Cvoice24.com

কার দোষে ওরা ‘বড় অপরাধী’?

শারমিন রিমা

প্রকাশিত: ১৭:৪৬, ১৫ জুন ২০২৩
কার দোষে ওরা ‘বড় অপরাধী’?

‘‘মানুষ আমার ১৬ বছরের ছেলেকে ‘ডাকাত ডাকাত’ ডাকা শুরু করছে। আমার ছেলেটা লজ্জায় অপমানে ঘর থেকে বের হতে চায় না’’ —বলছিলেন বয়সের বেড়াজালে পড়ে কারাভোগ করে আসা এক শিশুর অভিভাবক। ঘটনাস্থল থেকে শিশুটি থানায় এসে বনে যায় প্রাপ্তবয়স্ক আসামি। বয়স নির্ণয় ছাড়া, এমনকী কোনরকম পরিচয়পত্র দাখিল না করে মামলার নথিতে তাদের প্রাপ্তবয়স্ক আসামি উল্লেখ করে চালান করে দেওয়া হয় আদালতে। ফলে সংশোধনাগারের পরিবর্তে তাদের ঠাঁই হয় কারাগারে। সিভয়েস প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে উদঘাটিত হয়েছে এমন অন্তত ১০টি ঘটনা। এছাড়াও এসব শিশুদের বিরুদ্ধে রিমান্ড আবেদন করার ঘটনাও ঘটেছে।

তেমনি একটি ঘটনা, চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি রাত ৯টার। চট্টগ্রাম নগরের মুরাদপুর ওভারব্রিজের নিচ থেকে দুই শিশুকে আটক করে চান্দগাঁও থানা পুলিশ। প্রায় ৩৬ ঘণ্টা হাজতে রাখার পর ৪ ফেব্রুয়ারি সকালে থানার উপ-পরিদর্শক শরীফ উদ্দিন বাদী হয়ে দণ্ডবিধির ৩৯৯ ও ৪০২ ধারায় ওই দুই শিশুসহ সাতজনকে আসামি করে ডাকাতির প্রস্তুতির মামলা দেন (মামলা নম্বর ৬)। কিন্তু এজাহারে দেখানো হয়, তাদের ৩ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত ৩টা ৫ মিনিটে চান্দগাঁও থানার এক কিলোমিটার এলাকার শাহ ওয়ালীউল্লাহ আবাসিকের গলির সামনে থেকে আটক করা হয়। উদ্ধার করা হয় দুটি টিপছোরা।

অনুসন্ধানে উঠে আসা বয়সের ‘কারসাজির শিকার’ দুই শিশু

আটক দুই শিশুর বক্তব্য অনুযায়ী ঘটনার তারিখ, সময় ও আটকের স্থান তিনটিতেই ‘গরমিল’ পাওয়া গেছে। এজাহারে তাদের বয়স দেখানো হয়েছে ১৯ ও ২০ বছর। জন্মনিবন্ধন অনুযায়ী (গ্রেপ্তারের দিন পর্যন্ত) তাদের বয়স ১৬ বছর ৫ মাস ২৮ দিন এবং ১৭ বছর এক মাস। প্রচলিত আইন অনুযায়ী তারা ‘শিশু অপরাধী’। আইননুযায়ী ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত শিশু হলেও রীতিমত অন্যান্য ‘দাগি’ আসামিদের সঙ্গে দুই শিশুকে হাতে হাতকড়া কোমরে দড়ি বেঁধে প্রিজনভ্যানে আদালতে নিয়ে তিনদিনের রিমান্ড চান তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা। আদালত রিমান্ড আবেদন না মঞ্জুর করে তাদের কারাগারে পাঠান। আটকের পরপর স্বীকারোক্তি দিতে তাদের মারধর ও মানসিক চাপ দেয় পুলিশ। ১৮ দিন জেল খেটে জামিনে বের হলেও এখনও তারা ট্রমা কাটিয়ে উঠেনি।

একটি ঘটনার অভিযুক্ত শিশুর বিরুদ্ধে করা এজাহার ও তার জন্মনিবন্ধন। শিশুটির নিরাপত্তার স্বার্থে ব্লার করে দেওয়া।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) তথ্যমতে, গত ১০ বছরে চট্টগ্রামের ১৬ থানায় শিশু আইনে ৮৭৮টি মামলা হয়। এসব মামলার বেশিরভাগই চুরি, ডাকাতি, মাদক, অস্ত্র, মারামারি সংক্রান্ত। আর এসব মামলায় অভিযুক্ত শিশুর সংখ্যা ১ হাজার ২৬৬ জন। এরমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১ হাজার ২৫২ শিশুকে। এদের মধ্যে ৩৭৮ জনকে সংশোধনের জন্য সংশোধনাগারে পাঠানো হয়েছে।

অন্যদিকে বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৮ সালে জাতীয় টাস্কফোর্স গঠনের পর থেকে চট্টগ্রামের ৩ হাজার ৮০১ জন শিশু-কিশোরকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্য থেকে সংশোধনের জন্য সংশোধনাগারে পাঠানো হয়েছে ৩ হাজার ৬৮৩ জনকে। তবে এরমধ্যে কতজন চট্টগ্রাম জেলার তা জানা সম্ভব হয়নি। এই তথ্য জানতে সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে গত ১০ এপ্রিল তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করেও এখনো পর্যন্ত সেই তথ্য পাওয়া যায়নি।

অনুসন্ধানে ১০ মামলা

পুলিশ ও ব্যক্তি দায়েরকৃত ১০টি মামলার তথ্য অনুসন্ধান করা হয়। অনুসন্ধানে উঠে আসে শুধু পুলিশই নয় মামলার বাদী কোনো সাধারণ ব্যক্তি হলেও চুরি, ছিনতাই, ধর্ষণ কিংবা হত্যার অভিযোগে করা মামলায়ও শিশুদের বয়স বাড়িয়ে ‘আসামি’ করা হয়েছে।

চান্দগাঁও থানার ওই মামলার এজাহারের বিবরণ অনুযায়ী উল্লেখিত ঘটনাস্থলে সরেজমিন খোঁজ নিয়ে ‘ডাকাতির ঘটনা দেখেছেন’ এমন কাউকে পাওয়া যায়নি। ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে এ মামলার সাক্ষী তিনজনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন সিভয়েস প্রতিবেদক। এরমধ্যে দুজনকে মুঠোফোনে পাওয়া যায়নি। মামলার  উল্লেখ করা দুই নম্বর সাক্ষী অহিদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘ঘটনার সম্পর্কে কিছুই মনে নেই’ এমনকি ঘটনার পর থেকে এখন পর্যন্ত পুলিশ কিংবা আদালত থেকেও নাকি তার ডাক পড়েনি। ঘটনাস্থলের আশপাশে থাকা একাধিক প্রতিষ্ঠানে খোঁজ করেও সংরক্ষণে না থাকায় সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা যায়নি। কেননা একমাসের বেশি সময় সিসিটিভ ফুটেজ সংরক্ষণে রাখা যায় না। তাই অভিযোগের সত্যতা যাচাই সম্ভব হয়নি।

শিশুদের ভাষ্যমতে দেখানো ঘটনাস্থল ও এজাহারের বর্ণনানুযায়ী ঘটনাস্থল। ছবি: গুগল আর্থ থেকে নেওয়া।

চান্দগাঁও থানার ওই দুই শিশু ছাড়াও কোতোয়ালী থানা এলাকার ১৭ বছর বয়সী আরেক শিশুকে ডাকাতি প্রস্তুতির মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল ৫ বার। ২০১৮ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সেসব মামলার এজাহারে বয়স দেখানো হয়েছে কোথাও ১৯ আবার কোথাওবা ২১ বছর। ওই শিশুর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা নম্বরগুলো হলো (২০/৭/১৯), (১২৯/৭/১৮), (১২/৯/২০), (১১/৯/২০) এবং (১৩/৪/২২)।

মামলা নম্বর ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে জানা যায়, কোতোয়ালী থানা এলাকার ২০২২ সালের ১৭ নভেম্বর দায়ের করা ডাকাতি প্রস্তুতির মামলায় (মামলা নং-২৫) ১২ জন আসামির মধ্যে দুইজন অপ্রাপ্তবয়স্ক। এ মামলার এজাহারে গ্রেপ্তার প্রথম আসামির বয়স উল্লেখ করা হয় ২৫ বছর এবং দ্বিতীয় আসামির বয়স উল্লেখ করা হয় ১৯ বছর। এজাহারে উল্লেখ করা তৃতীয় আসামির ২৯ ও চতুর্থ আসামির বয়স দেখানো হয় ২৫ বছর এবং পঞ্চম আসামির বয়স দেখানো হয় ১৯ বছর। কিন্তু সরকারের দেওয়া জন্মনিবন্ধন অনুযায়ী গ্রেপ্তারের তারিখ পর্যন্ত পঞ্চম আসামির বয়স ১৫ বছর। বর্তমানে তার বয়স ১৬ বছর ৫ মাস। একইভাবে আরেক আসামির বয়স ১৯ দেখানো হলেও জন্মনিবন্ধন অনুযায়ী তার বয়স গ্রেপ্তারের দিন পর্যন্ত (১৭ নভেম্বর পর্যন্ত) ১৬ বছর ১০ মাস ১৬ দিন।

একইভাবে ২০২২ সালে ৪০ বছর বয়সী এক নারীর দায়ের করা (মামলা নং-২৮) কোতোয়ালী থানার আরেকটি মামলায় ১৬ জন আসামির মধ্যে একজন ছিলেন অপ্রাপ্তবয়স্ক। বেআইনী সমাবেশে হত্যার উদ্দেশ্যে ধারালো ছোরা দ্বারা আঘাত ও গুরুতর রক্তাক্ত জখম, চুরি করিয়া ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে। মামলার এজাহারে তার বয়স উল্লেখ করা হয় ২২ বছর। অথচ জন্মনিবন্ধন, অষ্টম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল এবং জেএসসি সনদ অনুযায়ী এ শিশুর বয়স ১৪ বছর ১০ মাস ১৭ দিন। সেই বছরের (২০২২) এপ্রিলে বিএফ শাহীন কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে হত্যার মামলায় ১৭ বছর ৭ মাস ১৩ দিন বয়সী একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু মামলায় তারও বয়স লেখা হয় ১৯ বছর।

কোনরকম যাচাই-বাছাই ছাড়াই নাশকতার মামলায় আসামি করা হয়েছে দশম শ্রেণির এক ছাত্রকে। ঘটনাটি চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারির, কোতোয়ালি থানা এলাকার। এজাহার অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগরের কাজির দেউড়ি মোড়ে বিএনপির সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের সময় ঘটনাস্থল থেকে ১৯ বছর বয়সী ওই ছাত্রকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশের করা নাশকতার দুটি মামলায় আসামি করা হয়েছে তাকে। অথচ জেএসসি পরীক্ষার সনদ অনুযায়ী তার বয়স ১৭ বছর ৬ মাস। অর্থাৎ মামলা করার সময় প্রাথমিকভাবে বয়স যাচাইয়ের মানদণ্ড না থাকায় এরকম ঘটনা ঘটছে।

এছাড়াও বিষয়টি নিয়ে সরকারি কৌঁসুলিসহ আদালত পাড়ার অন্তত ৩০ জন আইনজীবীর সঙ্গে কথা হয়েছে। যারা ব্যক্তিগত কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক। তাদের প্রতি একজনই বছরে এমন মামলা লড়েন গড়ে ৪ থেকে ৫টি।

অনুসন্ধানে বয়সের ‘কারসাজি’র ঘটনার বিভিন্ন মামলা.. 

এ বিষয়ে জানতে মামলার বাদীদের কাছে জানতে চাইলে তাদের বেশিরভাগই বলেছেন, অনুমান নির্ভর বা অভিযুক্তের বরাতে মামলায় বয়স নথিভুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে যাচাই বাছাই করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। তবে তদন্তকারী কর্মকর্তা বিষয়টি অনুসন্ধান করেন না বলে অভিযুক্ত শিশুরা কারাগারে প্রাপ্তবয়স্ক আসামির মতই সাজা ভোগ করছেন। এর সত্যতাও পাওয়া গেছে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের একটি সূত্রে। বর্তমানে (সর্বশেষ ৩০ মে’র তথ্যানুযায়ী) কারাগারে বন্দিদের মধ্যে ১৮ বছরের কম বয়সীর সংখ্যা ২২০। কারাগারের পদ্মা ভবনের পঞ্চম তলার ৪টি ওয়ার্ডে তাদেরকে রাখা হয়েছে। যাদেরকে বিভিন্ন অপরাধে বয়স বাড়িয়ে ‘প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধী’ বানানো হয়। বয়সের এই কারসাজিতে শিশুরা সংশোধনাগারে থাকার পরিবর্তে থাকছে বড় আসামিদের জেলে। এসব শিশুদের বিচার প্রক্রিয়া চলছে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবেই। শিশুদের কারাবাসও দীর্ঘায়িত হচ্ছে বিচারকাজ বিলম্বিত হওয়ার কারণে। এমন তিন শিশু বিষয়ক তথ্য প্রমাণও প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে।

কী আছে শিশু আইনে?

২০১৩ সালের শিশু আইনে বলা হয়েছে, গ্রেপ্তারের পর কোন শিশুকে হাতকড়া বা কোমরে দড়ি বা রশি লাগানো যাবে না। বয়স নির্ধারণের ক্ষেত্রে পুলিশ কর্মকর্তা জন্ম নিবন্ধন সনদ অথবা, উক্ত সনদের অবর্তমানে স্কুল সার্টিফিকেট বা স্কুলে ভর্তির সময় প্রদত্ত তারিখসহ প্রাসঙ্গিক দলিলাদি উদঘাটনপূর্বক যাচাই-বাছাই করে বয়স লিপিবদ্ধ করবেন। এমনকি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি একজন শিশু কিন্তু সম্ভাব্য সকল চেষ্টা করে দালিলিক প্রমাণ দিয়ে নিশ্চিত না হওয়া গেলে সেইক্ষেত্রে ওই ব্যক্তিকে এই আইনের বিধান অনুযায়ী শিশু হিসাবে গণ্য করতে হবে।

গত ১০ বছরে চট্টগ্রামের ১৬ থানায় শিশু আইনে দায়ের হওয়া মামলার পরিসংখ্যান। ২০১৩-২০২৩ সালের মার্চ পর্যন্ত

অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া বা আইনের সংস্পর্শে আসা শিশুদের বিষয়ে শিশু আইনে ধারা ৪৪ এ গ্রেপ্তারের বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। এ ধারার উপ ধারা ৫ এ বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট থানায় শিশুর জন্য উপযোগী কোন নিরাপদ স্থান না থাকলে গ্রেপ্তারের পর থেকে আদালতে হাজির না করা সময় পর্যন্ত শিশুকে নিরাপদ স্থানে আটক রাখার ব্যবস্থা করতে হবে এবং শিশুকে প্রাপ্তবয়স্ক বা ইতোমধ্যেই দোষী সাব্যস্ত হয়েছে এমন কোন শিশু বা অপরাধী এবং আইনের সংস্পর্শে আসা কোন শিশুর সাথে একসাথে রাখা যাবে না। একইসঙ্গে আইন অনুযায়ী, ১৮ বছর বা এর কম বয়সী যেসব শিশু কিশোরের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যাবে তাদেরকে জেলে নেওয়ার পরিবর্তে উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠাতে হবে, যেন তারা সংশোধিত হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে।

বিপত্তিটা ঘটে প্রাথমিকভাবে বয়স নির্ধারণের ক্ষেত্রে। মামলা দায়েরের সময় বয়স নির্ধারণের জন্য কোন পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে তা নিয়ে আইনে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা না থাকায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা পুলিশ কর্মকর্তারা এই কাজটি সঠিকভাবে করেন না। আর এতে অভিযোগপত্রে উল্লেখিত বয়সকেই আদালত অভিযুক্তের প্রকৃত বয়স হিসেবে গণ্য করেন। আর এভাবেই প্রাপ্য আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া শিশু কিশোররা।

বয়সের এ কারসাজিতে সঠিক সময়ে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয় তারা। পুলিশের ‘জেনেবুঝে’ করা ভুলের মাশুল গুণতে হয় তাদের। আর সংশোধনের সুযোগ না পাওয়ায় বারবার একই অপরাধে ঝুঁকছে অপরাধে জড়িয়ে পড়া শিশুরা— এমনটাই মন্তব্য বিশেষজ্ঞদের।

বয়সের এই কারসাজি কেন করেন পুলিশ কর্মকর্তারা

অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া শিশু কিশোরদের ‘বয়স’ বাড়িয়ে প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধী বানানোর প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিষয়টি স্বীকার করেছেন। কারণ হিসেবে তারা বলেছেন, আইনশৃংখলা বাহিনীর অলিখিত দায়িত্ব হল অপরাধের মাত্রা হিসেবে শিশু হলেও ‘অপরাধী’ হিসেবেই বিবেচনা করতে হয়। কারণ আইন-শৃংখলা রক্ষাকারীর দায়িত্ব হল আইন-শৃংখলা পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক রাখা। তবে দায়িত্ব এড়াতে ও অনৈতিক সুবিধা আদায় করতে না পেরে ইচ্ছাকৃতভাবেও অনেকে এ কাজ করেন। সাধারণ বাদিরা প্রতিশোধপ্রবণতা ও প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর জন্য বয়স বাড়িয়ে মামলা করেন।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) এক কর্মকর্তা বলেন, ‘অপরাধ যে করে সে অপরাধী। সে শিশুই হোক বা বড় কেউ। দেখা যায়, শিশু দেখালে সে জামিনের সুবিধাটা পাবে। কিন্তু আমি চাই সে সাজা পাক, শাস্তি পাক। পরে সে (অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া শিশু) যে শিশু, সে নিজেই প্রমাণ করুক। এটাই মূল বিষয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে বুঝা যায় না যে সে শিশু। ধরুন তার বয়স ১৮ এখন সে বললো ১৬ তখন তাকে যদি শিশু দেখাই তাহলে আবার আমরা ঝামেলায় পড়ে যাবো। আর আইনে যেহেতু সুযোগ আছে শিশু প্রমাণ করার, সে নিজেই প্রমাণ করবে। পুলিশ হিসেবে চাইবো সে যেহেতু অপরাধ করছে তার সাজা পাওয়া দরকার।’

পুলিশের এ কর্মকতা আরও বলেন, ‘১৬ বা ১৮ খুব একটা পার্থক্য নেই। অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায় জৈবিক বয়সে পূর্ণবয়স্ক না হলেও মানসিকভাবে পরিপক্ক, পরিণাম সম্পর্কে জেনেই তারা অপরাধে জড়ায়। পুলিশ হিসেবে আমি জানি সে অপরাধী তাই তাকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য জেনেশুনে বয়সটা বাড়িয়ে দিলাম। যদিও আইনগতভাবে তাকে অপরাধীও বলার সুযোগ নাই। কিন্তু আমাদের সমাজের প্রেক্ষাপটে বৃহৎ স্বার্থে এটা করতেই হয়। কারণ শিশু আইনের সুবাধে জামিন পেলে ওরা বারবার একই কাজ করে। এজন্য যতদিন হাজতে রাখা যায়। যাতে করে এলাকার মানুষ কটা দিন শান্তিতে থাকতে পারে।’

তবে পুলিশের দায়েরকৃত মামলায় বয়স বাড়ানোর বিষয়টি মানতে নারাজ চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) আ স ম মাহতাব উদ্দিন। তিনি সিভয়েসকে বলেন, ‘পুলিশের কাজ হচ্ছে ছোট্ট কাজ। অপরাধীকে আইনের হাতে সোর্পদ করা। বাকি কাজটা আদালতের।  আসামির বয়সের বিষয়টা সবক্ষেত্রে আমরা বিবেচনা করি না। অভিযোগকারীই আসামির যাবতীয় তথ্য দেন, আমরা পরবর্তীতে যাচাই-বাছাই করে প্রতিবেদন দিই। এখন তিনি শুরুতে যদি ভুল তথ্য দেন সেক্ষেত্রে আমাদের কিছু করার নেই। আর এজাহারে উল্লেখিত ২০ বছরের ব্যক্তি যতক্ষণ প্রমাণ দেখাবে না, যে তার বয়স ২০ নয়, ততক্ষণ তার বিষয়টা শিশু আইনে আসবে না। তার প্রকৃত বয়স প্রমাণ হবে আদালতে।

তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশ যখন এজাহার লেখে তখন অভিযুক্তকে নাম ঠিকানা বয়স জিজ্ঞেস করে। তখন অভিযুক্ত যা বলে তাই লেখা হয়, তদন্ত ছাড়া তার নাম ঠিকানা বয়স এসব পুলিশের জানার কথা না। এখন অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া শিশু যেটা বলছে পুলিশ সেটাই লিখছে। বাদীর লেখাটা যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্ব তদন্তকারী কর্মকর্তার। আর এ শিশুদের বাবা-মায়ের প্রথম কাজটা আইও’র (তদন্তকারী কর্মকর্তা) কাছে ডকুমেন্টসগুলো দেওয়া। এইটুকু করলে তো তাকে তিনমাস জেলে থাকতে হয় না।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘প্রচলিত আইনে আইন না জানাটা অপরাধ। বাংলাদেশে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় নামে একটা মন্ত্রণালয় আছে। ওখানে প্রবেশন কর্মকর্তা নামে একজন অফিসার আছেন। উনার কাজটা কী? উনাকে ধরেন। আইনজীবীরা আছেন। উনারা কেন প্রমাণ করেন না।’

কী বলছে কারা কর্তৃপক্ষ?

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে কত সংখ্যক শিশু কারাভোগ করছে এ তথ্যের জন্য সিভয়েস প্রতিবেদক প্রথমে যোগাযোগ করে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের ডেপুটি জেলার কাজী মাজহারুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বিষয়টি খোঁজ নিয়ে পরে জানাবেন বললেও তাকে আর ফোনে পাওয়া যায়নি। পরে সরাসরি কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে তাকে ফোন করে সাক্ষাত করতে চাইলে মিটিংয়ের অজুহাত দেখিয়ে সিনিয়র জেল সুপার মুহাম্মদ মঞ্জুর হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পরামর্শ দেন। সেখান থেকে সিনিয়র জেল সুপার মোহাম্মদ মঞ্জুর হোসেনকে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।

একই তথ্য জানতে চট্টগ্রাম সমাজসেবা অধিদপ্তরে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী, ২০ কার্যদিবসের মধ্যে তথ্য সরবরাহ করার অথবা দেওয়া না গেলে কারণসহ লিখিত ব্যাখা জানানোর কথা থাকলেও কোনটিই করা হয়নি। পরে চট্টগ্রাম সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রবেশন কর্মকর্তা পারুমা বেগমের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ছুটিতে থাকার কথা জানান। পরে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে ২২০ শিশুর কারাভোগের বিষয়টি জানালে তাৎক্ষণিকভাবে তিনি বলেন, ‘এই সংখ্যাটা তো অনেক। সাধারণত এমন হওয়ার কথা না। কোনো শিশু থাকলে থানা থেকে আমাদের জানায়। তাছাড়া আমি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ আছি। তারপরেও এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছি।’ পরবর্তীতে তিনি ফোন করে জানান, ‘তথ্যটি সঠিক নয়’।

কী বলছেন চট্টগ্রামের আইনজ্ঞরা?

বিচার ব্যবস্থা এখনও শিশুবান্ধব হয়ে ওঠেনি এবং শিশু আইনের অজ্ঞতার কারণে এমন ঘটনা অহরহ ঘটছে বলে উল্লেখ করে মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবী জিয়া হাবীব আহসান সিভয়েসকে বলেন, ‘জুভেনাইল জাস্টিসের ব্যাপারে পুলিশ, আইনজীবী, সংবাদকর্মী, বিচারক বা বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িতদের অনেকেরই কোনো এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেই। শিশু কিশোরদের কাজকে অপরাধ বলা হয় না, এটাকে ভুল গণ্য করা হয়। তাই শাস্তিমূলক জেল নয় সংশোধনাগারই তাদের গন্তব্য। বয়স বাড়িয়ে দেখানো পুলিশের খুব কমন প্র্যাকট্রিস। মামলা দায়েরের আগে পুলিশদের প্রাথমিক সত্যতা যাচাই করতে হয়। বয়সের প্রমাণপত্র দাখিল করতে অভিভাকককে জানাতে পারে পুলিশ, কিন্তু তারা তা করেন না।’

‘যিনি মামলা এন্ট্রি করেছেন তাকে আইনিভাবে দায়ী করা যায়। কারণ অপ্রাপ্তবয়স্ক একজনকে প্রাপ্তবয়স্ক দেখানো অপরাধ। এতে শিশু আইনের সুবিধা থেকে তাদের বঞ্চিত করা হয়। এরকম কাজে জড়িত ব্যক্তিদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তাদের শাস্তি না হলে এমন ঘটনা অব্যাহত থাকবে।’ — যোগ করেন এই আইনজীবী।

বয়স বাড়ানোর প্রসঙ্গে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭ এর রাষ্ট্রপক্ষের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) খন্দকার আরিফুল আলম সিভয়েসকে বলেন, ‘অভিযুক্ত শিশু যাতে শিশু আইনের সুবিধা না পায় তাই কিছু কিছু ক্ষেত্রে বয়স বাড়িয়ে মামলা করা হয়। তাৎক্ষণিকভাবে বাদী নিজেই অনুমান করে বয়স লিখে। এছাড়াও আসামিদের আটকের পর পরিচয়, বয়স নির্ধারণের বাধ্যবাধকতা না থাকায় বাদি সুযোগ নেয় এবং শিশুদের ঢালাওভাবে আসামি করা হয়। যেহেতু আইনে বলা নাই প্রত্যেক মামলার শুরুতেই অভিযুক্ত ব্যক্তির বয়স প্রমাণাদি যুক্ত করতে হবে।

‘তবে যে আদালতেই মামলা থাকুক না কেন অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি নিজেকে শিশু বলে দাবি করে তা অবশ্যই নিষ্পত্তি করতে হবে’—তিনি যোগ করেন।

সমস্যা থেকে উত্তরণের প্রসঙ্গে খন্দকার আরিফুল আলম বলেন, ‘পুলিশ বা পাবলিকের দায়েরকৃত মামলার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট প্রথম দেখাতেই বয়সের ব্যাপারে একটা ধারণা নিলে অর্থাৎ প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে বয়স সংক্রান্ত বিষয়ে তিনি চাইলে আইনগতভাবে মন্তব্য করতে পারেন। তাহলে অপরাধের সংস্পর্শে আসা শিশুদের বয়স বাড়ানোর মতো ঘটনা কমে আসবে বলে মনে করি।’

শিশুদের অপরাধী বানানোর ক্ষতিকর প্রভাবের বিষয়ে জানালেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদ

একই প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মানসিক রোগ বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক বিভাগীয় প্রধান ডা. মহীউদ্দিন আহমেদ শিকদার সিভয়েসকে বলেন, ‘শিশুদের কোনোভাবেই অপরাধী বলা যাবে না। যে সব বাচ্চারা আইনের সংস্পর্শে আসে তারা মূলত ‘কনডাক্ট ডিসঅর্ডার’বা আচরণব্যাধি জনিত গুরুতর ধরনের মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত। সুচিকিৎসা না হলে পরে তা পারসোনালিটি ডিসঅর্ডারে পরিণত হয়। মানে এরাই পরবর্তীকালে অ্যান্টি-সোশ্যাল পারসোনালিটি অর্থাৎ সমাজবিরোধী ব্যক্তি হয়ে যায়। এ সমস্যার প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা হলো সহমর্মিতা।’

অপ্রাপ্ত বয়স্কদের অপরাধী সাজানোর কারণে তাদের মনোজাগতিক জগতে বিরুপ প্রভাব পড়বে উল্লেখ করে এ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘তাদের আগে থেকেই গুরুতর মানসিক সমস্যা আছে। এখন যদি কারাগারে প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীর সঙ্গে রাখা হয় তাহলে সে সংশোধনের পরিবর্তে অপরাধ করার প্রবণতা বেড়ে যাবে। সংশোধনাগারে পাঠানোর অর্থ হল তাকে সুনাগরিক হতে সাহায্য করা ও পুনরায় অপরাধ করা থেকে বিরত রাখা। কিন্তু আইনের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে বা সিস্টেমের গলদের কারণে এই বাচ্চারা দুই-তিন মাস কারাগারে থাকে।

একই প্রসঙ্গে শিক্ষাবিদ ড. আনোয়ারা আলম সিভয়েসকে বলেন, ‘কারা ব্যবস্থায় অনেক সময় কাঁচা অপরাধী পাকা অপরাধীদের সংর্স্পশে এসে অপরাধের আরও নতুন নতুন কৌশল শেখে। অপরাধমূলক আচরণ সংশোধনের জন্যে জেলখানার পরিবেশ কখনও উপযোগী নয়।’

সিভয়েস/এএস

সর্বশেষ