Cvoice24.com

জিইসি ডুবলো কার ‘দোষে’

সিভয়েস প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২১:১৬, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩
জিইসি ডুবলো কার ‘দোষে’

ফকফকে আকাশ, টগবগে রোদ। বৃষ্টির ছিঁটেফোটাও নেই। তবুও হাঁটু পানিতে ডুবেছে নগরের জিইসি মোড়। সকাল গড়িয়ে বিকেল, পানি নামেই না। দিনব্যাপী কাজ করে চসিকের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা ‘আবিস্কার’ করে সরু নালার ভেতরে সেবা সংস্থার পাইপে আটকে ছিল বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বোতল আর ককশিট। যার কারণে সহজে পানি নামছিল না।

চসিক বলছে, কালভার্টের ভেতরের নালায় থাকা সেবা সংস্থার পাইপের মুখে আবর্জনা আটকে এ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি। কোন সংস্থার পাইপে আটকে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে আর ময়লাগুলো কিভাবে এলো খোঁজা হচ্ছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম ওয়াসার দাবি, ড্রেন-নালা পরিষ্কার থাকে না বলেই এমন পরিস্থিতি। আর শনিবার শহরের ব্যস্ততম সড়কে এমন দুর্ভোগের কথা জানেই না কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (কেজিডিসিএল)। তবে প্রশ্ন, নালার পানিতে জিইসির রাস্তা ডুবলো কার দোষে!

জানা গেছে, জিইসি মোড়ে পুলিশ বক্সের পাশে সিটি ব্যাংকের দিক থেকে সেন্ট্রাল প্লাজার দিকে সড়কের নিচ দিয়ে একটা কালভার্ট রয়েছে। ফ্লাইওভারের মিড আইল্যান্ডের নিচে তিন ফুট প্রশস্তের একটা নালার ভেতরে সেবা সংস্থার পাইপের মুখে কঠিন বর্জ্য আটকে গিয়ে বাঁধের মত হয়ে গেলে সেখানে আর পানি নিষ্কাশন হতে পারেনি। যে কারণে সেন্ট্রাল প্লাজার বিপরীতে পুলিশ বক্সের সামনে থেকে ইউনেস্কো শপিং কমপ্লেক্স পর্যন্ত সড়কে পায়ের গোড়ালি সমান উচ্চতার জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। তাতে করে ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে পথচারীদের। পরবর্তীতে ওইদিন (১৬ সেপ্টেম্বর) রাত ১২টার দিকে কালভার্টের নিচ থেকে মাটি সরিয়ে দিলে সড়কের পানি নেমে যায়।

চসিক সূত্রে আরও জানা যায়, কুসুমবাগ আবাসিক এলাকা, ইউনেস্কোসহ আশেপাশের এলাকার নালা হয়ে পানি প্রবাহের রাস্তা এ কালভার্ট। মার্কেট, বসতবাড়ি আর মানুষের চাপ বাড়ায় এই কালভার্টের উপরও চাপ বেড়েছে। একইসাথে ড্রেনের ভেতর পকেট লাইনগুলোতে অপরিকল্পিতভাবে সেবা সংস্থার পাইপ বসানোর কারণে পানি প্রবাহের পথে কঠিন বর্জ্য জমে-জমে এ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। জিইসি মোড়ের কালভার্টের নালার ভেতর সেবা সংস্থার পাইপ বসানোর কারণে পানি প্রবাহের রাস্তায় আবর্জনা জমে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। 

এ বিষয়ে চসিকের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতি কাউন্সিলর মোবারক আলী সিভয়েসকে বলেন, 'সড়কের নিচ দিয়ে যাওয়া কালভার্টের ভিতরে সেবা সংস্থার পাইপের সাথে আবর্জনা আটকে গিয়ে জিইসি মোড়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছিল। এটা ওয়াসা নাকি গ্যাসের পাইপ সে বিষয়টা এখনো আমরা ক্লিয়ার হতে পারিনি। ওয়াসা এবং গ্যাস আমরা দুই পক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। উনারা এসেছেনও। একদিকে যেহেতু নালার প্রশস্ততা কম আর পানি যাওয়ার মত জায়গা থাকলেও ময়লা যাওয়ার মত জায়গা নাই। তাই এক্ষেত্রে তাদের পাইপগুলো কিভাবে যাবে সেটার বিষয়ে তাদেরকে আমরা চিঠি পাঠাবো।'

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, ‘আবর্জনার মধ্যে ছিল বেশিরভাগ ককশিট বোতল প্লাস্টিকসহ এ জাতীয় কঠিন বর্জ্য। আশেপাশে যেহেতু শপিং কমপ্লেক্স বা দোকান আছে সেহেতু সব জিনিসের মধ্যে ককশিট বা বোতল জাতীয় জিনিসগুলো আছে তাই কোন দিক থেকে এ আবর্জনা আসছে সেটা এখন খুঁজে বের করে সমাধানের চেষ্টা চলছে। গতরাতেই পানি নেমে গেছে। এখন পানি নেই। এখন কোন সংস্থার পাইপে ময়লা আটকে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে সেটাই খোঁজা হচ্ছে।’

নালায় থাকা সেবা সংস্থার পাইপে বর্জ্য আটকে থাকার প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহ সিভয়েসকে বলেন, ‘আমাদের পাইপে সমস্যা থাকলে তো পানি সরবরাহ করতে পারতাম না। ড্রেন ব্লকেজ হয়ে এ অবস্থা হয়েছে। এরকম আরও তিন থেকে চারবার হইছে। ড্রেন-নালা পরিষ্কার থাকে না বলে এমন হয়েছে। পাইপে বা ড্রেনে ময়লা আটকে গেছে পরিষ্কার করে ফেলবে এখানে দোষারোপের কি আছে— প্রশ্ন রাখেন ওয়াসার এমডি।

একই বিষয়ে জানতে চাইলে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসেস ডিভিশনের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. শফিউল আজম খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে এই বিষয় সম্পর্কে তিনি জানেন বলে জানান।

অন্যদিকে, কড়া রোদের মধ্যে জিইসি মোড়ের মতো এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখে রীতিমতো বিস্ময় প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। 

তারা বলছেন— চসিকের প্রধান ও মুখ্য কাজ নগরের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সড়ক আলোকায়ন ও জনসাধারণের চলাচলের রাস্তাঘাট ঠিক রাখা। অথচ চসিকের এসব কাজের কোনো সুফলই পায় না নগরবাসী। উল্টো জলাবদ্ধতার ভোগান্তিসহ নালায় পড়ে প্রাণহানির মতো ঘটনাও ঘটেছে। 

এদিকে নালার ভেতর অপরিকল্পিতভাবে অর্থাৎ লম্বালম্বি প্রবাহমান জায়গার মধ্যে আড়াআড়িভাবে অনেকগুলো পাইপ স্থাপন করা হলে সেখানে ভাসমান কঠিন বর্জ্য জমাট বেঁধে পানি প্রবাহকে বাধাগ্রস্থ করে বলে মন্তব্য করেছেন বিশেজ্ঞরা। 

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান বলেন, সেবাদানকারী সংস্থাগুলো একটি সমন্বিত পরিকল্পনার বাইরে গিয়ে নিজেরা নিজেদের মতো করে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে যে কারণে এই ধরনের নাগরিক দুর্ভোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই জন্য প্রথমত জনচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। কারণ ড্রেন হচ্ছে ব্যবহার্য পানি ব্যবস্থাপনার জন্য, বর্জ্যর জন্য না। একইসাথে সেবাদানকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘চট্টগ্রামে প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার টন বর্জ্য উৎপাদন হয়। তারমধ্যে সিটি কর্পোরেশনের দাবি অনুযায়ী দুই হাজার টন বর্জ্য ম্যানেজমেন্ট করা হয়। বাকি এক হাজার টন বর্জ্য যত্রতত্র ফেলা হয়। সেগুলোর অধিকাংশ ফেলা হয় খাল নালায়। প্রতিদিন যদি এক হাজার টন বর্জ্য খাল বা নালায় ফেলি তাহলে এমন দুভোর্গ বাড়বে, কমবে না। তাই আমাদের সেবা সংস্থার সমন্বয়ের পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতা বাড়াতে হবে।’

সিভয়েস/এসআর/এএস
 

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়