Cvoice24.com

সীতাকুণ্ডে কথাকলির শিক্ষকদের বেতন নেই কয়েক মাস, শিক্ষার্থী কমে ৮০

সাইফুল ইসলাম রুবেল, সীতাকুণ্ড
১৫:৩৫, ১০ নভেম্বর ২০২৪
সীতাকুণ্ডে কথাকলির শিক্ষকদের বেতন নেই কয়েক মাস, শিক্ষার্থী কমে ৮০

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলায় এক সময় নামকরা কয়েকটি বিদ্যালয়ের মধ্যে অন্যতম ছিল কথাকলি উচ্চ বিদ্যালয়। ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বেসরকারি বিদ্যালয়টি সময়ের পরিক্রমায় আজ জরাজীর্ণ অবস্থায় ধুকঁছে। শিক্ষকরা বেতন পান না কয়েক মাস। আটশ থেকে কমতে কমতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বর্তমানে ৮০ তে ঠেকেছে। আশংকা করা হচ্ছে, যেকোন সময় বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে যাওয়ার। তবে এতোসব হতাশার মাঝে আশার আলো দেখাচ্ছে ‘নিউ পান্জেরী’ নামে স্থানীয় একটি সামাজিক সংগঠন । বিদ্যালয়ের উন্নতিতে এক গুচ্ছ পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছে সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ।

স্থানীয়রা জানান, বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পর থেকে ছিল রমরমা অবস্থা। সব শ্রেণীতে মিলিয়ে অন্তত পাচঁ শতাধিক ছাত্রছাত্রী লেখাপড়া করত। বিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় ছাত্রছাত্রীদের কোলাহল ও পড়ার শব্দে মুখরিত থাকতো পরিবেশ। প্রথম কয়েক বছর লেখাপড়ার মানও ছিল ভাল। বিদ্যালয়ের নামডাকও চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। দূর-দুরান্ত থেকে অনেক ছাত্রছাত্রী এই বিদ্যালয়ে এসে ভর্তি হয়। 

কিন্তু ২০০০ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী কমতে শুরু করে। কমতে কমতে বর্তমানে বিদ্যালয়ের মোট ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা দাড়িঁয়েছে মাত্র ৮০ জনে। বর্তমানে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ছাত্রছাত্রী সংখ্যা ২৫ জন। ৭ম শ্রেণীতে ২৬, ৮ম শ্রেণীতে ২৪ ও ৯ম শ্রেণীতে ৫ জন। এছাড়া ২০২৪ সালের ব্যাচে এসএসসি পরীক্ষার্থী রয়েছে ৯ জন। 

তবে বিদ্যালয়ের উন্নতিকল্পে আটঘাট বেঁধে মাঠে নেমেছে সামাজিক সংগঠন “নিউ পান্জেরী”। বিদ্যালয়ের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার ও লেখাপড়ার মান ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করবে সংগঠনটি। বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন, মানোন্নয়নের উদ্দেশ্যে শিক্ষকদের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা, বিদ্যালয়ের চারপাশে একটি সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি ও ছাত্রছাত্রী সংগ্রহসহ নানাবিধ কর্ম পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে নিউ পান্জেরী।

সংগঠনটির সভাপতি ইফতেখার উদ্দিন বলেন, ‘এক সময়ের নামকরা কথাকলি উচ্চ বিদ্যালয়ের বর্তমান জরাজীর্ণ অবস্থা দেখে অনেকের মতো আমাদেরও খারাপ লাগছে। তবে হতাশ না হয়ে বিদ্যালয়টিকে আগের অবস্থা কিভাবে ফিরিয়ে নিয়ে আসা যায় তার বিস্তারিত আলোচনা শেষে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

তিনি বলেন, ‘বিদ্যালয়টির অবস্থান রেলওয়ে ঢেবা দীঘির দক্ষিণ পাড়ে। চারপাশের পরিবেশ অত্যন্ত চমৎকার হলেও পরিচর্যার অভাবে ঝোপঝাড়ে চারদিক ছেয়ে আছে। সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারলে বিদ্যালয়টিতে মনোরম পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব। এই বিষয়ে সমাজের প্রতিষ্ঠিত ও সর্বস্তরের মানুষের সহায়তা কামনা করছি ‘

জানা গেছে, বিদ্যালয়ের বর্তমানে শিক্ষক রয়েছেন ৯ জন। তার মধ্যে বিবি হনুফা, তানজিনা আক্তার, উর্মি চক্রবর্তী, শিপ্রা দে ও প্রেমতোষ ২০১৭ সালে নিয়োগ পান। সে সময় তাদের বেতন ধরা হয়েছিল ৩ হাজার টাকা করে। দীর্ঘ ৭ বছর পরে এসেও তাদের বেতন আগের মতোই আছে। তাও গত কয়েক মাস ধরেই বকেয়া পড়ে আছে। 

শিক্ষকরা বলেন, বিদ্যালয়ের মায়ায় পড়ে গেছি, এছাড়া ছাত্রছাত্রীদের প্রতি একটা দ্বায়বদ্ধতা থেকে এখনো শিক্ষকতা করে যাচ্ছি।

আরো জানা গেছে, ভর্তিকৃত ছাত্রছাত্রীদের বেতন ও শুভাকাঙ্খীদের অনুদান থেকে বিদ্যালয়ের অনুষাঙ্গিক খরচ ও শিক্ষকদের বেতন দেওয়া হত। তবে দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে বর্তমানে বিদ্যালয়ের এই দুরবস্থা। 

বিদ্যালয়টির এই পরিস্থিতির জন্য সংশ্লিষ্ট অনেকে দুষছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রূপন চন্দ্র দে-কে। তাদের মতে, বিদ্যালয়ের প্রতি প্রধান শিক্ষকের কোন আন্তরিকতাই নেই। নামকাওয়াস্তে একটি ম্যানেজিং কমিটি থাকলেও গত বিগত ২০ বছর কমিটির কোন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি। 

এছাড়া বিদ্যালয়ের আর এক শিক্ষক আরেফ বিল্লাহর বিরুদ্ধে রয়েছে ছাত্রছাত্রীদের সাথে ‘দুর্ব্যবহারের’ অভিযোগ। এটিও ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা কমে যাওয়ার একটি কারণ বলে বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও মনে করেন।

তবে প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয় পরিচালনায় ইচ্ছাকৃত গাফিলাতির কথা অস্বীকার করে বলেন, “আশপাশে পলিটেকনিক্যাল বিদ্যালয়সহ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় আমাদের ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা কমে গেছে।’ 

ছাত্রছাত্রীদের সাথে শিক্ষক আরেফ বিল্লাহর দুর্ব্যবহারের কথা স্বীকার করে তাকে একাধিকবার সতর্ক করা হয়েছে বলেও তিনি জানান। তবে শিক্ষক আরেফ বিল্লাহ নিজের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করেন।

বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র বর্তমানে পদ্মা অয়েল লিমেটেডের ব্যবস্থাপক আহমেদ গণি খোকন বলেন, ‘আমাদের সময় কথাকলির অনেক নামডাক ছিল। অথচ বর্তমানে বিদ্যালয়ের অবস্থা ভীষণ নাজুক। প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের বিদ্যালয়ের উন্নয়নে এগিয়ে আসার আহবান জানাচ্ছি।

প্রাক্তন ছাত্র পৌরসভার সাবেক কমিশনার রায়হান উদ্দিন বলেন, ‘বিদ্যালয়ের একদিকে বিরাট দীঘি, অন্যদিকে বিশাল খেলার মাঠ, একদিকে রেল লাইন ও প্রশস্ত সড়ক। চারপাশের এই মনোরম পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে এটিকে একটি অনন্য বিদ্যালয় হিসাবে গড়ে তোলা সম্ভব। একটি দক্ষ পরিচালনা কমিটি গঠন করলে বিদ্যালয়ের সব সমস্যার সমাধান হবে।’

চট্টগ্রাম (মহানগর, উত্তর, দক্ষিণ) সব খবর