Cvoice24.com

প্রাইমারি স্কুলের দপ্তরি কাম নাইটগার্ডও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের পদের দাবিদার 

সিভয়েস প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২২:৩২, ১০ আগস্ট ২০২২
প্রাইমারি স্কুলের দপ্তরি কাম নাইটগার্ডও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের পদের দাবিদার 

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের কমিটিতে উপ-প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদকের পদ পেয়েছেন মিজানুর রহমান। ফটিকছড়ির নানুপুর এলাকার এই মিজানুর রহমান শিক্ষাজীবনে পার হননি স্কুলের গণ্ডিও। বর্তমানে তিনি একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরি কাম নৈশ প্রহরী হিসেবে চাকুরী করছেন। ৩৩ বছর বয়সী মিজানুর রহমান বিয়েও করেছেন ঘটা করে, সেই বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি বখতেয়ার সাঈদ ইরানও। মোদ্দা কথা ছত্রলীগের কমিটিতে পদ পাওয়ার ক্ষেত্রে যত রকমের অযোগ্যতা থাকা সম্ভব তার সবই রয়েছে মিজানুর রহমানের। 

এত সব অযোগ্যতা নিয়ে মিজানুর রহমান কিভাবে জেলা ছাত্রলীগের পদ পেলেন? সেই প্রশ্ন উঠতেই জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম জানিয়েছেন মূলত জেলা ছাত্রলীগের পদে থাকা মিজানুর রহমান আর প্রাইমারি স্কুলের দপ্তরি মিজানুর রহমান এক নন। যদিও এই কথা বলার দুই দিন পর ফটিকছড়ি থেকে জেলা ছাত্রলীগের পদ পাওয়া নেতা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিমের নেতৃত্বে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য খাদিজাতুল আনোয়ার সনির সাথে দেখা করে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন মিজানুর রহমান। এছাড়াও মিজানুর রহমান রেজাউল করিমকে সম্বোধন করেন তার ভাই বন্ধু হিসেবে, আর বখতেয়ার সাইদ ইরান হলেন তার ‘প্রিয় নেতা’ ও  ‘হাজারো নেতা তৈরির কারিগর’। 

অন্যদিকে ছাত্রলীগের পদ নিয়ে এমন হঠকারিতায় ক্ষুব্ধ চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের নেতারা। তারা এসব কিছুর জন্য দায়ী করছেন বখতেয়ার সাঈদ ইরানকেই। যদিও বখতেয়ার সাঈদ ইরান বলছেন, বোনের বিয়ে নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত থাকায় কমিটি গঠনের বিষয়ে কিছুই জানেন না তিনি। যে বোনের বিয়ে নিয়ে ইরান ভীষণ ব্যস্ত ছিলেন সেই বোনের বিয়েতেও স্কুলের দপ্তরি থেকে জেলা ছাত্রলীগের নেতা বনে যাওয়া মিজানুর রহমানও ছিলেন দাওয়াতপ্রাপ্ত মেহমান।

 

তবে বখতেয়ার সাঈদ ইরান সিভয়েসকে জানিয়েছেন, মিজানুর রহমান নামে কাউকে মনে করতে পারছেন না তিনি। এই বিষয়ে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি। পাশাপাশি চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের কমিটি করার ক্ষেত্রে কেন্দ্র যথেষ্ট যাচাই বাছাই ও সমন্বয় করেনি মন্তব্য করে এসব কিছুর জন্য কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগকে দায়ী করেছেন ইরান। 

গত ৩১ জুলাই মধ্য রাতে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের ৩১৬ সদস্যের ঢাউস কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। ৩ বছর আগে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়া এই কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ছিল দীর্ঘদিন ধরেই। 
কেন্দ্র ঘোষিত সেই কমিটিতে উপ-প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে পদ পাওয়ার দাবি করেন ফটিকছড়ির নানুপুর ইউনিয়নের মিজানুর রহমান। স্থানীয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাকে পদ পাওয়ায় অভিনন্দনও জানান। 

সিভয়েসের হাতে আসা কিছু নথি অনুযায়ী মিজানুর রহমান নানুপুর গাউসিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরী কাম নৈশ প্রহরী হিসেবে চাকরি করছেন। তার মাসিক বেতন ১৪ হাজার ৪৫০ টাকা। বছর তিনেক আগে অনুষ্ঠান করে বিয়েও করেন তিনি। সেই মিজানুর রহমান কিভাবে জেলা ছাত্রলীগের পদ পেলেন এই বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম সিভয়েসকে বলেন, ‘এখানে একটা ভুল হয়েছে। জেলা ছাত্রলীগে যিনি পদ পাইছে তিনি হাটহাজারীর বাসিন্দা। সবাই তার জায়গায় ফটিকছড়ির মিজানকে মনে করছে।’ 

এদিকে মিজানুর রহমানকে জেলা ছাত্রলীগের নেতা হিসেবে যারা অভিনন্দন জানাচ্ছেন তারা সকলেই ফটিকছড়ির স্থানীয় রাজনীতিতে রেজাউল করিম ও বখতেয়ার সাঈদ ইরানের অনুসারি হিসেবে পরিচিত। এমনকি ফটিকছড়ি থেকে জেলা ছাত্রলীগের পদ পাওয়া নেতাদের কয়েকজন মিলে রেজাউল করিমের নেতৃত্বে সংরক্ষিত সংসদ সদস্য খাদিজাতুল আনোয়ার সনির সাথে দেখা করেন গত ৭ আগস্ট সন্ধ্যায়, যেখানে মিজানুর রহমানও ছিলেন। সেখানে ফটিকছড়ি উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জামাল উদ্দিনও উপস্থিত ছিলেন। তারা এমপি সনির সাথে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। 

সেই শুভেচ্ছা বিনিময়ের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করে জেলা ছাত্রলীগের কমিটিতে সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ পাওয়া রিয়াজ মোহাম্মদ নুরুল আমিন লিখেছেন, ‘ফটিকছড়ির জননন্দিত জননেতা সাবেক এমপি মরহুম আলহাজ্ব রফিকুল আনোয়ারের সুযোগ্য কন্যা, মাননীয় সংসদ সদস্য, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্হায়ী কমিটির সদস্য, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আমাদের শ্রদ্ধেয় অভিবাবক জনাবা খাদিজাতুল আনোয়ার সনি আপুর সাথে চট্টগ্রাম উত্তরজেলা ছাত্রলীগের বিপ্লবী সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম ও জেলা ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দসহ শুভেচ্ছা বিনিময়....’ 

এই বিষয়ে জানতে রেজাউল করিমকে আবার ফোন দেয়া হলে তিনি সিভয়েসের সম্পাদক কে জানতে চান। তারপর একটা বিষয় নিয়ে লেগে থাকায় সাংবাদিকের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেন তিনি। এরপর দুই মিনিট পর কল দিয়ে এই বিষয়ে কথা বলবেন জানিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন তিনি। 

অন্যদিকে মিজানুর রহমানের সাথে কথা বলতে তার মুঠোফোন নম্বরে কল করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে রং নম্বর বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন মিজানুর রহমান। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিজের টাইমলাইনে দেয়া একটা স্ট্যাটাসে মিজানুর রহমান লিখেছেন, ‘আমাকে নবগঠিত চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগ এর পূর্ণাঙ্গ কমিটির উপ-প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক হিসবে মনোনীত করায় আমার প্রিয় নেতা হাজারো ছাত্রনেতা তৈরির কারিগর চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের প্রভাবশালী সদস্য শ্রদ্ধেয় বখতিয়ার সাঈদ ইরান ভাই ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের বিপ্লবী সাধারণ সম্পাদক, মেধাবী ছাত্রনেতা যার সার্বিক দিক নির্দেশনায় আমার এই অর্জন প্রিয় ভাই মোহাম্মদ রেজাউল করিমের অশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। 

এসব বিষয়ে কথা বলতে জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি বখতেয়ার সাঈদ ইরানের সাথে যোগাযোগ করা হলে সিভয়েসকে তিনি বলেন, ‘আমি কমিটি করার এক মাস আগে থেকে আমার বোনের বিয়ে নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। কমিটির বিষয়ে আমি কিছুই জানিনা।’

মিজানুর রহমানের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মিজানুর রহমান নামে কাউকে মনে পড়ছেনা আমার।’ তিনি মিজানুর রহমানের বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন, এমনকি তার বোনের বিয়েতেও মিজানুর রহমান উপস্থিত ছিল এই বিষয়টি উল্লেখ করে মিজানুর রহমানকে মনে করানোর চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত মিজানুর রহমানকে মনে করতে পারেননি ইরান। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের দপ্তর সম্পাদক ইন্দ্রনীল দেব শর্মা সিভয়েসকে বলেন, ‘কমিটির ক্ষেত্রে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে আমরা ব্যবস্থা নিব বলেছি। কেউ যদি লিখিত অভিযোগ দেয় আমরা দেখবো। তবে এখন পর্যন্ত আমরা কোন লিখিত অভিযোগ পাইনি।’ এর আগে বখতেয়ার সাঈদ ইরান সিভয়েসকে বলেছিলেন, 'কেন্দ্র নতুন কমিটি অনুমোদন দেয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট যাচাই-বাছাই করেনা, সমন্বয়ও করেনা। এসব কারণেই বিতর্কের সৃষ্টি হয়।'

সিভয়েস/এআরটি

Add

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়