বছরজুড়ে নিষিদ্ধ পণ্যটির কেনাকাটা চলে নিরাপদে!
আতশবাজির নামে ‘বোমাবাজি’, চোখ ‘বন্ধ’ পুলিশের
রবিউল রবি, সিভয়েস২৪
- 'আতশবাজি লাইবু না মামু? বুমের মতো ফুডিবু। পাইকারি দরে দিয়্যুম, ইক্কে আইয়্যুন মামু।’
নগরের বক্সিরহাটে প্রবেশ করতেই চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় এভাবেই হাঁক-ডাক দিয়ে আতশবাজি কেনার আমন্ত্রণ জানাচ্ছিলেন এক ব্যবসায়ী। দোকানের সামনে ঝুলিয়ে এবং থাকে থাকে সাজিয়ে প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে ‘নিষিদ্ধ’ এসব আতশবাজি, পটকা ও ফানুস। দেশে বিদ্যমান আইনে বিস্ফোরকদ্রব্য বহন, আমদানি ও ক্রয় করা নিষেধ থাকলেও নগরজুড়ে হাতের নাগালেই মিলছে এসব পণ্য।
অন্যদিকে, প্রতিবছরের মতো থার্ট ফার্স্ট নাইটে আতশবাজি-পটকা না ফুটানো এবং ফানুস না উড়ানোর অনুরোধসহ নগরবাসীর প্রতি ১৩টি নির্দেশনা দিয়েছে চট্টগ্রাম নগর পুলিশ (সিএমপি)। তবে কেবল ‘নিষিদ্ধ ঘোষণাতেই’ সীমাবদ্ধ নগর পুলিশের এই কার্যক্রম। প্রতিবারই পুলিশের এই নির্দেশনার পরেও বিভিন্ন বাসা-বাড়ির ছাদ এবং সড়ক-অলিগলিতে এই ‘শব্দবোমা’র ব্যবহার দেখা যায়। এর বিকট শব্দ আতঙ্ক ছড়ায় শিশু, বয়ষ্ক এবং পশু-পাখিদের মধ্যে।

সমাজের সচেতন মহলের মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গা ছাড়া ভাব এবং উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপের অভাবে অসাধু ব্যবসায়ীরা এসব বিক্রি করছেন।
পুলিশ বলছে, নগরবাসী সচেতন না হলে শুধু আইন প্রয়োগ করে আতশবাজি বিক্রি কিংবা ব্যবহার থামানো সম্ভব নয়। জনগণের দায়িত্ব তাদের নির্দেশনা মান্য করা। তবে যেসব জায়গায় আতশবাজি বিক্রি হচ্ছে খোঁজ নিয়ে সেখানে অভিযান পরিচালনা করা হবে।
‘পুলিশের গ্যারান্টি, ধরতেই পারবে না’
সরেজমিনে সোমবার নগরের কোতোয়ালী থানার বক্সিরহাট এলাকার কয়েকটি দোকান ঘুরে দেখা গেছে, থার্টি ফার্স্ট নাইটের আনন্দ উল্লাসের অংশ হিসেবে আতশবাজি ও পটকা প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে প্রায় দোকানে। কোনো রাখঢাক তো নেই—উল্টো গ্যারান্টি দিয়ে বিক্রেতারা বলছেন, ‘পুলিশ সমস্যা করবে না’। কিশোর-তরুণদের পাশাপাশি প্রাপ্ত বয়স্করাও আতশবাজি-পটকা কিনতে ভিড় করছেন দোকানগুলোতে।

সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে বক্সিরহাট বদরপাতি রোডে যেতেই বাজি লাগবে কিনা জিজ্ঞেস করে এ প্রতিবেদকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। দোকানটির কোনো সাইনবোর্ড চোখে না পরলেও বিক্রেতার নাম শহীদ বলে জানা যায়।
ক্রেতা সেজে দোকানটিতে প্রবেশ করা মাত্র বিভিন্ন রকমের বাজির ফিরিস্তি তুলে ধরেন তিনি। ওই বিক্রেতা বলেন, ‘আমার চেয়ে বেশি বাজি বক্সিরহাটে কেউ বিক্রি করে না। আপনি যেমন চাইবেন সবরকমের দেওয়া যাবে। ২০ টাকা থেকে শুরু করে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত দামের বাজি আছে আমার কাছে। বোমার চাইতেও বেশি আওয়াজ হবে। আর তিন রঙের আলো হবে।’
কোত্থেকে এসব আনেন—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এগুলো ভারতীয় বাজি। ঝর্ণা বাজি, রকেট বাজি, আইপিএল বাজি, তারাবাতি, জরি বাজি, আকাশ রকেট—এমন অনেক রকমের আতশবাজি এবং পটকা আছে আমার দোকানে।’
নেওয়ার সময় পুলিশ ধরবে কিনা—জানতে চাইলে তিনি অট্টহাসি ছেড়ে বলেন, ‘গ্যারান্টি দিয়ে দিব, পুলিশ ধরবে না। এখানে সব দোকানেই তো বিক্রি হচ্ছে। আমরা বিক্রি করিতো প্রতিদিন।’

ওই দোকান থেকে বেরোতেই ‘হাসান জরি হাউস’ দোকানের এক বিক্রেতা ’সবচেয়ে কম দামে’ আতশবাজি দেওয়ার অফার দিয়ে বলেন, ‘পাইকারি রেটে দিতে পারবো। এমনভাবে প্যাকেট করে দেব কেউ বুঝতে পারবে না।’
চেয়ারম্যান জরি হাউস এবং ফয়েজ জরি হাউস নামে আরও দুটি দোকানের বিক্রেতা জানান, বর্তমানে আতশবাজি আমদানি করা সবচেয়ে কঠিন কাজ। কারণ পুরো ব্যবসাই অবৈধ। দুর্গাপূজার আগে বন্ধু ও বাণিজ্য অংশীদাররা গোপনে কাপড় ও অন্যান্য পণ্যের চালানের মাধ্যমে এগুলো নিয়ে আসেন। এবার পুরোনো আতশবাজিই বিক্রি হচ্ছে। তবে পুলিশ এখন পর্যন্ত কোনো অভিযান চালায়নি। যদিও তারা আতঙ্কে থাকেন অভিযান নিয়ে।
‘বাজি ফুটালে আনন্দ লাগে’
বদরপাতি রোডের ‘হাসান জরি হাউস’ নামে একটি দোকান থেকে আতশবাজি কিনছিলেন দুই বন্ধু। এ সময় তাদের সাথে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। অনিক নামে এক কিশোর বলেন, ‘সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি আমি। এবার থার্টি ফার্স্ট নাইটে বাজি ফুটাবো ছাদে। জানতে পেরেছি এখানে আতশবাজির পাইকারি দোকান। একটু কম দামে কিনতে এসেছি।’

আতশবাজি পোড়ালে পরিবেশ এবং প্রাণিকূলের ক্ষতি সম্পর্কে আব্বু-আম্মু বলেছে কিনা কিংবা বইতে পড়েছে কিনা—জানতে চাইলে বলেন, ‘ক্ষতির বিষয়টি টিভির নিউজে দেখেছিলাম। তবে কি করবো? ভাই-বন্ধুরা মিলে একটু আনন্দ করি একটা দিন সবাই মিলে।’
নয়ন নামে এক ক্রেতা বলেন, ‘সারাবছর শেষে থার্টি ফার্স্ট নাইটে একটু পার্টি করবো। বার্বিকিউর পাশাপাশি রাতভর বন্ধুরা মিলে গানবাজনা করবো। তাই তিন হাজার টাকার আতশবাজি কিনেছি। যেহেতু উন্মুক্ত স্থানে প্রোগ্রামে নিষেধ আছে সরকারের, তাই ছাদে আনন্দ-আয়োজন করবো একটু।’
আইনে যা আছে
শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬ অনুযায়ী এসব কার্যক্রম দণ্ডনীয় অপরাধ। প্রথমবার আইন লঙ্ঘনে এক মাসের জেল বা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে। পুনরায় অপরাধ করলে ছয় মাসের জেল বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।

এছাড়া বিস্ফোরক উপাদানাবলী আইন ২০০২-এর ৩ ধারায় বলা হয়েছে, যেকোনো ব্যক্তি বেআইনিভাবে বিপজ্জনক কোনো বিস্ফোরক দ্রব্যের বিস্ফোরণ ঘটায়, তা হলে ওই ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা ১০ বছরের কারাদণ্ড হবে। তবে এই শাস্তি কোনোভাবেই ৫ বছরের কম হবে না।
অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্যে কোনো ব্যক্তি যদি নিজ দখলে বা নিজ হেফাজতে নিজ বাসাবাড়িতে বা অন্য কোথাও বিস্ফোরক পদার্থ রাখেন তাহলে সেই ব্যক্তি বিস্ফোরক দ্রব্যাদি আইনের ৫ ধারা মোতাবেক সর্বোচ্চ ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও সর্বনিম্ন ২ বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এ ধরনের অপরাধে জননিরাপত্তার সার্থে সরকার বাদী হয়ে মামলা করেন।
যা বলছে পুলিশ
আতশবাজি এবং পটকা ফুটানোর নির্দেশনা কেবল ঘোষণাতে সীমাবদ্ধ কিনা এবং রোধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়—এমন প্রশ্নের জবাবে নগর পুলিশের উপকমিশনার (অপরাধ ও অপারেশন্স) রইছ উদ্দিন সিভয়েস২৪’কে বলেন, ‘বিস্ফোরণ আইন অনুযায়ী আতশবাজি-পটকা এমনিতেই নিষিদ্ধ। আমরা নির্দেশনা দেওয়ার পর আইনটা মানার দায়িত্ব জনগণের। এই আতশবাজি অনেক দুর্ঘটনারও জন্ম দেয়। জনগণের সচেতনতা না থাকলে আইন দিয়ে সবকিছু সমাধান করা সম্ভব নয়।’
বিভিন্ন জায়গায় আতশবাজি বিক্রির বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিবেচনায় থাকবে। যেসব দোকানে এসব বিক্রি হচ্ছে সেসব দোকানে অভিযান পরিচালনার নির্দেশনা দিয়ে দিব।’
‘পুলিশের ব্যর্থতা আছে, অবহেলা আছে’
নির্দেশনা দিলেও আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার ফলে আইন না মানার সংস্কৃতি বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে মনে করেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী। তিনি সিভয়েস২৪’কে বলেন, ‘বিস্ফোরক দ্রব্যাদি নিয়ে আলাদাভাবে মেট্রোপলিটন অ্যাক্ট আছে। শুধু ঘোষণা দিলে হবে না। অম্যান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে আইন না মানার সংস্কৃতি মানুষের মধ্যে বৃদ্ধি পায়।’

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘আইনের প্রয়োগটা কড়াকড়ি করা দরকার। বাজি ফুটানো জনস্বার্থের কোনো কাজ নয় বরং জনস্বার্থবিরোধী কাজ। এতে মানুষের জীবন এবং সম্পদ বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অর্থ অপচয় তো আছেই। এক্ষেত্রে পুলিশের ব্যর্থতা আছে, অবহেলা আছে। আবার অন্তরের মধ্যে কি আছে কি জানি!’
আতশবাজি পোড়ালে কী হয়?
জানা গেছে, আতশবাজি পোড়ালে শব্দ, আলো এবং তাপ—এই তিন প্রকারের শক্তি উৎপন্ন হয়। আতশবাজির বর্ণচ্ছটার পেছনে দায়ী বিভিন্ন রকমের ধাতব লবণ। লিথিয়াম লবণের জন্য গোলাপি রং, সোডিয়ামের লবণের জন্য হলুদ বা কমলা রং, কপার (তামা) এবং ব্যারিয়ামের লবণের জন্য সবুজ বা নীল রং হয়ে থাকে। আর স্ট্রন্সিয়ামের লবণ দেয় লাল রঙের আলো।
আতশবাজিতে যখন আগুন দেয়া হয় তখন একটি সুনির্দিষ্ট তাপমাত্রায় ধাতব লবণ এবং কেমিক্যাল এক্সপ্লোসিভ (পটাশিয়াম নাইট্রেট, সালফার) অক্সিজেনের সঙ্গে দহন বিক্রিয়া করে। এই রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে প্রচুর পরিমাণে তাপশক্তির পাশাপাশি উৎপন্ন হয় ধোঁয়া ও কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনো অক্সাইড এবং নাইট্রোজেনের মতো প্রাথমিক কিছু গ্রিন হাউস গ্যাস।
আর দহন বিক্রিয়ার ফলে উৎপন্ন তাপ দ্রুতগতিতে বের হয়ে আসে এবং আশপাশের বাতাসকে শব্দের গতির চাইতেও দ্রুততার সঙ্গে প্রসারিত করে। বাতাসের এই প্রসারণই একটি শক ওয়েভ তৈরি করে, যা আমরা বিকট শব্দ হিসেবে শুনতে পাই। এই শব্দের তীক্ষ্ণতা ১৫০ থেকে ১৭৫ ডেসিবেল পর্যন্ত হতে পারে।
যা আছে আতশবাজিতে
রসায়নবিদদের মতে, আতশবাজির মধ্যে থাকে একটি সহজদাহ্য মিশ্রণ। একটি আতশবাজিতে ৭৫ শতাংশ পটাশিয়াম নাইট্রেট অথবা পটাশিয়াম ক্লোরেট, ১৫ শতাংশ চারকোল এবং ১০ শতাংশ পর্যন্ত সালফার থাকতে পারে।

আতশবাজি-পটকা-ফানুস উড়ালেই জেল-জরিমানার ঘোষণা
এদিকে, সোমবার পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ইংরেজি নববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে আতশবাজি, পটকা ফোটানো ও ফানুস উড়ানো বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬ অনুযায়ী এসব কর্মকাণ্ড দণ্ডনীয় অপরাধ। প্রথমবার আইন লঙ্ঘনে এক মাসের জেল বা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে। পুনরায় অপরাধ করলে ছয় মাসের জেল বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
আরও জানানো হয়, আতশবাজি ও পটকা ফোটানোর কারণে শব্দদূষণ ও বায়ুদূষণ হয়। অতিরিক্ত শব্দদূষণে হৃদরোগ, স্ট্রোক ও মানসিক চাপের ঝুঁকি বাড়ে। এছাড়া ফানুস উড়ানোর ফলে অগ্নিকাণ্ড ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হয়।
নববর্ষে আতশবাজি, পটকা ফোটানো ও ফানুস উড়ানো বন্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দাবি উঠেছে। শুধু তাই নয়, পরিবেশ-ভিত্তিক বিভিন্ন সংগঠনও একই দাবি তুলছে।
চট্টগ্রাম (মহানগর, উত্তর, দক্ষিণ) সব খবর











