সামিটের টার্মিনাল বন্ধ, এক্সিলারেটও অর্ধেক সক্ষমতায়: গ্যাস সংকটে নাকাল জনজীবন
সিভয়েস২৪ প্রতিবেদক
দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি সামিট গ্রুপের টার্মিনাল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে, আর অন্যটি এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল চলছে সক্ষমতার প্রায় অর্ধেকে। দুই টার্মিনালের এই যুগপৎ সংকটে দেশের সামগ্রিক গ্যাস সরবরাহ নেমে এসেছে গত তিন সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্নে, যার প্রভাবে সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ সারি, গণপরিবহন সংকট, বাড়তি ভাড়া, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং বাসাবাড়িতে রান্নার সমস্যায় নাকাল হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
কক্সবাজারের মহেশখালীর সাগরে ভাসমান সামিটের টার্মিনাল দিয়ে বৃহস্পতিবার (১০ আগস্ট) বিকাল তিনটা থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। মজুত ফুরিয়ে যাওয়ায় গত দুদিন ধরে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট সক্ষমতার এই টার্মিনাল দিয়ে মাত্র ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ দেয়া হচ্ছিল, নতুন করে এলএনজিবাহী জাহাজ না আসায় বৃহস্পতিবার সেটুকুও বন্ধ হয়ে যায়। এ বিষয়ে জানতে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের এল এন জি ডিভিশনের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
অন্যদিকে মহেশখালীর দ্বিতীয় টার্মিনাল, আমেরিকান কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত টার্মিনালও পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে না। ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট সক্ষমতার এই টার্মিনাল থেকে বৃহস্পতিবার ও বুধবার দুদিনই মিলেছে মাত্র ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট করে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত টার্মিনালের একটি বয়লার বর্তমানে মেরামত করা হচ্ছে, আরেকটি অকেজো অবস্থায় রয়েছে। দ্বিতীয় বয়লারটি সচল করতে হলে বর্তমানে চালু থাকা বয়লারটিও অন্তত ৭২ ঘণ্টার জন্য বন্ধ রাখতে হবে, যাতে গ্যাস সরবরাহে আবারও সাময়িক বিঘ্ন ঘটবে বলে তিনি জানান। ফলে সামিটের টার্মিনাল চালু না হওয়া পর্যন্ত মাত্র ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি দিয়েই চালাতে হবে সরকারকে, যেখানে দুই টার্মিনালের সম্মিলিত সক্ষমতা ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গতকাল দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ কমে দৈনিক প্রায় ২ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুটে (এমএমসিএফডি) দাঁড়িয়েছে, যেখানে দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ এমএমসিএফডি। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রায় ১ হাজার ৬৩০ এমএমসিএফডি এবং দুটি ভাসমান টার্মিনাল মিলে মাত্র ৪১০ এমএমসিএফডি সরবরাহ এসেছে। গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের বয়লারে আগুন লেগে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকে এটিই সর্বনিম্ন সরবরাহ। ৫ আগস্ট টার্মিনালটি আংশিকভাবে চালু হওয়ার পর সরবরাহ কিছুটা বেড়েছিল, তবে সামিট পরিচালিত টার্মিনাল ১০ আগস্ট থেকে সরবরাহ কমিয়ে দেয়ায় সামগ্রিক ব্যবস্থায় ফের বড় ধস নামে।
এই ঘাটতির প্রভাব এখন বিদ্যুৎ খাতেও স্পষ্ট। প্রতিমন্ত্রী অমিত বলেন, গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন করতে না পারার অন্যতম প্রধান কারণ গ্যাসের অপর্যাপ্ত সরবরাহ, আর দেশীয় গ্যাস উৎপাদনও রাতারাতি বাড়ানো সম্ভব নয়।
এদিকে সামিটের টার্মিনালের জন্য এলএনজিবাহী জাহাজ ‘বি ডব্লিউ লেসমেস’ আমেরিকা থেকে রওনা হয়ে আসছে, যা আগামী ১৫ আগস্ট সকাল ৬টায় মহেশখালীর কাছাকাছি বঙ্গোপসাগর এলাকায় পৌঁছানোর কথা। ৬৬ হাজার টন এলএনজিবাহী এই জাহাজ বর্তমানে দক্ষিণ ভারত মহাসাগরে মাদাগাস্কারের কাছাকাছি অবস্থান করছে। জাহাজটি পৌঁছালেই কেবল সামিটের টার্মিনাল সচল হবে, অর্থাৎ অন্তত দেড় দিন এটি বন্ধ থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের জন্য আনা আরেকটি এলএনজিবাহী ট্যাংকার ‘আল হামরা’ ১২ আগস্ট বঙ্গোপসাগরে পৌঁছেছে।
গ্যাস সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে সিএনজি ফিলিং স্টেশন ও গণপরিবহনে। ফিলিং স্টেশনগুলোর সামনে সড়কজুড়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে অটোরিকশা চালকদের। কাউকে দুই ঘণ্টা, কাউকে তিন-চার ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। গ্যাস নিতে প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা ব্যয় হওয়ায় চালকদের ট্রিপের সংখ্যা কমে গেছে, ফলে রাস্তায় নেমেছে তুলনামূলক কম সংখ্যক অটোরিকশা এবং যেগুলো চলছে সেগুলোও বাড়তি ভাড়া হাঁকছে। গ্যাসচালিত গণপরিবহনেও গাড়ির সংখ্যা কমায় মোড়ে মোড়ে যাত্রীদের জটলা বেড়েছে, আর কোনো কোনো রুটে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা আদায়ের অভিযোগ করছেন যাত্রীরা।
সংকটের আঁচ পড়েছে বাসাবাড়িতেও। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় দিনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে চুলা জ্বলছে না, ফলে কর্মজীবী অনেককে রান্না না করেই বাসা থেকে বের হতে হচ্ছে, কেউ কেউ বাধ্য হয়ে হোটেল থেকে খাবার কিনছেন। গ্রামাঞ্চলেও দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে, যা সংকটকে আরও শোচনীয় করে তুলেছে।
সার্বিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিদ্যুৎ বিভাগ বৃহস্পতিবার এক নির্দেশনায় জানিয়েছে, শপিং মল, মার্কেট ও দোকানপাট আগের নির্ধারিত রাত ৯টার পরিবর্তে বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা রাখা যাবে। আলোকিত বিলবোর্ড সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ করতে হবে এবং সব ধরনের আলোকসজ্জা বা শৌখিন বাতি বন্ধ রাখতে হবে। মেলা, বাণিজ্য মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান রাত ৮টার মধ্যে শেষ করার নির্দেশও দেয়া হয়েছে, তবে রেস্তোরাঁ, হাসপাতাল ও ফার্মেসি এই নির্দেশনার আওতামুক্ত থাকবে।
কেজিডিসিএলের এক কর্মকর্তা জানান, জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ কমে যাওয়ায় চট্টগ্রামের বরাদ্দও কমেছে, আর পরিস্থিতি সামাল দিতে বিভিন্ন খাতে গ্যাসের চাপ কমিয়ে লোড ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে কেজিডিসিএল এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত তাদের অধিভুক্ত এলাকার সব শ্রেণীর গ্রাহক প্রান্তে গ্যাসের স্বল্পচাপ বিরাজ করবে, এবং গ্রাহকদের সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত এক্সিলারেট টার্মিনাল মেরামতের কাজ চলছে এবং দ্রুত পূর্ণ সরবরাহ চালুর চেষ্টা করা হচ্ছে।
গ্যাস সংকট কবে নাগাদ কাটবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। বৈরী আবহাওয়ার কারণে এলএনজিবাহী জাহাজকে ভাসমান টার্মিনালের সঙ্গে সংযুক্ত করা না গেলে সরবরাহ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সামিটের টার্মিনাল সচল না হওয়া পর্যন্ত অন্তত আগামী দেড় দিন সংকট অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যাতে চট্টগ্রামের শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সিএনজি স্টেশনে গাড়ির দীর্ঘ সারি, গণপরিবহনের সংকট ও বাড়তি ভাড়ার ভোগান্তিও আরও বাড়তে পারে।
চট্টগ্রাম (মহানগর, উত্তর, দক্ষিণ) সব খবর














