Cvoice24.com

১১ বছরেও লোকবল বাড়েনি চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে

শারমিন রিমা

প্রকাশিত: ১৬:৪৯, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩
১১ বছরেও লোকবল বাড়েনি চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে

করোনার দুই বছরে পুরো চট্টগ্রামের আশ্রয় হয়ে ওঠা চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে প্রতিদিন অন্তত ১২০০ রোগী আসে চিকিৎসা সেবা নিতে। প্রতিদিন বহির্বিভাগে নতুন আসা ১২’শ তার সাথে প্রায় ৪’শ রোগীকে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয় হাসপাতালটিতে। অন্তত ১৫০- ১৭০ রোগী ভর্তি থাকেন এ হাসপাতালে। প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে প্রত্যাশিত সেবা দিতে পারছে না হাসপাতালটি। লোকবল বাড়াতে চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ একটি অর্গানোগ্রাম তৈরি করে বিভিন্ন সময়ে সরকারের কাছে চাহিদাপত্রও পাঠিয়েছিল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সেটি এখনও আলোর মুখ দেখেনি। 

হাসপাতাল সূত্র বলছে, বর্তমানে হাসপাতালে মঞ্জুরিকৃত পদ রয়েছে ২৫১টি, তার বিপরীতে শূন্যপদ ৪৬টি। চিকিৎসকের ঘাটতি ছাড়াও হাসপাতালে পর্যাপ্ত সংখ্যক নার্স ও তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী নেই। যদিও আগের হিসেবে হাসপাতালটিতে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর অভাব নেই। কিন্তু আড়াইশো শয্যার জন্য এ জনবল কাঠামো মোটেও পর্যাপ্ত নয় বলে জানাচ্ছেন হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা। শুধু চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীই প্রয়োজন ৫০ জনের বেশি। তবে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে বর্তমানে ৩৬ জন কাজ করছে হাসপাতালটিতে।

প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের ৪২টি পদের বিপরীতে শূন্যপদ রয়েছে ৫টি। এরমধ্যে ইএনটি বিভাগের সিনিয়র একজন কনসালটেন্ট, সার্জারি এবং প্যাথলজির দুইজন জুনিয়র কনসালটেন্ট, প্যাথলজির একজন মেডিকেল অফিসার এবং ইএনটির সহকারী রেজিস্ট্রারের পদ খালি আছে। দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তাদের পদ খালি রয়েছে ১৪টি। তারমধ্যে সেবা তত্ত্বাবধায়ক একজন, সিনিয়র স্টাফ নার্স ১০ জন এবং স্টাফ নার্স ৩ জনের পদ খালি। এছাড়া তৃতীয় শ্রেণির পদ খালি রয়েছে ২৬টি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী, ১ জন ডাক্তারের বিপরীতে ৩ জন নার্স ও ৫ জন প্যারামেডিকস (কর্মচারী) দরকার। সে হিসেবে ২৫০ শয্যার জন্য ২০১১ সালের ৫ অক্টোবর ৬৪৪ জনের পদ সৃষ্টি করে আবেদন করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সম্প্রতি চিকিৎসক কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ২৮ জনের পদ পূরণের জন্য অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে মন্ত্রণালয়ে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, হাসপাতালটির শুধু জরুরি বিভাগই সড়কের পাশে নিচতলায়। শিশু, মেডিসিন, গাইনির মত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলো অবস্থিত পাহাড়ের ওপর। এসব ওয়ার্ডে অ্যাম্বুলেন্স বা যানবাহন নিয়ে সরাসরি যাওয়ার সুযোগ নেই। এ কারণে রোগীদের সরাসরি ওয়ার্ডে নিতে বিপাকে পড়েন রোগীর স্বজনরা। এমনকী মুমূর্ষু রোগীদের জরুরি বিভাগ থেকে অন্তঃবিভাগে নিতেও অসুবিধা হয়।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের এক চিকিৎসক বলেন, ‘একজন চিকিৎসক সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত  সর্বোচ্চ কতজন রোগী দেখতে পারবেন?  ৩০ জন চিকিৎসকের পক্ষে কী ১২০০ রোগী দেখা সম্ভব? এছাড়া ভর্তি রোগী তো আছেনই। তাও আমরা দেখছি। কিছুই করার নেই। বলা যায় বর্তমানে যে লোকবল আছে তা দিয়ে অনেকটা জোড়াতালি দিয়ে এ হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম চলছে।’ 

এ চিকিৎসক আরো বলেন, ‘করোনার সময় মূলত এ হাসপাতালে মানুষজনের ভরসা বাড়ে। বর্হিবিভাগে রোগী থাকলেও ভর্তি রোগী ৪০ শতাংশে নেমে এসেছিল। এখন অবশ্য তার থেকে কিছুটা বেড়ে ৬০ শতাংশ রোগী সেবা নিচ্ছেন আমাদের হাসপাতালে। এরপরেও বলব লোকবলের অভাবে আমরা প্রত্যাশিত সেবা দিতে পারছি না ।’

জনবলসংকট প্রসঙ্গে জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ‘জনবল সংকটের মাঝেও আমরা রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছি। নিয়োগের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার জানানো হয়েছে। বলা যায় প্রতি মাসেই চিঠি দিচ্ছি। অবশ্য কিছুদিন আগে আমরা বেশ কয়েকজন টেকনোলজিস্ট পেয়েছি। শয্যা অনুসারে চিকিৎসকসহ পর্যাপ্ত জনবল পেলে রোগীদের প্রত্যাশিত সেবা দেওয়া সম্ভব হতো।’

এর সঙ্গে যোগ করে তিনি আরও বলেন, ‘সর্বশেষ নতুন একটা চিঠি এসেছে আমাদের কাছে। প্রথম শ্রেণি থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত মোট ২৮টি পদ সৃষ্টির অনুমোদনের জন্য প্রয়োজনীয় চিঠি পাঠাতে বলেছে। আমরা পাঠিয়ে দিয়েছি। এখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে আছে। আশা করছি তাড়াতাড়ি ভালো কিছু হবে।’ 

জানা গেছে, ২৫ শয্যার নিমাইচন্দ্র দাতব্য চিকিৎসালয় থেকে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পর ১৯৮৭ সালে এটিকে ৮০ শয্যায় রূপান্তরিত করা হয়। পরবর্তীতে আরও ৭০টি শয্যা বাড়িয়ে ২০০৩ সালে ১৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। ২০১২ সালে আরও ১০০ শয্যা বাড়ানো হয়। ওই সময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ থেকে ২৫০ শয্যার জন্য ৬৪৪টি পদ সৃষ্টির আবেদন করা হয়।  ওই সময়ে নতুন লোকবল কাঠামো স্থির না হওয়ায় পূর্বের জনবল ঠিক রেখেই হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম চলে। এরপর থেকে সেই ১৫০ শয্যার জন্য প্রয়োজনীয় লোকবল দিয়ে এখনো চলছে সরকারি এ হাসপাতাল। 

এর আগে, ২০২১ সালের ডিসেম্বরে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালকে ৫০০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রূপান্তর করতে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছিল হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় সভাপতি ও শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল।

উল্লেখ্য, ১৮ শতকের মাঝামাঝি সময়ে নিমাই চরণ দাতব্য চিকিৎসালয় থেকেই চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু। তার ছয় দশক পরে নগরের আন্দরকিল্লার রঙমহল পাহাড়ের উপরে স্থাপিত হয় বর্তমান চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল। ১২২ বছরের বেশি সময় ধরে টিম টিম করে কোনমতে টিকে আছে এ হাসপাতাল। শতাব্দী পুরনো এ হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা কেবলই আড়াইশো। ২৫ শয্যা দিয়ে শুরু করে গত এক শতাব্দীতে হাসপাতালের শয্যা বেড়েছে কেবল ৩ বার। শয্যসংখ্যা বাড়লেও বিপরীতে বাড়েনি পর্যাপ্ত লোকবল। প্রায় এক যুগ আগে সংখ্যার লোকবল দিয়ে চলছে প্রাচীন এ হাসপাতালটি।

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়