Cvoice24.com

ইনোভেশন ফেয়ারে চবির পাঁচ উদ্ভাবনী প্রকল্প

চবি প্রতিনিধি, সিভয়েস২৪
১২:৩৫, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইনোভেশন ফেয়ারে চবির পাঁচ উদ্ভাবনী প্রকল্প

ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি অর্জনে সামুদ্রিক প্রযুক্তি, উচ্চশিক্ষায় স্যাটেলাইট টিভি, জাতীয় নিরাপত্তায় ড্রোন, বিদ্যুৎ-স্বাবলম্বী পরিবার এবং হাতের ইশারাকে টেক্সট ও কণ্ঠে রূপান্তরের প্রযুক্তি—এমন পাঁচটি উদ্ভাবনী প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬-এ অংশ নিয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি)।

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) ঢাকার নভোথিয়েটারে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী এ মেলা। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরের আয়োজনে ১২ থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হচ্ছে বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬। এতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা অংশ নিয়েছেন।

মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শনিবার বেলা ১২টার দিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টল পরিদর্শন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান।

গবেষণা ও উদ্ভাবনের শক্তিকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরতে এ মেলায় অংশ নিয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউট থেকে জমা পড়া ৪২টি প্রকল্পের মধ্য থেকে পাঁচটি প্রকল্প ও মডেল জাতীয় মেলায় প্রদর্শনের জন্য নির্বাচিত হয়েছে।

নির্বাচিত প্রকল্পগুলোর গবেষক ও উদ্ভাবকদের নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিদল গত ১০ সেপ্টেম্বর থেকে ঢাকায় অবস্থান করছে। প্রধানমন্ত্রীসহ দেশের নীতিনির্ধারক, গবেষক, শিল্পোদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, জাতিসংঘ ও অন্যান্য দাতা সংস্থার প্রতিনিধিদের সামনে নিজেদের গবেষণা ও উদ্ভাবন তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছেন তারা।

যেসব প্রকল্প প্রদর্শিত হচ্ছে

সুনীল অর্থনীতিতে সামুদ্রিক প্রযুক্তি : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেসের প্রফেসর ড. মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ চৌধুরীর প্রস্তাবিত প্রকল্পের লক্ষ্য বাংলাদেশের ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি অর্জনে সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে একটি সমন্বিত গবেষণা, উদ্ভাবন ও সহযোগিতা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা।

এর মাধ্যমে মৎস্য আহরণ, মেরিকালচার, সামুদ্রিক জৈবপ্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য সামুদ্রিক জ্বালানি খাতে উদ্ভাবনী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি গবেষণালব্ধ প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগ, উপকূলীয় অঞ্চলে প্রকৃতিভিত্তিক দুর্যোগ মোকাবিলা ব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক সম্পদ সংরক্ষণে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকে উৎসাহিত করার লক্ষ্য রয়েছে প্রকল্পটিতে।

উচ্চশিক্ষায় স্যাটেলাইট টিভি ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম :চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আইয়ুর ইসলামের নেতৃত্বে প্রস্তাবিত উদ্যোগে টেলিভিশন চ্যানেলের সঙ্গে মোবাইল অ্যাপ, ইউটিউব ও ওয়েবসাইট যুক্ত করে ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরির প্রস্তাব করা হয়েছে।

এর মাধ্যমে দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও ক্যাম্পাসগুলোর মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ তৈরির লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেদের চিন্তাভাবনা, উদ্ভাবন, সাফল্য ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের পাশাপাশি যৌথ অনুষ্ঠান, প্রতিযোগিতা, আলোচনা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও অন্যান্য উদ্যোগ আয়োজন করতে পারবে।

ড্রোন শনাক্ত করবে ‘স্কাইগার্ড’ : ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী শরীফ হাসানের দলগত উদ্যোগ ‘স্কাইগার্ড’। এটি একটি ড্রোন শনাক্তকারী ডিভাইস। শত্রুপক্ষের ড্রোন শনাক্ত করে নিরাপত্তা বাহিনীকে সতর্ক করার লক্ষ্য রয়েছে এ প্রযুক্তির।

উদ্ভাবকদের তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ডিভাইসটি ১ থেকে ৩ কিলোমিটারের মধ্যে থাকা এফপিভি সুইসাইড ড্রোন শনাক্ত করার পাশাপাশি ড্রোনের অ্যানালগ ভিডিও ফিড ইন্টারসেপ্ট করে ডিভাইসের ডিসপ্লেতে প্রদর্শন করতে সক্ষম। সীমান্তবর্তী বা প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চলে টহল এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তায় এটি ভূমিকা রাখতে পারে।

উদ্ভাবকদের দাবি, বাজারে থাকা অন্যান্য ডিভাইসের তুলনায় এটি ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম খরচে তৈরি করা সম্ভব।

বিদ্যুৎ-স্বাবলম্বী পরিবার গড়ার মডেল : একই বিভাগের শিক্ষার্থী মো. মোস্তাফিজুর রহমানের দলগত মডেলের লক্ষ্য সমন্বিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থাকে আরও স্মার্ট করে বিদ্যুৎ-স্বাবলম্বী পরিবার গড়ে তোলা।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় স্মার্ট এনার্জি মিটার, হোম অটোমেশন ও হাইব্রিড এনার্জি ম্যানেজমেন্ট যুক্ত রয়েছে। চাহিদা ও প্রাপ্যতা অনুযায়ী সৌরশক্তি, ব্যাটারি ও গ্রিডকে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করবে এ ব্যবস্থা। এতে বিদ্যুৎ ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানো, অপচয় কমানো এবং নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য স্মার্ট এনার্জি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার লক্ষ্য রয়েছে।

ইশারা ভাষা রূপান্তর হবে টেক্সট ও কণ্ঠে : ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী আলিফ আল জামানের দলগত প্রকল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কম্পিউটার ভিশন ও মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাংলা ইশারা ভাষা শনাক্ত করে তা তাৎক্ষণিকভাবে টেক্সট ও কণ্ঠে রূপান্তরের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

প্রকল্পটির মাধ্যমে বধির ও বাকপ্রতিবন্ধী মানুষের যোগাযোগের বাধা কমিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক অংশগ্রহণে নতুন সুযোগ তৈরির লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

গবেষণা-উদ্ভাবনে নতুন সুযোগ : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ারে অংশগ্রহণ শুধু নিজেদের প্রকল্প প্রদর্শনের সুযোগ নয়; বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও উদ্ভাবনকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরা এবং বাস্তব প্রয়োগের সঙ্গে যুক্ত করারও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, শিল্পখাত ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে ভবিষ্যতে গবেষণার ফলাফলকে আরও কার্যকর প্রযুক্তি ও ব্যবহারিক সমাধানে রূপ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন তারা।

৪২টি প্রকল্পের মধ্য থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি প্রকল্প নির্বাচিত হওয়াকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও উদ্ভাবন সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণাকে আরও কার্যকর ও প্রয়োগমুখী করার ক্ষেত্রে এ অংশগ্রহণ ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা তাঁদের।

তত্ত্বাবধানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন : প্রকল্পগুলোর সার্বিক তত্ত্বাবধান, প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা, সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ও ব্যক্তিগত উপস্থিতির মাধ্যমে আয়োজনটি সফল করতে ভূমিকা রাখছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান।

নির্বাচিত প্রকল্পগুলোর সমন্বয় ও মনিটরিংয়ের দায়িত্বে ছিলেন মেরিন সায়েন্সেস অ্যান্ড ফিশারিজ অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মো. শাহাদাত হোসেন, জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. এ.এম. মাসুদুল আজাদ চৌধুরী, পদার্থবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়া এবং ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রফেসর ড. জামাল উদ্দিন আহমেদ।