Cvoice24.com

নেতাদের ব্যখ্যা/ কমিটি জটেই লংঘিত গঠনতন্ত্র, সবাইকে খুশি করতে ঢাউস কমিটি

সিভয়েস প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২২:৪২, ২ আগস্ট ২০২২
কমিটি জটেই লংঘিত গঠনতন্ত্র, সবাইকে খুশি করতে ঢাউস কমিটি

দীর্ঘ বছর ধরে দুই নেতার কমিটিতেই আটকে ছিল চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ। কমিটি নিয়ে তৃণমূলে যখন ক্ষোভের দানা বেঁধে বিস্ফোরণের অপেক্ষা; ঠিক জাতির পিতাকে হারানো শোকের মাসের প্রথম প্রহরেই ফেসবুকে প্রকাশিত হয় চট্টগ্রামের অন্যতম এ দুই ইউনিট ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি। শোকের মাসের শুরুতে কমিটি দিয়েই পদবঞ্চিতদের ক্ষোভকে দমানোর কৌশল করলেও তাদের সেই কৌশল তেমন কাজে আসেনি। কমিটি ঘোষণার পরই অনলাইন-অফলাইনে ক্ষোভে ফেটে পড়েছে চট্টগ্রামের ত্যাগী নেতাকর্মীরা।

উত্তর জেলার কমিটিতে প্রায় ইউনিয়নই পদধারী নেতা পেলেও ফটিকছড়িসহ কয়েক জায়গায় বিক্ষোভ মিছিল-সমাবেশ হয়েছে। কিন্তু ক্ষোভের আগুনের বারুদ জ্বলে উঠেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। রীতিমত দুই দিন ধরে আগুন জ্বালিয়ে শাটল ট্রেনের চালককে অপহরণ করে প্রধান ফটকে তালা দিয়ে আন্দোলন করে আসছিল পদবঞ্চিতরা। অথচ এ চবি ছাত্রলীগের ঢাউস কমিটিতে স্থান পেয়েছে ৩৭৬ সদস্য। সবাইকে খুশি করার এই কমিটি দিয়েও শোকের মাসকে ব্যবহার করে আন্দোলকে দমাতে পারেনি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। যদিও শিক্ষা উপমন্ত্রীর ফেসবুক স্ট্যাটাসে ক্ষোভের বর্হিপ্রকাশ দেখে আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেয় আন্দোলনরত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

মূলত গঠনতন্ত্রের বাইরে তিন চার গুণ সদস্য নিয়ে করা এসব কমিটিতে অছাত্র, মামলার আসামি ও অযোগ্য অনেককেই পদ দেয়ার পাশাপাশি ত্যাগীদের মূল্যায়ন করা হয়নি দাবি পদবঞ্চিতদের। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এসব কমিটি নিয়ে ব্যাপক ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করছেন নেটিজেনরা। 

তবে ছাত্রলীগের পদ পাওয়া নেতারা বলছেন— তারা রাজনীতি করে স্বীকৃতি পাচ্ছেন। এক্ষেত্রে দীর্ঘদিন নিয়মিত কমিটি না দেয়ায় যে জট সৃষ্টি হয়েছে সেই জট সামাল দিতে গিয়েই অনিয়ম করতে হচ্ছে। সে অনিয়মের দায় তাদের না; কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের।  

অন্যদিকে বিভিন্ন সময়ে ছাত্রলীগের দায়িত্ব পালন করা নেতারা বলছেন— মাঠে রাজনীতি করা নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক পরিচয় দিতে গিয়ে কমিটি বড় হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, নিয়মিত কমিটি করার ক্ষেত্রে বাধা কোথায়? 

সাবেক ছাত্রলীগ নেতারা বলছেন— স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের হস্তক্ষেপসহ পরিস্থিতি বিবেচনায় তৃনমূলে নিয়মিত সম্মেলন করতে পারেননা তারা। তবে ছাত্রলীগকে ঘিরে ক্রমাগত যে বিতর্ক তা সামাল দিতে এই পুরো বিষয়গুল নিয়েই গভীরভাবে ভেবে সমাধান খোঁজার তাগিদ দিচ্ছেন তারা। পাশাপাশি পরিস্থিতি মোকাবেলায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের আরও সমন্বয় ও সংষ্কার নিয়ে ভাবারও পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।

আগস্টের প্রথম প্রহরের ঠিক কয়েক মিনিট আগে গত রবিবার (৩১ জুলাই) মধ্যরাতে ছাত্রলীগের অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কমিটি প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যের স্বাক্ষর করা ১২ পাতায় ৩৭৬ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটির তালিকা ছাত্রলীগের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে আপলোড করা হয়। তবে এই ৩৭৬ সদস্যের বাইরে দুই পাতায় আরও ৫৪ জনের তালিকা পাওয়া যায়। যদিও পরের ৫৪ জনের বিষয়ে কেউই নিশ্চিত করতে পারেনি। 

অন্যদিকে চট্টগ্রাম উত্তর জেলার ৩১৬ সদস্যের কমিটিতে গণহারে শুধু সহ-সভাপতিই করা হয়েছে ৮৩ জনকে। এসব কমিটিতে অছাত্র, বিবাহিত, হত্যাসহ মাদক মামলার আসামিদের পদ দেয়ার বিস্তর অভিযোগ ওঠেছে। কমিটি ঘোষণার পর থেকে উত্তপ্ত হয়ে উঠে চট্টগ্রামের রাজনীতির মাঠ। বিক্ষুদ্ধ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের আন্দোলনে বলতে গেলে প্রায় দুই দিন অচলই ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। পরিস্থিতি এতটাই উত্তাপ ছড়িয়েছিল যে বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া দিয়ে নিজের বিরক্তির কথা জানাতে বাধ্য হন সরকারের শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। চবিতে আন্দোলনকারীদের অধিকাংশই শিক্ষা উপমন্ত্রীর অনুসারি হিসেবে পরিচয় দেন। যদিও মন্ত্রী বরাবরই তা অস্বীকার করে আসছেন।

মঙ্গলবার (২ আগস্ট) সকালে নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেইজে দেয়া ওই স্ট্যাটাসে শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল লিখেছেন— ‘ছাত্র সংগঠনের পদ-পদবীর বিষয়ে কোনো দাবি দাওয়া থাকলে সংগঠনের যেকোনো কর্মী, নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনা করতে পারে। কোনো সাংগঠনিক দাবি থাকলে সেটি সংগঠনকে সাথে নিয়ে সমাধান করা যায়। কিন্তু সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ বিনষ্ট করা, ভাংচুর করা, অপহরণ করা, অপরাধের হুমকি দেয়া, হত্যার হুমকি দেয়া কোনোভাবেই ছাত্র সংগঠনের আদর্শিক কর্মীর কাজ হতে পারেনা। যারা এসব করছে তারা নিজেদের ব্যক্তি স্বার্থেই অরাজকতা করছে, এদের কাছে সংগঠন বা শিক্ষার মূল্য আছে বলে মনে হয়না। নিজেদের সাংগঠনিক দাবিতে অপরাধমূলক সহিংসতা যারা করছে, তাদের বিষয়ে সংগঠন এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অত্যন্ত কঠোর হওয়া প্রয়োজন।’

এর পরই সংবাদ সম্মেলন করে দুইদিন ধরে চলা আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেয় চবিতে আন্দোলনরত ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছাত্রলীগের কমিটি ও পদ প্রাপ্তদের নিয়ে চলছে ব্যাপক ব্যাঙ্গ বিদ্রুপ। 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের ঢাউস সাইজের কমিটিকে খোঁচা দিয়ে একজন লিখেছেন, ‘বাদ যাবে না কোনো শিশু। আমরা সবাই নেতা এই জোবরা রাজত্বে।’

ওই স্ট্যাটাসের নিচেই আরেকজন কমেন্ট করেছেন এভাবেই, 'সকাল থেকে গোনা শুরু করসি। এখনো সহ-সভাপতির লিস্ট শেষ করতে পারিনি।’  

তবে এই ধরণের উপহাসের জবাবে ছাত্রলীগের কর্মী সমর্থকরা দিচ্ছেন পাল্টা যুক্তি। তেমনই একজন আতিকুর রহমান ফাহিম। চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের কমিটিতে সহ সভাপতির পদ পাওয়া এই নেতা সিভয়েসকে বলেন, ‘একেকটা ছেলে ৮ থেকে ১০ বছর রাজনীতি করছে। এদেরকে পোস্ট দেয়াই লাগে... এখন কমিটি হচ্ছে অনেক বছর পর পর। তো প্রতি বছরতো ছাত্রলীগের নতুন নেতাকর্মী তৈরি হচ্ছে। যাদের মূল্যায়িত করা দরকার তাদেরকে করছে। যেহেতু লবিং এর জন্য বাদ দিতে পারছেনা তাই যারা রাজপথে রাজনীতি করছে তাদেরকে কমিটিতে জায়গা দিয়ে। অনেক বছর পর তাদের এক সাথে মূল্যায়ন করতে গিয়ে কমিটি বড় হয়ে যাচ্ছে। যদি দুই বছর পর পর ঢাকার মতো কমিটি দিতো তাহলে এগুলো হতো না। কিন্তু ওদের ঘাম রক্ততো আর পরিচয়হীন রাখাটাকেও সমর্থন করেনা।’ 

এক্ষেত্রে তৃণমূলে নিয়মিত কমিটি দিতে না পারাকেই মূল সমস্যা মনে করছেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের আগের কমিটির দুই শীর্ষ নেতা বখতেয়ার সাঈদ ইরান ও মোহাম্মদ আবু তৈয়ব। 

কেন নিয়মিত সম্মেলন করা যায় না— এমন প্রশ্নের জবাবে সিভয়েসকে বখতেয়ার সাঈদ ইরান বলেন, 'উপজেলা পর্যায়ে অথবা জেলা পর্যায়ে এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ে বিভিন্ন জটিলতার কারণে নিয়মিত সম্মেলন করা যায়না। এখানে আওয়ামী লীগ যুবলীগ ছাত্রলীগ সবার সমন্বয় লাগে। সবার সহযোগিতা লাগে একটা সম্মেলন করতে গেলে। এখন রাজনৈতিক বিভিন্ন পরিবেশ মিলিয়ে সবসময় সবজায়গায় তৃনমূলে নিয়মিত সম্মেলন করা যায়না।’

আর এর প্রভাব জেলা ইউনিটগুলোতেও পরে মন্তব্য করে উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আবু তৈয়ব সিভয়েসকে বলেন, ‘ইউনিয়ন উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিত সম্মেলন করতে না পারায় জেলার সম্মেলনও নিয়মিত হয়না। কিন্তু ঢাকায়তো প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভানেত্রী এককভাবে দেখেন ফলে কেন্দ্রের সম্মেলন নিয়মিত হলেও জেলার সম্মেলন নিয়মিত হয়না এবং এই কারণে এক সাথে অনেক ত্যাগী নেতাকর্মীকে এক সাথে মূল্যায়ন করতে হয়।’

তবে এক্ষেত্রে একসাথে নেতা কর্মীদের মূল্যায়ন করতে গিয়ে যে হজবরল একটা অবস্থার তৈরি হয় সে বিষয়ে বখতেয়ার সাঈদ ইরান বলেন, ‘যোগ্যতার মাপকাঠিটা আরও সচ্ছতার সাথে মূল্যায়ন করা উচিত। তাছাড়া কেন্দ্র খুব একটা সমন্বয় করে বা যাচাই করে কেন্দ্রীয় কমিটি দেয়না। আরও যাচাই বাছাই করা দরকার সমন্বয় করা দরকার।' 

অন্যদিকে আবু তৈয়ব বলেন, ‘নিয়মিত সম্মেলন ও কমিটি দেয়া ছাড়া দিনের পর দিন চলা এই বিতর্কের কোন সমাধান আসলে হবেনা। এক্ষেত্রে যেসব জায়গায় গঠনতান্ত্রিক সংশোধন দরকার সেগুলোও করতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত সম্মেলন করার ক্ষেত্রে যেসব বাঁধা সেসব চিহ্নিত করে সমাধান করতে হবে।’

তবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিটির আকার বড় হওয়াকে খারাপ মনে করার কোন যুক্তি দেখছেন না বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম  এ খালেদ চৌধুরী। তিনি সিভয়েসকে বলেন, ‘আসলে আমি নিজেও ২২১ সদস্যের কমিটি করেছিলাম। এর পরের কমিটিতে ২৬১ জনকে রাখা হয়। এবার ৪০০ এরও বেশি ৷ এই বেশি হওয়াটাকে আমি মনে করি যৌক্তিক। কারণ আগে ভার্সিটিতে ছাত্র ছিল ১০ হাজারের কম বেশি। এখন ২৪ হাজারের মত শিক্ষার্থী। তাহলে ছাত্রদের প্রতিনিধিত্বকারীও বাড়বে না? কথাটা আমি কমিটির আকার নিয়ে বলছি। বাকি যেসব কথা অছাত্রদের পদ দেয়া বা অন্যান্য বিতর্ক সেগুলো নিয়ে আমি কথা বলতে চাইনা। এটা কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ বলবে।’

যেহেতু বিষয়টা যৌক্তিক তাহলে কেন গঠনতন্ত্র সংশোধন করে কমিটির আকার বাড়ানোর বিষয়টাকে বৈধ করার দাবি উঠছে না— সিভয়েসের এমন প্রশ্নের জবাবে খালেদ বলেন, ‘এটি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের বিষয়, আর এখন যারা ছাত্রলীগ করে তারা জানে। তবে আমি মনে করি কমিটি বড় হওয়াটা অযৌক্তিক না।’

এই বিষয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিষয়ক উপ-সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন বকুল সিভয়েসকে বলেন, ‘মাঝখানে আসলে করোনাকালীন সময়ে দুই বছর রাজনীতি স্থবির ছিল। সে সময় সম্মেলন করা যায়নি, পরবর্তীতে যখন কমিটি পুর্ণাঙ্গ করার বিষয় আসে তখন স্থানীয় সিনিয়র নেতাদের বিভিন্ন মত পার্থক্যের কারণে এই বিষয়গুলো অনেকটাই বিলম্বিত হচ্ছে। তবে নিয়মিত সম্মেলন হওয়া উচিত।'

এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের এমন খবরদারি মেনে ছাত্রলীগ কেন বার বার বিতর্কিত হচ্ছে এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘রাজনীতি করতে গেল ছাত্র সংগঠনগুলো স্থানীয়ভাবে স্থানীয় নেতাদের দ্বারা পরিচালিত হয় যেহেতু সুবিধা অসুবিধা যেকোন কিছু তারাই দেখাশুনা করে। যদিও কোন অকারেন্স ঘটলে দায় দায়িত্ব ছাত্রলীগের ঘাড়ের উপর আসে। তবে ছাত্রলীগের নেতারা চেষ্টা করে সকলের সাথে সমন্বয় করে একটা সুন্দর কমিটি করা। কিন্তু সেটা অনেক সময় হয়ে উঠেনা। সেটাও স্থানীয় সিনিয়র নেতাদের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের কারণে।’

সিভয়েস/এআরটি

Add

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়