Cvoice24.com

বছরজুড়েই ভুগিয়েছে চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য খাত

প্রকাশিত: ১৭:০৬, ৩১ ডিসেম্বর ২০২০
বছরজুড়েই ভুগিয়েছে চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য খাত

করোনাকালে চার হাসপাতালে ঘুরেও চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে শিশু সোহান। লাশ ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন সোহানের নানা। ছবি : আজীম অননন

চলতি বছরে স্বাস্থ্য বিভাগে দেশজুড়ে আলোচনায় ছিল নভেল করোনাভাইরাস। যার ফলে থমকে ছিল অন্যান্য স্বাস্থ্য সেবা। বছরজুড়ে চট্টগ্রামের চিকিৎসা সেবা নিয়ে ছিল নানা আলোচনা সমালোচনা। নগরের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় নানা অব্যস্থাপনা-অনিয়ম ধরা পড়েছে এ করোনাকালে। করোনার কারণে মার্চের হাম-রুবেলার টিকাও দেওয়া হয়েছে ডিসেম্বরে।

বিশ্বজুড়ে মহামারি করোনার প্রথম ধাক্কা আসে ৮ মার্চে। আর করোনা সংক্রমণ রুখতে বাংলাদেশে লকডাউনের ঘোষণা আসে ২৬ মার্চে। ২৮ মার্চে লকডাউনে থমকে যায় পুরোদেশ। এরপরেই এপ্রিলের ৩ তারিখে চট্টগ্রাম নগরীতে হানা দেয় করোনা।

বেসরকারি হাসাপাতালে চরম নৈরাজ্য :

চট্টগ্রামে প্রথম করোনা ধরা পড়ে এপ্রিলের ৩ তারিখে। এরপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে করোনা রোগীর সংখ্যা। প্রথমদিকে বেসরকারি হাসপাতাল মালিকরা করোনা রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিতে অনীহা দেখান। বেসরকারি হাসপাতাল মালিকরা ব্যবসা বাঁচাতে করোনার চিকিৎসা সেবা দিতে চাননি। এতে করোনা রোগী ও পরিবারের মানুষদের আর্থচিৎকারে ভারি হয়ে উঠেছিল চট্টগ্রামের পরিবেশ। 

এসব সমস্যা শুধু করোনা রোগীরা নয় সাধারণ রোগে আক্রান্ত রোগীদেরও করেছে দিশেহারা। করোনাকালে বন্ধ ছিল সকল বেসরকারি হাসপাতাল।

শুধু সাধারণ মানুষ নয়, বিভিন্ন হাসপাতালের পরিচালনা পরিষদের সদস্যদের পোহাতে হয়েছে এমন সমস্যা। বিশেষ করে সাধারণ রোগীরা চিকিৎসা না পেয়ে মারা গেছে ধুকে ধুকে। করোনা পজিটিভ সার্টিফিকেট ছাড়া ভর্তি হতে পারেনি হাসপাতালে, এমনকি নিতে পারেনি প্রাথমিক চিকিৎসাও।

এদিকে বেসরকারি হাসপাতালের নৈরাজ্য ঠেকাতে ৩১ মে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মো. মিজানুর রহমানকে আহ্বায়ক করে এবং সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বিকে সদস্য সচিব করে ৭ সদস্যের সার্ভিল্যান্স কমিটি গঠন করে দেন বিভাগীয় কমিশনার এবিএম আজাদ।

এই কমিটিকে বেসরকারি হাসপাতালে কোভিড ও নন কোভিড রোগীদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা, সেবা বঞ্চিত মানুষের অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তি এবং কোনো বেসরকারি হাসপাতাল চিকিৎসা না দিলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ফলপ্রসূ হয়নি এ কমিটি। পরে উচ্চ আদালতের নির্দেশে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও এখনও পুরোপুরি শৃঙ্খলা ফেরেনি বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে।

করোনার নমুনা পরীক্ষা :

চট্টগ্রামে করোনার প্রথম নমুনা পরীক্ষা শুরু হয় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস (বিআইটিআইডি)। প্রথম ধাপে এ ল্যাবে নমুনা পরিক্ষা করা হলেও ফলাফল পেতে সময় লেগে যেত মাসেরও বেশি। ল্যাব সংকটে তৈরি হয়েছিল জট। ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে রোগীদের। সময় মতো করোনা রিপোর্ট না আসায় চিকিৎসা সেবা না পেয়ে মৃত্যু হয়েছে অনেক রোগীর। এই সমস্যা সমাধানে বর্তমানে চালু করা হয়েছে আরো ৮টি ল্যাব। চট্টগ্রামে বর্তমান করোনা নমুনা পরিক্ষার মোট ল্যাবের সংখ্যা ৯টি।

আইসিইউ সংকটে সরকারি হাসপাতাল :
 
সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত আইসিইউ ব্যবস্থা না থাকায় অবশ্যই বেসরকারি হাসপাতালমুখী হতে হয়েছে করোনা রোগীদের। কিন্তু এতেও সাড়া মেলেনি। রোগী মরেছে রাস্থায়, হাসপাতালের দোরে দোরে। বিতাড়িত হয়েছে হাসপাতালের সামনে থেকে।

এরই মধ্যে গত ৯ জুন এক অন্তঃসত্ত্বার মৃত্যু ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। আইসিইউ সেবা না পেয়ে করুণ মৃত্যু হয়েছে এ অন্তঃসত্ত্বার। ঘুরেছিল হাসপাতালগুলোর দোরে দোরে। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অক্সিজেন সাপোর্ট পেলেও পাননি আইসিইউ সাপোর্ট।
 
অক্সিজেন সিলিন্ডার সংকট :

করোনার প্রথম দিক থেকে আইসিইউ ছাড়াও অক্সিজেন সংকটে ছিল চট্টগ্রাম। আইসিউ না পেয়ে চাপ বাড়ে অক্সিজেন সিলিন্ডারের ওপর। এদিকে আইসিইউ সংকট অন্যদিকে অক্সিজেন সিলিন্ডার সংকট। মাঝখানে সুযোগ নেন অক্সিজেন সিলিন্ডার ব্যবসায়ীরা। তৈরি হয় নতুন নতুন সিন্ডিকেট ব্যবসা। লাগামহীন বাড়তে থাকে অক্সিজেন সিলিন্ডারের দাম। ফলে তৈরি হয় অক্সিজেনের কৃত্রিম সংকট। 

আইসোলেশন সেন্টার :

করোনা ভাইরাসে সংক্রমণের প্রথম দিক থেকে বেসরকারি হাসপাতালগুলো করোনা রোগীদের অগ্রাহ্য করেছিল। চিকিৎসা সেবা না পেয়ে যখন মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছিল ঠিক তখনই হাল ধরেছে নগরীর আইসোলেশন সেন্টারগুলো। বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠে ফিল্ড হাসপাতাল ও বিভিন্ন আইসোলেশন সেন্টার। অমানবিকতার বিপরীতে তৈরি হয় এক মানবিকতার দৃষ্টান্ত। 

তৈরি হয় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে আইসোলেশন সেন্টার, রাজনৈতিক ও সংস্কৃতিকর্মীদের করোনা আইসোলেশন সেন্টার চট্টগ্রাম, আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র পদপ্রার্থী রেজাউল করিমের মুক্তি আইসোলেশন সেন্টার, সাউদার্ন মেডিক্যাল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. হোসেন আহম্মদের ৫০ শয্যার আইসোলেশন সেন্টার। এছাড়া স্বেচ্ছায় শ্রম দিতে এগিয়ে আসা আল মানাহিল ফাউন্ডেশনের আইসোলেশন সেন্টার এবং সিএমপি-বিদ্যানন্দের যৌথ উদ্যোগে আইসোলেশন সেন্টার।

নতুন আইসিইউ ব্যবস্থা :

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল ছিল চিকিৎসা সেবা প্রদানে অনন্য। এ হাসপাতালে যুক্ত হয়েছে ১০ শয্যার আইসিইউ, সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইনসহ নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা। এক সময় অবহেলার চোখে দেখা এ হাসপাতালের প্রতিও ফিরেছে মানুষের আস্থা।

হাম-রুবেলা টিকা :

হাম রুবেলার টিকা মার্চ মাসে দেওয়ার কথা থাকলেও এ টিকা কার্যক্রম শুরু হয় ডিসেম্বরের শেষের দিকে। এ কার্যক্রম ২৫ জানুয়ারি শুরু হয়ে শেষ হবে ১৩ ফেব্রুয়ারি। এ কর্মসূচির আওতায় নয় মাস থেকে ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত দেশের ৫ কোটি ২০ লাখ শিশুকে হাম ও রুবেলা টিকা দেওয়া হবে। চট্টগ্রাম নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে সকল স্থায়ী-অস্থায়ী কেন্দ্রে মোট ৭ লাখ ৫২ হাজার  ৫৬৪ জন শিশুকে হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া হবে ও ১৪ উপজেলার ৪৮৪৩টি কেন্দ্রে মোট ১২ লাখ ৭ হাজার ১৪৮ জন শিশুকে দেওয়া হবে এ টিকা।

সিভয়েস প্রতিবেদক

Add

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়