Cvoice24.com

পর্দার সেই গর্জন থেমে গেল, চলে গেলেন নানা পাটেকর

বিনোদন ডেস্ক
১৬:৪৭, ১১ অক্টোবর ২০২৬
পর্দার সেই গর্জন থেমে গেল, চলে গেলেন নানা পাটেকর

শৈশবের অভাব থেকে জাতীয় পুরস্কার, মঞ্চের আলো থেকে কোটি দর্শকের হৃদয়—দীর্ঘ পাঁচ দশকের অভিনয়জীবনে নানা পাটেকর ছিলেন এক স্বতন্ত্র অধ্যায়। তাঁর কণ্ঠের দৃঢ়তা, চোখের ভাষা আর চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করার ক্ষমতা তাঁকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছিল। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ৭৫ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যুতে শেষ হলো ভারতীয় চলচ্চিত্রের এক বর্ণাঢ্য অধ্যায়।

কিছু অভিনেতা পর্দায় চরিত্র হয়ে ওঠেন, আবার কেউ কেউ চরিত্রের ভেতর দিয়ে দর্শকের মনে স্থায়ী জায়গা করে নেন। নানা পাটেকর ছিলেন তেমনই একজন। কখনো কঠোর পুলিশ কর্মকর্তা, কখনো ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ, কখনো ভয়ংকর প্রতিপক্ষ, আবার কখনো হাস্যরসের অনন্য কারিগর—প্রতিটি চরিত্রেই ছিল তাঁর নিজস্ব ছাপ। তাঁর অভিনয়ে ছিল না চাকচিক্যের ওপর নির্ভরতা; বরং সংলাপ, চোখের চাহনি আর শরীরী ভাষাতেই তিনি তৈরি করতেন গভীর আবেগ।

১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রের মুরুড-জঞ্জিরায় জন্মগ্রহণ করেন নানা পাটেকর। তাঁর প্রকৃত নাম বিশ্বনাথ পাটেকর। সাধারণ এক পরিবারে বেড়ে ওঠা এই মানুষটির পথ সহজ ছিল না। শৈশবের আর্থিক টানাপোড়েন তাঁকে জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত করেছিল। পরে সেই বাস্তবতার ছাপ দেখা গেছে তাঁর অভিনয়ের নানা চরিত্রে।

ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। স্কুলের নাটকে অভিনয় করতে গিয়ে বাবার মনোযোগ আকর্ষণের আকাঙ্ক্ষাও তাঁর অভিনয়চর্চার শুরুর দিকের একটি স্মৃতি হয়ে আছে। মঞ্চের সেই ছোট্ট অভিজ্ঞতা একসময় তাঁকে নিয়ে যায় মারাঠি থিয়েটারের জগতে। সেখানেই তৈরি হয় তাঁর অভিনয়ের ভিত।

১৯৭৮ সালে ‘গমন’ চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে হিন্দি সিনেমায় অভিষেক হয় নানা পাটেকরের। শুরুতে ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় করলেও ধীরে ধীরে নিজের দক্ষতা দিয়ে জায়গা করে নেন তিনি।

মীরা নায়ারের ‘সালাম বোম্বে!’ তাঁকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করে তোলে। এরপর ‘পরিন্দা’ ছবিতে তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়। ‘ক্রান্তিবীর’ ছবিতে তাঁর শক্তিশালী উপস্থিতি দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলে। এ ছাড়া ‘তিরঙ্গা’, ‘অগ্নিসাক্ষী’, ‘আব তক ছাপ্পান’ ও ‘ওয়েলকাম’-এর মতো ছবিতে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করে তিনি প্রমাণ করেছেন, অভিনয়ের কোনো একটি ছাঁচে তাঁকে আটকে রাখা যায় না।

বিশেষ করে ‘ক্রান্তিবীর’-এ তাঁর অভিনয় ছিল প্রতিবাদী কণ্ঠের প্রতিচ্ছবি। অন্যদিকে ‘ওয়েলকাম’ ছবিতে উদয় শেঠির চরিত্রে তাঁর কৌতুকপূর্ণ অভিনয় দেখিয়েছে, তীব্র ও গম্ভীর চরিত্রের পাশাপাশি হাস্যরসেও তিনি কতটা সাবলীল। এই বৈচিত্র্যই তাঁকে কয়েক প্রজন্মের দর্শকের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছে।

ক্যারিয়ারে তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন নানা পাটেকর। ২০১৩ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে। তবে পুরস্কারের তালিকার বাইরেও তাঁর বড় অর্জন ছিল দর্শকের মনে জায়গা করে নেওয়া।

তাঁর অভিনয়ের ধরন ছিল স্বতন্ত্র। সংলাপ বলার সময় কণ্ঠের ওঠানামা, চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এবং আবেগের নিয়ন্ত্রিত প্রকাশ—সব মিলিয়ে তিনি এমন এক অভিনয়ভাষা তৈরি করেছিলেন, যা সহজেই চেনা যেত। পর্দায় তাঁর উপস্থিতি অনেক সময় দীর্ঘ সংলাপের চেয়েও বেশি কথা বলত।

জনপ্রিয়তার শীর্ষে থেকেও নানা পাটেকর ব্যক্তিগত জীবনকে খুব বেশি প্রচারের আলোয় আনেননি। স্ত্রী নীলকান্তি পাটেকর ও ছেলে মালহারকে ঘিরেই তাঁর পারিবারিক জীবন। জীবনের নানা কঠিন অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিগত বেদনা নিয়ে তিনি সব সময় প্রকাশ্যে কথা বলেননি।

অভিনয়ের বাইরেও সামাজিক উদ্যোগে যুক্ত ছিলেন তিনি। কৃষকদের সহায়তায় কাজ করা ‘নাম ফাউন্ডেশন’-এর সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা তাঁকে চলচ্চিত্রের বাইরেও পরিচিতি দিয়েছে। মানুষের জীবনের কঠিন বাস্তবতা সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা যে কেবল অভিনয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, এমন উদ্যোগে তার প্রতিফলন দেখা যায়।

৮ অক্টোবর ২০২৬, গোয়ায় নিজের বাসভবনে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর হাসপাতালে নেওয়া হলে নানা পাটেকরকে মৃত ঘোষণা করা হয়। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর।

তাঁর মৃত্যুতে চলচ্চিত্রজগতের মানুষজন শোক প্রকাশ করেছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর অভিনয়ের বৈচিত্র্য ও পর্দায় স্বতন্ত্র উপস্থিতির কথা স্মরণ করেছেন। অভিনেতা অক্ষয় কুমারও তাঁর অভিনয়ের গভীরতা ও নিজস্বতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

একজন অভিনেতার জীবন শেষ হয়, কিন্তু তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলো থেকে যায়। নানা পাটেকরের ক্ষেত্রেও তাই। ‘ক্রান্তিবীর’-এর প্রতিবাদী কণ্ঠ, ‘পরিন্দা’র তীব্রতা কিংবা ‘ওয়েলকাম’-এর হাস্যরস—এসব চরিত্রে তাঁকে নতুন করে আবিষ্কার করবেন দর্শকেরা।