সাঙ্গ হলো মাইজভাণ্ডারি মিলনমেলা, আখেরি মোনাজাতে ঢল
সিভয়েস২৪ ডেস্ক
লাখো ভক্তের উপস্থিতিতে স্ব স্ব মনজিলে আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে মাইজভাণ্ডারী তরিকার প্রবর্তক হযরত গাউছুল আজম সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারীর (ক.) ১১৯তম বার্ষিক ওরশ।
শুক্রবার (২৪ জানুয়ারি) দিবাগত রাতে আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করেন গাউছিয়া আহমদিয়া মঞ্জিলের সাজ্জাদানশীন হযরত সৈয়দ এমদাদুল হক মাইজভাণ্ডারী (ম.), হযরত ডা. সৈয়দ দিদারুল হক মাইজভাণ্ডারী(ম.) হযরত সৈয়দ সহিদুল হক মাইজভাণ্ডারী(ম.), গাউসিয়া হক মনজিলের সাজ্জাদানশীন হযরত সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান মাইজভাণ্ডারী (মঃ), হযরত সৈয়দ মুনিরুল হক মাইজভাণ্ডারী (র.) এর শাহজাদা মুন্তাজেম সাজ্জাদানশীন হযরত সৈয়দ আহমদ হোসাইন শাহরিয়ার মাইজভাণ্ডারী (ম.), গাউছিয়া রহমান মনজিলে হযরত সৈয়দ মুজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী, হযরত ড. সৈয়দ সাইফুদ্দিন আহমদ মাইজভাণ্ডারী(ম.)সহ স্ব স্ব মনজিলের প্রধানগণ। মোনাজাতে দেশ ও জাতির কল্যাণ ও সমৃদ্ধি কামনা করেন তারা।
সাজ্জাদানশীন হযরত মওলানা শাহসুফি সৈয়দ এমদাদুল হক মাইজভাণ্ডারী’র আয়োজন ও ব্যবস্থাপনায় এবং নায়েব সাজ্জাদানশীন ও মোন্তাজেম সৈয়দ ইরফানুল হক মাইজভাণ্ডারীর সার্বিক তত্ত্বাবধানে গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারীর ওরশে অংশ নিতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মাইজভাণ্ডারে আসেন আশেক-ভক্তরা।
বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, চায়না, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ওমানসহ নানা দেশ থেকে অসংখ্য ভক্ত-অনুরক্ত অংশ নিতে মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফে আসেন।
সৈয়দ এমদাদুল হক মাইজভাণ্ডারী বলেন, ‘মহান আল্লাহর অলিগণের কারণে ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলাম প্রচার ও প্রসার লাভ করেছে। ইসলামের ক্রান্তি লগ্নে সবসময় সুফীসাধকরাই ধর্মের আধ্যাত্মিক ও শরীয়তের অবকাঠামোর রক্ষকের ভূমিকায় অবর্তীর্ণ হয়েছেন। ইসলাম ধর্মের প্রচার ও প্রসারের পাশাপাশি ইসলামের মৌলিক আদর্শ ও বিশ্বাসের সাথে সমাজ সংস্কৃতির নৈতিক সংস্কারে আধ্যাত্মিক পূর্ণতা লাভের কারিগর হিসেবে কাজ করেছেন।
তিনি বলেন, ‘গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী শাহসুফী সৈয়দ আহমদ উল্লাহ (ক.) মাইজভাণ্ডারী তরিকা প্রবর্তন করেছেন। মাইজভাণ্ডারী তরিকা ইসলামের মৌলিক আদর্শ ও আঞ্চলিক সংস্কৃতির মেলবন্ধনের চূড়ান্ত আধ্যাত্মিক রূপ। এ তরিকার অনুসারীরা ঐশি প্রেমনির্ভর শিক্ষা ও ইসলামী শরীয়তভিত্তিক চর্চায় কার্যকর ভূমিকা রাখছে।’
নায়েব সাজ্জাদানশীন সৈয়দ ইরফানুল হক মাইজভাণ্ডারী বলেন, ‘সুফি দর্শন মানবতার শিক্ষায় আলোকিত পথ দেখায়। মাইজভাণ্ডারী তরিকার মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের আত্মিক উন্নতি, নৈতিক মানোন্নয়ন, এবং সামাজিক শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করা। আমরা ওরশের মাধ্যমে শুধুমাত্র স্মরণ করি না, বরং সমাজে মানবিক মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য নিজেদের উৎসর্গ করার প্রতিজ্ঞা করি।’
তিনি বলেন, ‘গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী আমাদের শিখিয়েছেন কেবল আত্মিক উন্নতি নয় বরং বিশ্বমানবতার জন্য কাজ করা। তাঁর শিক্ষার আলোকে আমরা আল্লাহর পথে চলার দীক্ষা পাই এবং সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে পারি।’
এ সময় উপস্থিত ছিলেন ভারতের অধ্যাপক ড. শেখ মকবুল ইসলাম, খান এগ্রো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দুল হক খান, ফনিক্স শিপিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্যাপ্টেন সৈয়দ সোহেল হাসনাত, চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক জহিরুল ইসলাম চৌধুরী আলমগীর, মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবু তাহের, শাহজাদা সৈয়দ এরহাম হোসাইন, শাহজাদা সৈয়দ মানাওয়ার হোসাইন।
আঞ্জুমানে মোত্তাবেয়ীনে গাউছে মাইজভাণ্ডারী (শাহ এমদাদীয়া) কেন্দ্রীয় কার্যকরী সংসদের সচিব শেখ মুহাম্মদ আলমগীরের পরিচালনায় ওরশে মিলাদ পরিচালনা করেন দারুত তায়ালীম প্রধান শিক্ষক মওলানা জয়নাল আবেদীন ছিদ্দিকী।
মাইজভাণ্ডার ওরশ শরীফ সুপারভিশন কমিটির উদ্যোগে ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা ও ভিডিও চিত্র ধারনের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারির ব্যবস্থা করা হয়। বিভিন্ন স্থানে প্রয়োজনীয় গাড়ি পার্কিংসহ মেহমানদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে থাকা, সময়মতো জামাত সহকারে নামাজ আদায়, বিশুদ্ধ পানীয় জল, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন, আলোকসজ্জা, এবং প্রয়োজনীয় ওষুধসহ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের ব্যবস্থা করা হয়।
এছাড়াও গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারীর ওরশ উপলক্ষে সাজ্জাদানশীন হযরত মওলানা শাহসুফি সৈয়দ এমদাদুল হক মাইজভাণ্ডারী (ম.)’র আয়োজন ও ব্যবস্থাপনায় এবং নায়েব সাজ্জাদানশীন, মাইজভাণ্ডারী ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও দারুল ইরফান রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ডিআইআরআই)’র ম্যানেজিং ট্রাস্টি সৈয়দ ইরফানুল হক মাইজভাণ্ডারীর সার্বিক তত্ত্বাবধানে ১০ দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি পালন করা হয়।
এসব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে আঞ্জুমানে মোত্তাবেয়ীনে গাউছে মাইজভাণ্ডারী (শাহ এমদাদীয়া), মাইজভাণ্ডার ওরশ শরীফ সুপারভিশন কমিটি, দারুল ইরফান রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ডিরি), মাইজভাণ্ডারী ফাউন্ডেশন, মাইজভাণ্ডারী এডুকেশন ট্রাস্ট, মাইজভাণ্ডারী শাহ এমদাদীয়া ব্লাড ডোনার্স গ্রুপ, মাইজভাণ্ডারী শাহ এমদাদীয়া স্বনির্ভরতা ট্রাস্ট, শাহ এমদাদীয়া অটো ড্রাইভিং স্কুল, প্রেমের তরী সুফি সংগীতালয়, মাইজভাণ্ডারী প্রকাশনী, গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী হিফজুল কোরআন ফাউন্ডেশন, গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, মাইজভাণ্ডার আহমদিয়া এমদাদীয়া মাদরাসা এবং অন্যান্য সহযোগী সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানগুলো।
কর্মসূচির মধ্যে ছিল ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প ও টেলিমেডিসিন সেবা প্রদান, জাতীয় হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক দায়রা শাখাসমূহের পুনর্মিলনী উপলক্ষে মাইজভাণ্ডারী সুফি খালওয়াত অনুষ্ঠান, দারুল ইরফান শিক্ষা পরিবার সমাবেশ এবং রক্তদান কর্মসূচি ও থ্যালাসেমিয়া সচেতনতা সেমিনার, এথিকস অলিম্পিয়াড ও তাকদিস সংলাপ, মেধাবিকাশ শিক্ষা উৎসব, বিজ্ঞান বক্তৃতা এবং বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড এবং খলিফায়ে গাউছুল আজম ও অন্যান্য দরবারের আওলাদগণের উপস্থিতিতে তাসাউফ সংলাপ।
‘ক্লিন এন্ড গ্রিন কর্মসূচি এবং আন্তর্জাতিক ছবি প্রদর্শনী, মাইক্রো, সিএনজি ও সেলাই মেশিন বিতরণ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ড্রাইভারদের মাঝে সনদ বিতরণ এবং প্রেমের তরী পুনর্মিলনী ও সম্মাননা প্রদান, সুফি নাটক ‘পাখিদের বিধান সভা’ প্রদর্শনী, প্রকাশনা উৎসব এবং স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ, এথিকস ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম ও মেধা বিকাশ কর্মসূচীতে অংশগ্রহণকারী নেচার ক্লাব সদস্যদের মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ পরিদর্শন, হযরত গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারীর (ক.) এঁর মাজার শরীফে গিলাফ চড়ানো, মিলাদ, তাওয়াল্লোদে গাউছিয়া, জিকির ও মোনাজাত এবং জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকা সমূহে ক্রোড়পত্র প্রকাশ, মিলাদ, তাওয়াল্লোদে গাউছিয়া, জিকির ও আখেরী মোনাজাত।’
এছাড়াও প্রতিদিন বাদে মাগরিব থেকে অনুষ্ঠিত হয় পবিত্র খতমে কোরআন শরীফ, হযরত গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী (ক.) এঁর জীবন, কর্ম শিক্ষা ও তাসাউফ ভিত্তিক আলোচনা ও মাইজভাণ্ডারী ছেমা মাহফিল।
ওরশ উদযাপন উপলক্ষে ভক্তদের নিরাপত্তা বিধান এবং অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ ছাড়াও সাদা পোশাকে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়।
এদিকে ওরশ শরীফকে কেন্দ্র করে বসেছে গ্রামীণ লোকজ মেলা। মেলায় পোষাক, রকমারি খাবার গৃহস্থালি প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিক্রি করেছেন ব্যবসায়ীরা। এছাড়াও দা-ছুরি- বটি, বেতের সামগ্রী, বেড়া, চাটাই, মাছধরার ফাঁদ, হাতপাখা, মোড়া, ফুলদানি, হাঁড়ি পাতিলসহ ঘরে ব্যবহারের প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাওয়া যায়। তাই এই মাঘের মেলার জন্য অপেক্ষায় থাকেন ঘরের বউ-ঝিয়েরাও। এ মেলায় ছুটে আসেন স্থানীয়দের পাশাপাশি উপজাতিরাও ।
তবে এ মেলার অন্যতম আকর্ষণ বড় বড় আকারের জাপানি মূলা বিক্রি যা ভাণ্ডারী মূলা নামে খ্যাত। মেলার বিভিন্ন স্থানে এ মূলা বিক্রির দৃশ্য পরিলক্ষিত হয়।
চট্টগ্রাম (মহানগর, উত্তর, দক্ষিণ) সব খবর














