Cvoice24.com

নিজেদের ভোটও পায়নি বিএনপি

সিভয়েস প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৬:৪৯, ২৮ জানুয়ারি ২০২১
নিজেদের ভোটও পায়নি বিএনপি

গ্রাফিকস : আলম দিদার

সংঘাত-প্রাণহানীর মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচনে ভোট বিপর্যয় ঘটেছে বিএনপির। দলটির মেয়র প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন হারিয়েছেন জামানত। গত নির্বাচনে দুপুরের মধ্যেই ভোট বর্জনের ঘোষণা দিলেও স্বয়ং নবনির্বাচিত মেয়র রেজাউল করিমের ওয়ার্ডেই বিএনপি প্রার্থী ৮ হাজার ৬৩২ ভোট পেয়ে প্রথম হয়েছিলেন। সেখানে এবার ধানের শীষ পেয়েছে মাত্র ৬৮টি ভোট! অথচ সমর্থক ও সাধারণ ভোটার বাদ দিলেও দলের কেন্দ্র কমিটি ও পোলিং এজেন্ট মিলিয়ে এই ওয়ার্ডে ৭৩২ ভোট পাওয়ার কথা ছিল। তার মানে, বিএনপি এখন এজেন্টসহ নিজেদের ভোটও পাচ্ছে না।   

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরী ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫৯ ভোটের বিশাল ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন। যদিও এ ভোট বিপর্যয়কে ‘ভোট ডাকাতি’ বলছে বিএনপি। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের দাবি, এটা বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতারই চিত্র। 

হারার পর সরকারি দলের কারচুপি, হামলা–মামলা, কর্মীদের দাঁড়াতে না দেওয়া, কেন্দ্রে এজেন্ট দিতে বাধা দেওয়া, ভোটারদের আসতে না দেওয়াসহ নানা অভিযোগ তোলেছে বিএনপি। কিন্তু এখন আলোচনায় আসছে শুধু সরকারি দলের কারণেই কী নির্বাচনে হারছে বিএনপি, নাকি নিজেদের ব্যর্থতাও রয়েছে। 

বিএনপির কয়েকজন তৃণমূল নেতা বলছেন— এই নির্বাচনে সাংগঠনিক কী ধরনের দুর্বলতা ছিল, কোথায় কোথায় ব্যর্থতা রয়েছে, সেগুলো খোঁজে বের করে সংশোধন করা উচিত। কেননা প্রচার প্রচারণায় সরব থাকা নেতাকর্মীরাও ভোটের দিন গা ঢাকা দিয়েছিল। এছাড়া চট্টগ্রামের মধ্যম সারির নেতাদের ছাড়া ডা. শাহাদাত বিএনপির জাতীয় নেতাদের তেমন পাশে পাননি। একজন আমীর খসরুকে পেলেও তার সক্রিয় অংশগ্রহণ তেমন চোখে পড়েনি। প্রধান নিবার্চনী এজেন্ট নিয়োগ করা হলেও শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রামেই আসেননি দলের ভাইস-চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান। পরে নির্বাচনের চারদিন আগে তার পরিবর্তে নগর কমিটির সদস্য সচিব আবুল হাশেম বক্করকে সেই দায়িত্ব দেওয়া হয়। 

শুরু থেকে তৃণমূল কিছুটা উজ্জীবীত থাকলেও সাংগঠনিক দুর্বলতা পরীলক্ষিত ছিল বিএনপির মধ্যে। নেতারা বলছেন— মিডিয়াবাজি না করে নেতারা যদি ভোটের মাঠে মাটি কামড়ে পড়ে থাকতো, বাধা এলেও প্রতিহত করতো, তাহলে সিলেটের মত অবশ্যই বিজয় আসতো। প্রশাসন ও আওয়ামী লীগ পিছু হটতে বাধ্য হতো তখন। কিন্তু বিএনপির সিনিয়র নেতারা সেই পথে না গিয়ে সকালেই মাঠ ছেড়ে দিয়েছিল। 

বিএনপির মহানগর নেতারা অবশ্য বলছেন— বিএনপিকে সরকারের পাশাপাশি পুলিশ, প্রশাসন এবং সরকারদলীয় নেতাকর্মীদেরও মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এতগুলো শক্তির সঙ্গে ‘লড়াই’ করা দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় না থাকা দলটির জন্য কঠিন হয়ে উঠছে। ভোটাররা অবশ্য তাদের সঙ্গেই আছেন। তবে দল হিসেবে বিএনপির সাংগঠনিক ব্যর্থতা, ভোটারদের উজ্জীবিত করতে না পারায় নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পেছনে কাজ করছে। তারা মনে করেন, সমর্থকরাই এখন বিএনপির ওপর আস্থা রাখতে পারছে না। এ কারণে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভোটকেন্দ্রে যাচ্ছেন না তারা। আর এ সুযোগটাই নিচ্ছে সরকারি দল। 

নবনির্বাচিত মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীর ওয়ার্ড পূর্ব ষোলশহরে ধানের শীষের ডা. শাহাদাত হোসেন পেয়েছেন কেবল ৬৮ ভোট। আর বিএনপির কাউন্সিলর প্রার্থী পেয়েছেন ৭৩ ভোট। অন্যদিকে ১৪ কেন্দ্রে গঠিত ওই ওয়ার্ডে বুথ সংখ্যা ১০৪টি। সেই হিসাবে তাদের পোলিং এজেন্টের সমানও ভোট পায়নি দলটি। ৪১ হাজার ৭৫৫ ভোটারের এই ওয়ার্ডে নৌকা ৬ হাজার ৬৩১ ভোট পেয়েছে। আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীর ঘুড়ি প্রতীকে পড়েছে ৬ হাজার ৬৬১টি ভোট। 

অথচ ২০১৫ সালের নির্বাচনে এই ওয়ার্ডে ভোটার ছিল ৩৭ হাজার ৬০৫ জন। সেবার ভোট পড়েছিল ১৭ হাজার ৫৪৮টি। এর মধ্যে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী মনজুর আলম কমলা লেবু প্রতীকে ৮ হাজার ৬৩২ এবং আওয়ামী লীগের আ জ ম নাছির উদ্দিন হাতি প্রতীকে পেয়েছিলেন ৭ হাজার ৯৬ ভোট। অর্থাৎ রেজাউলের ওয়ার্ডে সেবারের ভোটে নাছির হারলেও এবার কিন্তু একেবারে ধরাশায়ী হয়েছেন ডা. শাহাদাত। 

জানা যায়, ১৪ ভোটকেন্দ্রের ১০৪টি বুথে বিএনপির মেয়র, পুরুষ ও নারী কাউন্সিলর মিলিয়ে (১০৪X৩) মোট ৩১২ জন পোলিং এজেন্ট নিয়োগ করার কথা। এছাড়া ১৪ কেন্দ্রে ৩০ জন করে হলেও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য থাকার কথা ৪২০ জন। পাশাপাশি ওয়ার্ড কমিটি তো আছেই। সে হিসাবে তালিকাভূক্ত বিএনপির একনিষ্ট ৭৩২ নেতাকর্মী ভোটের মাঠে থাকার কথা ছিল। অথচ দলটির মেয়র প্রার্থী ওই ওয়ার্ডে ভোট পেয়েছেন কেবল ৬৮টি! বিএনপি থেকে অবশ্য দফায় দফায় জানানো হয়েছিল, তারা যে কোনো সমস্যা মোকাবেলা করতে কৌশলগত কারণে দুই সেট করে এজেন্ট প্রস্তুত রেখেছে।  

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী মো. হাসান লিটন সিভয়েসকে বলেন, ‘এজেন্ট বা কর্মীর কথা কি বলবো! এই ওয়ার্ডে বিএনপির এজেন্ট বা নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ছাড়াও সমর্থক প্রচুর। গত নির্বাচনেও আমরা জিতেছি। কিন্তু এবার আর ঘর থেকে বের হতে পারিনি। নির্বাচনের দিন চান্দগাঁও থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান নিজে এসে আমার মাকে সম্বোধন করে গালি দিয়ে কেন্দ্রে যেতে নিষেধ করেছেন। কেন্দ্রে গেলে আমাদের তুলে নিয়ে যাওয়ারও হুমকি দিয়েছেন। আমরা কীভাবে এ ফলাফলের উপর আস্থা রাখবো?’

শুধু পূর্ব ষোলশহরেই নয়; ৭৩৩ ওয়ার্ডের ঘোষিত ফলাফলে দেখা যায়, ধানের শীষ এক ভোটও পায়নি এমন কেন্দ্রের সংখ্যা দুটি। ১ ভোট পেয়েছে ২৫টি কেন্দ্রে। ২ ভোট ৩৭ কেন্দ্রে। ৩ ভোট ২৮ কেন্দ্রে। ৪ ভোট ১৪ কেন্দ্রে। ৫ ভোট ১৫ কেন্দ্রে। ৬ ভোট ১২ কেন্দ্রে। ৭ ভোট ১৭ কেন্দ্রে। ৮ ভোট ১৪ কেন্দ্রে। ৯ ভোট ৪ কেন্দ্রে। ১০ ভোট ১৫ কেন্দ্রে। ১১ থেকে ২০ ভোট ৮৭ কেন্দ্রে। ২১ থেকে ৩০ ভোট ৫৪ কেন্দ্রে। ৩১ থেকে ৪১ ভোট ৪৮ কেন্দ্রে। ৪১ থেকে ৫০ ভোট ৪৩ কেন্দ্রে। ৫১ থেকে ১০০ ভোট ১৩০ কেন্দ্রে। ১০১ থেকে ১৫০ ভোট ৮৬ কেন্দ্রে। ১‌৫১ থেকে ২০০ ভোট ৩৯ কেন্দ্রে। ২০১ থেকে ৩০০ ভোট ৩৪ কেন্দ্রে। ৩০১ থেকে ৪০০ ভোট ১৭ কেন্দ্রে। ৪০১ থেকে ৫০০ ভোট ৭ কেন্দ্রে। 

সব মিলিয়ে ১০ ভোটের নিচে ভোট পড়েছে ১৮৭ কেন্দ্রে আর চারশ'র উপরে ভোট পড়েছে মাত্র ৭টি কেন্দ্রে। এমনকি ডা. শাহাদাত হোসনের নিজ কেন্দ্র বাকলিয়া বিএড কলেজ কেন্দ্রে তিনটি সেন্টারে ধানের শীষ ভোট পেয়েছে ৫৪ ভোট আর বিএনপির ঘরে নৌকা প্রতীক পেয়েছে ১১৫৯ ভোট। 

২০১৫ সালের নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী মনজুর আলম ১২টার মধ্যে ভোট বর্জন করেও ভোট পেয়েছিলেন ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৮৩৭টি, যা অংশ নেওয়া ভোটের শতকরা হার ৩৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ। সেবার বিএনপির মেয়র প্রার্থী কেবল তিনটি কেন্দ্রে অনেক কম ভোট পেয়েছিলেন। ২০১০ সালের নির্বাচনে একটি কেন্দ্রে সর্বনিম্ন ভোট পেয়েছিলেন ৯০টি। কিন্তু এবারের নির্বাচনের ফলাফল একেবারেই শোচনীয়।   

বিএনপির এই ভরাডুবি বিষয়ে জানতে চাইলে নগর বিএনপির আহ্বয়ক ও মেয়র প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘এখানে ভরাডুবির কথা আসে কীভাবে? আমাদের এজেন্টদের দায়িত্ব পালন করতে দেওয়া হয়নি, বের করে দেওয়া হয়েছে, মারধর করা হয়েছে। আমি নির্বাচনী কেন্দ্রে কেন্দ্রে ঘুরে যা দেখেছি, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। এ কথাগুলো গতকাল (বুধবার) সকাল থেকে আমি বলেছি। আপনারা দেখেছেন, বিশ্ববাসী দেখেছে, নির্বাচনের নামে নগরবাসীর সঙ্গে কী প্রহসনটাই না করা হয়েছে। যা হয়েছে ভোট ডাকাতি। সেখানে এই রেজাল্ট কোনো অর্থ বহন করে না। এটা মোটেই আমাদের সাংগঠনিক দুর্বলতা নয়।’

নির্বাচনের সুষ্ঠতা ও কম ভোটার কেন্দ্রে আসার কারণ জানতে চাইলে আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও চসিক নিবাচনের রিটার্নিং অফিসার মুহাম্মদ হাসানুজ্জামান বলেন, ‘আমরা ফ্রি-ফেয়ার নির্বাচন করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছিলাম। কিন্তু অধিকাংশ ভোটাররা ভোট দিতে আসেননি। কেন আসেননি, তা তারাই জানেন। তবে নির্বাচনে কোনো ধরনের কারচুপি হয়নি।’

সম্পর্কিত বিষয়:

Nagad

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়