Cvoice24.com

৬২ ভুঁইফোড় সংগঠনের নাম চট্টগ্রামের গোয়েন্দা সংস্থার খাতায় 

সিভয়েস প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৬:৪৬, ৩১ জুলাই ২০২১
৬২ ভুঁইফোড় সংগঠনের নাম চট্টগ্রামের গোয়েন্দা সংস্থার খাতায় 

নিজেদের স্বার্থ হাসিলে নামের আগে ও পরে ‘আওয়ামী লীগ’ ও ‘বঙ্গবন্ধুর’ নাম জুড়ে যেসব সংগঠন গড়ে উঠেছে সেই সব সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে হার্ড লাইনে সরকার। ইতোমেধ্যে চাকরিজীবী লীগ নামের একটি সংগঠন করতে গিয়ে র‌্যাবের হাতে ঢাকায় গ্রেপ্তারও হয়েছেন হেলেনা জাহাঙ্গীর নামে এক নারী ব্যবসায়ী। এসব ভুঁইফোড় সংগঠনের তালিকা ধরে প্রথমে এর উদ্যোক্তাদের খোঁজ নেওয়া হচ্ছে পরে তাদের পৃষ্টপোষকদের বিষয়েও খোঁজ নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে। 

তারই ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রামে অস্তিত্ব রয়েছে এরকম ৬২টি ভুঁইফোড় সংগঠনের তালিকা প্রস্তুত করেছে সরকারের একটি প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থা। তালিকা ধরে তাদের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। তবে এখনই কাউকে গ্রেপ্তারের মত সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে যারা এসব সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত তাদের বিষয়ে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।  

জানা যায়, নামের আগে-পরে লীগ, বঙ্গবন্ধু, বঙ্গমাতা, শেখ রাসেল এবং মুক্তিযুদ্ধ যুক্ত করে গড়ে ওঠা ভুঁইফোড় সংগঠনগুলোর বেশিরভাগই ফেসবুকে একটি পেজ কিংবা দিবসভিত্তিক কিছু ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে তারা তৎপর থাকে। নামসর্বস্ব এসব সংগঠনের কার্যত কোনো কমিটি, কার্যালয় বা গঠনতন্ত্র নেই। কিছু সংগঠন ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়কে তাদের দলীয় কার্যালয় হিসেবে প্যাডে উল্লেখ করে জেলায় জেলায় কমিটি দিয়ে থাকে। দিবসভিত্তিক অনুষ্ঠান বা চলমান রাজনৈতিক বিষয়ে আলোচনার নামে অনুষ্ঠান ও মানববন্ধন কর্মসূচি করে থাকে। তবে তাদের মূল কাজ হলো, নিজেদের স্বার্থ হাসিল করা। প্রশাসন ও সরকারি অফিসে তদবির বাণিজ্যে লিপ্ত থাকার পাশাপাশি ভূমি দখলের অভিযোগও রয়েছে তাদের। অনেকের আবার রেলওয়েসহ সরকারি জমি দখল করে কার্যালয় গড়ে তোলে এসব সংগঠনের কার্যক্রম চালানো প্রমাণ পেয়েছে চট্টগ্রামের গোয়েন্দারা।  

যদিও আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রে দলটির আটটি সহযোগী ও দুটি ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন রয়েছে। সহযোগী সংগঠনগুলো হলো, যুবলীগ, কৃষক লীগ, তাঁতী লীগ, যুব মহিলা লীগ, মহিলা লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও আওয়ামী লীগ আইনজীবী পরিষদ ও মৎস্যজীবী লীগ। আর ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন দুটি হলো ছাত্রলীগ ও শ্রমিক লীগ। গঠনতন্ত্রে না থাকলেও চিকিৎসকদের পেশাজীবী সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসা পরিষদ, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, শেখ রাসেল শিশু-কিশোর, বঙ্গবন্ধু শিশু-কিশোর মেলাসহ কয়েকটি সংগঠনকে স্বীকৃতি দেয় আওয়ামী লীগ। 

কিন্তু এর বাইরে যেসব সংগঠন রয়েছে সেগুলোকে ভুঁইফোড় সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে আওয়ামী লীগ। 

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এ এফ এম বাহাউদ্দিন নাসিম তাঁর ফেসবুকে এক পোস্টে বলেছেন, ‘ময়ূরের পেখম লাগালেই কাক কখনো ময়ূর হয় না। তেমনি নামের সঙ্গে “লীগ” শব্দ ব্যবহার করলেই আওয়ামী লীগ হয়ে যায় না। আওয়ামী লীগ একটা আদর্শ। এটাকে ধারণ করতে হয়। দলের গঠনতন্ত্রের বাইরে কোনো সংগঠনের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক নেই।’

আওয়ামী লীগের উপ প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমীন সিভয়েকে বলেন, ‘ রাজনীতি করতে হবে সেবার ব্রত নিয়ে। রাজনীতিতে একটা দর্শন আছে সংগঠনের নিয়ম আছে। যদি কেউ আওয়ামী লীগ বা তার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন করতে চায় তাহলে তাকে আগে ঘোষণাপত্র পড়তে হবে। সেখানে স্পষ্ট করেই সব উল্লেখ আছে। এখন কেউ যদি নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য কখনো আওয়ামী লীগ কখনো বঙ্গবন্ধু বা শেখ হাসিনা জুড়ে দিয়ে সংগঠন খোলে বসে তাতে দল হিসেবে আমাদের করার কিছু নেই। তবে সে বিষয়ে অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবস্থা নিতে পারে। ইতোমধ্যে এরকম দোকানদারদের বিরুদ্ধে অ্যাকশন শুরু হয়েছে। সামনেও যারা এসব দোকান খোলে অপকর্ম করে বেড়াবে আওয়ামী লীগের নামের সাথে বদনামি যুক্ত করার চেষ্টা করবে তাদের কাউকে ছাড় দিবে না সরকার।’

তিনি আরও বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বা তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে কোনো সংগঠন করতে হলে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’–এর অনুমোদন নিতে হয়। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধা সংক্রান্ত সংগঠনের ক্ষেত্রে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) অনুমোদন দিয়ে থাকে। কিন্তু ভুঁইফোড় সংগঠনগুলো অনুমোদনের ধার ধারে না। তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই সরকার ব্যবস্থা নিবে।’ 

ঢাকাভিত্তিক তবে চট্টগ্রামে অস্তিত্ব রয়েছে এরকম ৬২ টি ভুঁইফোড় সংগঠনের কার্যক্রমের খোঁজ পেয়েছে সরকারের প্রভাবশালী একটি গোয়েন্দা সংস্থা। ইতোমধ্যে তাদের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া শুরু হয়েছে। তবে এখনই গ্রেপ্তার করা না হলেও তারা নজরদারিতে রয়েছে। 

চট্টগ্রামে যে ৬২ টি ভুঁইফোড় সংগঠনের কার্যক্রম গোয়েন্দাদের খাতায় ঠাঁই মিলেছে সেগুলো হলো— ১. জননেত্রী শেখ হাসিনা কেন্দ্রীয় লীগ, ২. জননেত্রী শেখ হাসিনা কেন্দ্রীয় সংসদ, ৩. আওয়ামী প্রচার লীগ, ৪. আওয়ামী সমবায় লীগ, ৫. আওয়ামী তৃণমূল লীগ, ৬. আওয়ামী ছিন্নমূল হর্কাস লীগ, ৭. আওয়ামী মোটরচালক লীগ, ৮. আওয়ামী তরুণ লীগ, ৯. আওয়ামী রিক্সা মালকি-শ্রমিক ঐক্য লীগ, ১০. আওয়ামী যুব হর্কাস লীগ, ১১. আওয়ামী মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগ, ১২. আওয়ামী পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা লীগ, ১৩. আওয়ামী পরিবহন শ্রমিক লীগ, ১৪. আওয়ামী নৌকার মাঝি শ্রমিক লীগ, ১৫. আওয়ামী ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী লীগ, ১৬. আওয়ামী যুব সাংস্কৃতকি জোট, ১৭. বঙ্গবন্ধুর আর্দশ ও চতেনা গবেষণা পরিষদ, ১৮. বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগ, ১৯. বঙ্গবন্ধু একাডেমি, ২০. বঙ্গবন্ধু নাগরিক সংহতি পরষিদ, ২১. বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন, ২২. বঙ্গবন্ধু লেখক লীগ, ২৩. বঙ্গবন্ধু প্রজন্ম লীগ, ২৪. বঙ্গবন্ধু যুব পরিষদ, ২৫. বঙ্গবন্ধু ছাত্র পরিষদ।

২৬. বঙ্গবন্ধু স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ, ২৭. বঙ্গবন্ধু বাস্তুহারা লীগ, ২৮. বঙ্গবন্ধু আওয়ামী হকার্স ফেডারেশন, ২৯. বঙ্গবন্ধুর চিন্তাধারা বাস্তবায়ন পরিষদ, ৩০. বঙ্গবন্ধু ডিপ্লোমা প্রকৌশলী পরিষদ, ৩১. বঙ্গবন্ধু গ্রাম ডাক্তার পরিষদ ৩২. বঙ্গবন্ধু নাগরিক সংহতি পরিষদ, ৩৩. বঙ্গবন্ধু গবষেণা পরিষদ, ৩৪. বঙ্গবন্ধু আর্দশ পরিষদ, ৩৫. আমরা মুজিব সেনা, ৩৬. আমরা মুজিব হবো, ৩৭. চেতনায় মুজিব, ৩৮. বঙ্গবন্ধুর সৈনিক লীগ, ৩৯. মুক্তিযোদ্ধা তরুণ লীগ, ৪০. নৌকার সমর্থক  গোষ্ঠী, ৪১. দেশীয় চিকিৎসক লীগ, ৪২. ছিন্নমূল মৎস্যজীবী লীগ, ৪৩. ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী লীগ, ৪৪ নৌকার নতুন প্রজন্ম, ৪৫. ডিজিটাল ছাত্রলীগ, ৪৬. ডিজিটাল আওয়ামী প্রজন্ম লীগ, ৪৭. ডিজিটাল আওয়ামী ওলামা লীগ, ৪৮. বাংলাদশে আওয়ামী পর্যটন লীগ, ৪৯. ঠিকানা বাংলাদেশ, ৫০. জনতার প্রত্যাশা। 

৫১. রাসেল মেমোরিয়াল একাডেমি, ৫২. জননেত্রী পরষিদ, ৫৩. দেশরত্ন পরিষদ, ৫৪. বঙ্গমাতা পরিষদ, ৫৫. বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব পরিষদ, ৫৬. আমরা নৌকার প্রজন্ম, ৫৭. আওয়ামী শিশু যুবক সাংস্কৃতিক জোট, ৫৮. তৃণমূল লীগ, ৫৯. একুশে আগস্ট ঘাতক নির্মূল কমিটি, ৬০. আওয়ামী প্রচার লীগ, ৬১. ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্মচারী লীগ ও  ৬২. নৌকার নতুন প্রজন্ম লীগ।

এছাড়া বিভিন্ন ক্লাব ও পাড়া ভিত্তিক বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ, মুক্তিযোদ্ধা, এসব নামে গড়ে ওঠা সংগঠনের তালিকাও করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে ওই গোয়েন্দা সূত্র। 

চট্টগ্রামে গড়ে উঠা এস ভুঁইফোড় সংগঠনের কার্যক্রম প্রসঙ্গে নগর আওয়ামী লীগ আ জ ম নাছির উদ্দীন সিভয়েস বলেন, ‘আমাদের সেক্রেটারি কাদের ভাইয়ের স্পষ্ট নির্দেশনা এসব ভুঁইফোড় সংগঠনকে কোনও ভাবে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। চট্টগ্রামে যারা দলের নাম বদনামি করে এসব সংগঠন করবে তাদের বিষয়ে প্রশাসন ব্যবস্থা নিবে। আমাদের দলের পদধারীরা আশা করি সামনে আর এদের কোনও প্রোগ্রামে যাবে না।’

Add

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়