Cvoice24.com

ভরাট নালা, ভাঙা সড়ক ও জলাবদ্ধতায় নাকাল এলাকাবাসী
উন্নয়নের আড়ালে দক্ষিণ কাট্টলীর দীর্ঘশ্বাস

শুভ্রজিৎ বড়ুয়া, সিভয়েস২৪
১২:৩২, ২৮ জুন ২০২৬
উন্নয়নের আড়ালে দক্ষিণ কাট্টলীর দীর্ঘশ্বাস

উন্নয়নের নানা প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্যেও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ১১ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ কাট্টলীতে এখনো কাটেনি নাগরিক দুর্ভোগ। ভাঙাচোরা সড়ক, অপরিষ্কার ও ভরাট নালা, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা এবং চলমান স্যুয়ারেজ ও ড্রেনেজ প্রকল্পের ধীরগতির কারণে বছরের পর বছর ভোগান্তি পোহাচ্ছেন এলাকার বাসিন্দারা।

প্রতিবেদনটি ইউটিউবে দেখুন

স্থানীয়দের অভিযোগ, ওয়ার্ডের বিভিন্ন সড়ক ও অলিগলিতে সামান্য বৃষ্টিতেই হাঁটু সমান, কোথাও কোথাও তারও বেশি পানি জমে যায়। নালা-নর্দমা আবর্জনা ও পলিতে ভরাট হয়ে থাকায় পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছে। জলাবদ্ধতার পাশাপাশি ভাঙাচোরা সড়কে বৃষ্টির পানিতে গর্ত ঢেকে যাওয়ায় প্রতিনিয়ত ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। এতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন শিক্ষার্থী, কর্মজীবী মানুষ ও বয়স্করা। 

তাদের অভিযোগ, উন্নয়নের নামে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রকল্পের খোঁড়াখুঁড়ি চললেও মৌলিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান এখনো মেলেনি। ফলে প্রতিটি বর্ষা মৌসুমে একই দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হচ্ছে এলাকাবাসীকে।

আরও দেখুন: নালায় ময়লা, রাস্তায় পানি—দুর্ভোগে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ১১ নম্বর ওয়ার্ডের মানুষ

ওয়ার্ডটি সরেজমিনে দেখা যায়, দক্ষিণ কাট্টলীর এই সড়কটি সাগরপাড়, হরিমন্দির, ফইল্যাতলী বাজার এবং সাগরিকা স্টেডিয়ামের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনকারী গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ। প্রতিদিন হাজারো মানুষ এই পথ ব্যবহার করেন। কিন্তু বৃষ্টি হলেই ড্রেনের পানি রাস্তায় উঠে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। স্থবির হয়ে পড়ে জনজীবন। 

এলাকাবাসী জানান, সম্প্রতি স্থানীয় সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান এলাকা পরিদর্শন করে দ্রুত কাজ শেষ করার আশ্বাস দিয়েছিলেন। তবে সেই আশ্বাসের কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. রফিকুল বলেন, ‘এখানে সিটি করপোরেশনের কোনো নির্দিষ্ট ডাস্টবিন নেই। বাসা থেকে ৫০ থেকে ৭০ টাকা নিয়ে ময়লা সংগ্রহ করা হলেও অনেক সময় ঠিকমতো অপসারণ করা হয় না। বিভিন্ন স্থানে ময়লা ফেলে রাখায় জলাবদ্ধতা আরও বাড়ছে।’

সুমন নামে এক অটোরিকশা চালক বলেন, ‘ভাঙা রাস্তায় গাড়ি চালানোই কষ্টকর। প্রায়ই অটোরিকশা উল্টে দুর্ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে মাস্টারবাড়ি ব্রিজ এলাকায় গর্তের কারণে ঝুঁকি বেশি।’

নুরুল আলম নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘বছরের পর বছর রাস্তা ভাঙা অবস্থায় পড়ে আছে। এখন এটি নর্দমার মতো হয়ে গেছে। এই পথে অ্যাম্বুলেন্স কিংবা ফায়ার সার্ভিসের গাড়িও সহজে চলাচল করতে পারে না।’

এলাকাবাসীর অভিযোগ, ওয়ার্ডের বিভিন্ন সড়ক ও অলিগলির নালা-নর্দমা আবর্জনা ও পলিতে ভরাট হয়ে থাকায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই ড্রেনের পানি উপচে ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও সড়কে ছড়িয়ে পড়ছে। বৃষ্টির পানিতে ভাঙাচোরা সড়কের গর্ত ঢেকে যাওয়ায় প্রতিনিয়ত ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। এতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন শিক্ষার্থী, কর্মজীবী মানুষ এবং বয়স্করা।

এ প্রসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘দেড় মাস আগে ভারী বৃষ্টিতে কোমরসমান পানি উঠে আমার দোকানে ঢুকে পড়ে। চাল, চিনি, তেলসহ বিভিন্ন মালামাল নষ্ট হয়ে প্রায় ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এখনো একটু বৃষ্টি হলেই একই অবস্থা হয়।’

স্থানীয় দোকানদাররা জানান, দীর্ঘদিন ধরে চলমান রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণকাজের কারণে ধুলাবালু, কাদা ও জলাবদ্ধতায় ক্রেতা কমে গেছে। এতে ব্যবসায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা।

রতন দাশ নামে এক দোকানদার বলেন, ‘প্রায় এক বছর ধরে কষ্ট করে ব্যবসা করছি। সামান্য বৃষ্টি হলেই মানুষ চলাচল করতে পারে না, ক্রেতাও আসে না। ব্যবসা প্রায় বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা।’

শুধু ব্যবসায়ীরাই নন, দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। শিক্ষার্থীরা সময়মতো স্কুলে পৌঁছাতে পারছে না, কর্মজীবীরা প্রতিদিন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন এবং বয়স্কদের জন্য চলাচল হয়ে উঠেছে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

তমিজুর রহমান নামে এক অভিভাবক বলেন, ‘বৃষ্টি হলেই ড্রেনের নোংরা পানি রাস্তায় উঠে আসে। ছোট ছোট শিশুদের স্কুলে যেতে খুব কষ্ট হয়। নারীরাও নিরাপদে চলাচল করতে পারেন না।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘ আট বছর ধরে রাস্তা সংস্কারের কাজ শেষ করার আশ্বাস মিললেও বাস্তবে কাজের অগ্রগতি খুবই ধীর। এর মধ্যে বিভিন্ন সংস্থার খোঁড়াখুঁড়ির কারণে জনদুর্ভোগ আরও বেড়েছে। ফলে প্রতিটি বর্ষা মৌসুমেই একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটছে।

উন্নত নাগরিক সেবার প্রত্যাশা থাকলেও দক্ষিণ কাট্টলীর মানুষ এখনো ভাঙাচোরা সড়ক, ভরাট নালা ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার মতো মৌলিক সমস্যার সঙ্গে লড়াই করছেন। চলমান স্যুয়ারেজ ও ড্রেনেজ প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করে ভাঙাচোরা সড়ক সংস্কার, নালা পরিষ্কার এবং জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তাদের ভাষায়, উন্নয়নের প্রকৃত সুফল তখনই মিলবে, যখন নাগরিকরা নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারবেন।

চট্টগ্রাম (মহানগর, উত্তর, দক্ষিণ) সব খবর