিলম্বের কারণ:

২০১৮ সালের জুলাইয়ে কাগজে কলমে স্যুয়ারেজের কাজ শুরুর কথা থাকলেও, ওই বছরের নভেম্বরে এটি একনেকে অনুমোদন পায়। অনুমোদনের সময় ২০২৩ সালের জুনে কাজ শেষ করার সময়সীমা বেধে দেওয়া হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা ওয়াসা ২০১৯ সালের নভেম্বরে কারিগরিবিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেয়। এর মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণ নিয়ে আইনি জটিলতা ও করোনা মহামারীর কারণে দু বছরের বেশি সময় ধরে প্রকল্পের কাজ পিছিয়ে যায়। এমনকি স্যুয়ারেজের কাজটি জটিল ও সময়সাপেক্ষে হওয়ায় প্রকল্পটি একনেকে পাঠানোর সময় সাত বছরের সময় চাওয়া ওয়াসা। তবে ২০২৬ সালে জুনে প্রকল্পটি কাজ শেষ হওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। 

জানতে চাইলে ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও স্যুয়ারেজের প্রকল্প পরিচালক মো. আরিফুল ইসলাম সিভয়েসকে বলেন, বিশেষজ্ঞ ও সকল সেবা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে নগরের জন্য আধুনিক ও বাস্তবসম্মত স্যুয়ারেজের কাজ শুরু হয়েছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ২০৩৫ সালের মধ্যে পুরো নগরকে স্যানিটেশন ব্যবস্থায় আনা হবে। প্রাথমিক ক্যাচমেন্টের কাজ শেষ হলে ২০ লাখ গ্রাহক এর সুবিধাভোগী হবেন। নাগরিকদের সহায়তা পেলে স্যুয়ারেজের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করা সম্ভব হবে।

ওয়াসার তথ্যমতে, ১৯৬৩ সালে চট্টগ্রাম ওয়াসার পথচলা শুরু হয়। ওই বছরের নগরের পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার লক্ষ্যে নগরের চৌচালা এলাকায় ১৬৩ একর জমি অধিগ্রহণ করে চট্টগ্রাম ওয়াসা। তবে দাতা সংস্থার অভাবে এই প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখেনি। ২০১৫ সালে সংস্থাটি পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্পের মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ শুরু করে। এ প্রকল্পটি গ্রহণের পর চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনস (চসিক), পরিবেশ অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বন্দরসহ সকল সেবা সংস্থার সমন্বয়ে একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ করা হয়। এর সঙ্গে চুয়েট ও নগর পরিকল্পনাবিদরাও যুক্ত হন। বিশেষজ্ঞ ও সেবা সংস্থার পরামর্শে ২০১৭ সালে স্যুয়ারেজের মাস্টারপ্ল্যানের কাজ শেষ হয়। এরপর ডেনমার্কভিত্তিক একটি কারিগরি প্রতিষ্ঠান জেবি অব এরিঙ্কো প্রকল্পটির কারিগরি বিষয়ে কাজ শুরু করে।  কারিগরি পর্যায়ের যাচাই-বাছাই শেষে ২০১৮ সালের ৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম ওয়াসার পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়। এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮ শো ৮ কোটি টাকা। সরকারের নিজস্ব তহবিল (জিওবি) এবং ওয়াসার ৫০ কোটি টাকার অর্থায়নে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে।

সিভয়েস/আরকে

Add

সর্বশেষ

    পাঠকপ্রিয়