চুল কাটতে বেরিয়ে নিখোঁজ, ৭ মাস পর ভিক্ষারত রায়হানের সন্ধান- এক পা নেই
জাহিদুল ইসলাম, লোহাগাড়া
সাত মাস আগে বাবার কাছ থেকে ১০০ টাকা নিয়ে চুল কাটাতে বের হয়েছিল ১২ বছরের রায়হান। কথা ছিল, সেলুন থেকে চুল কেটে ফিরে আসবে বাড়িতে। কিন্তু সেই যে বের হয়েছিল, এরপর আর ফেরেনি। সাত মাস ধরে ছেলেকে খুঁজেছেন বাবা-মা, স্বজনেরা। কত জায়গায় খোঁজ করেছেন, কত মানুষের কাছে গেছেন—কোথাও মেলেনি সন্ধান।
অবশেষে শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) রাতে ছেলের দেখা পেলেন স্বজনেরা। তবে যে রায়হানকে খুঁজছিলেন, তাকে দেখে আনন্দে নয়, কান্নায় ভেঙে পড়লেন বাবা। কারণ, রায়হানের একটি পা নেই।
চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার চুনতীতে ১৯ দিনব্যাপী সীরাতুন্নবী (সা.) মাহফিল এলাকায় ভিক্ষা করার সময় স্বজনেরা তাকে শনাক্ত করেন। পরে তাকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।
রায়হান চুনতি ইউনিয়নের দক্ষিণ সাতগড় নোয়াপাড়া এলাকার নাজিম উদ্দিনের ছেলে। সে স্থানীয় একটি হেফজখানার শিক্ষার্থী ছিল।
পরিবার ও রায়হানের ভাষ্য, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় চুল কাটানোর জন্য বাবার কাছ থেকে ১০০ টাকা নিয়ে স্থানীয় একটি সেলুনে যাচ্ছিল সে। পথে একটি মিছিলের গাড়িতে ওঠে রায়হান। গাড়িটি কক্সবাজারের দিকে গেলে সেও সেখানে চলে যায়। এরপর আর বাড়িতে ফিরতে পারেনি।
রায়হানের ভাষ্য অনুযায়ী, পরে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে বডি ম্যাসাজ করে জীবিকা নির্বাহ করত সে।
সেখানেই এক ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় হয় তার। রায়হানের দাবি, ওই ব্যক্তি খাবার দেওয়ার কথা বলে তাকে ঢাকায় নিয়ে যান। পরে কমলাপুর রেলস্টেশনের কাছাকাছি একটি টিনের ঘেরা কক্ষে ‘সালমা’ নামের এক নারীর কাছে তাকে দেওয়া হয়।
রায়হানের অভিযোগ, ওই নারী ও তার সহযোগীরা তাকে সেখানে আটকে রেখে ভিক্ষা করতে বাধ্য করতেন। রায়হানসহ অন্য শিশুরা ওই নারীকে ‘নানী’ বলে ডাকত।
রায়হানের দাবি, ওই কক্ষে আরও ১৫ থেকে ২০ জন ছেলে-মেয়ে ছিল। তাদের কারও হাত, কারও পা কাটা ছিল বলেও সে জানায়। সেখানে বিভিন্ন ধরনের ধারালো অস্ত্রও দেখেছে বলে দাবি করে শিশুটি।
তার ভাষ্য, ভিক্ষা করে আয় কম হওয়ায় দুই থেকে তিন মাস পর এক রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় তার একটি পা কেটে দেওয়া হয়।
সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজের একটি পা না থাকার বিষয়টি দেখতে পায় রায়হান। পরে তাকে বলা হয়, ট্রেন দুর্ঘটনায় তার পা কাটা গেছে। হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হলে তাকে আবার কমলাপুর রেলস্টেশনে ভিক্ষা করতে নামিয়ে দেওয়া হয় বলে জানায় সে।
রায়হান বলে, ‘আমাকে খাবার ও টাকা দেওয়ার কথা বলে নিয়ে যায়। পরে ঢাকায় একটি জায়গায় আটকে রাখে। এরপর আমার পা কেটে দেয়। সুস্থ হওয়ার পর আমাকে ভিক্ষা করতে নামিয়ে দেয়।’
রায়হানের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘সালমা’ নামের ওই নারী তাকে চট্টগ্রামে নিয়ে আসেন। পরে লোহাগাড়ার চুনতীগামী একটি গাড়িতে তুলে দেন। তাকে বলা হয়, মাহফিল শেষ করে বাড়িতে গিয়ে আবার ঢাকায় ফিরে যেতে।
তবে কীভাবে শিশুটিকে চুনতীতে আনা হলো, কারা তাকে নিয়ে এল এবং ঢাকায় তাকে আটকে রাখার অভিযোগের সঙ্গে কারা জড়িত—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
এদিকে সাত মাস ধরে নিখোঁজ ছেলেকে ফিরে পাওয়ার পর স্বস্তি পাওয়ার কথা ছিল নাজিম উদ্দিনের। কিন্তু সন্তানের শরীরের দিকে তাকিয়ে সেই স্বস্তি যেন মুহূর্তেই বিষাদে পরিণত হয়েছে।
নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘সাত মাস ধরে ছেলেকে কোথায় খুঁজিনি। অনেক জায়গায় খোঁজ করেছি। অবশেষে ছেলেকে পেলেও সুস্থ অবস্থায় পাইনি। যারা আমার ছেলের এ অবস্থা করেছে, তাদের খুঁজে বের করে বিচার চাই।’
রায়হানের বাবা আরও অভিযোগ করেন, শিশুটিকে আটকে রাখার সময় তার একটি কিডনি নিয়ে নেওয়া হয়েছে। শিশুটির পেটে ও পিঠে অস্ত্রোপচারের মতো চিহ্ন রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে চিকিৎসা পরীক্ষা ছাড়া কিডনি অপসারণের অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। একইভাবে শিশুটির পা কীভাবে বিচ্ছিন্ন হয়েছে, সেটিও চিকিৎসা নথি ও তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
রায়হানকে উদ্ধারের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একটি শিশু সাত মাস নিখোঁজ থাকার পর এক পা হারানো অবস্থায় ভিক্ষা করতে ফিরে আসার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দা মুহাম্মদ নুরুচ্ছফা বলেন, ‘ছেলেটির এমন অবস্থা দেখে আমরা মর্মাহত। সে কোথায় ছিল, কারা তাকে নিয়ে গিয়েছিল এবং কীভাবে তার পা হারাল—সবকিছু তদন্ত করে বের করা দরকার।’
আইনজীবী নওশাদ আলী বলেন, শিশুটির বক্তব্যের পাশাপাশি তার নিখোঁজ হওয়ার তথ্য, পরিবারের করা জিডি বা মামলা, চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি এবং তাকে কোথা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে—সবকিছু তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। কিডনি অপসারণের অভিযোগ সত্য কি না, চিকিৎসা পরীক্ষার মাধ্যমে তা নিশ্চিত করা দরকার।
লোহাগাড়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) প্রশান্ত কুমার ভৌমিক বলেন, রায়হানকে উদ্ধারের পর তার বাবা থানায় এসে ছেলে পা হারানোর ঘটনায় বিচার দাবি করেছেন। যেহেতু শিশুটির ভাষ্য অনুযায়ী ঘটনাটি ঢাকায় ঘটেছে, তাই সেখানে গিয়ে মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সাত মাস আগে বাবার দেওয়া ১০০ টাকা হাতে নিয়ে চুল কাটতে বের হয়েছিল রায়হান। সেই ছোট্ট ছেলেটিই সাত মাস পর ফিরে এসেছে—কিন্তু আগের মতো নেই সে।
তার ফিরে আসায় পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হয়েছে ঠিকই, কিন্তু শুরু হয়েছে আরও বড় এক অপেক্ষা—রায়হানের সঙ্গে আসলে কী ঘটেছিল, কারা তাকে নিয়ে গিয়েছিল এবং কীভাবে হারাল তার একটি পা?
এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের অপেক্ষায়। রায়হানের পরিবারের দাবি, সত্য সামনে আসুক এবং তার জীবনে ঘটে যাওয়া এই ভয়াবহ ঘটনার জন্য দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হোক।
চট্টগ্রাম (মহানগর, উত্তর, দক্ষিণ) সব খবর














