আর্থিক সহায়তা পেলেন ২২ জন
চিকিৎসার আবেদন থেকে সম্পত্তি বিরোধ— গণশুনানিতে মানুষের ভিড়
সিভয়েস২৪ প্রতিবেদক
কারও হাতে সন্তানের চিকিৎসার কাগজ, কারও হাতে ক্যান্সারে আক্রান্ত মায়ের রিপোর্ট। কেউ এসেছেন অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসার খরচ জোগাতে সহায়তার আশায়, কেউ চাকরি হারিয়ে ঋণের বোঝায় বিপর্যস্ত হয়ে। আর দূরদেশে থাকা কেউ অনলাইনে জানিয়েছেন নিজের জমি-সম্পত্তি দখলের শঙ্কার কথা। দুই শতাধিক মানুষ এভাবেই নিজেদের সংকটের কথা তুলে ধরেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের সাপ্তাহিক গণশুনানিতে। তাদের মধ্যে ২২ জনকে চিকিৎসা ও জীবিকার জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে বসে সাপ্তাহিক গণশুনানি। এতে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সেবাপ্রত্যাশীদের কথা শোনেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। অভিযোগ ও আবেদনের ধরন অনুযায়ী তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
পূর্ব বাকলিয়া থেকে আসা এক বাবা মেয়ের চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা চান। তার আয় সীমিত। সন্তান প্রসবের পর থেকে তার স্ত্রীও অসুস্থ। একদিকে স্ত্রীর চিকিৎসা, অন্যদিকে মেয়ের চিকিৎসার ব্যয়— দুই দিক সামলাতে গিয়ে পরিবারটি আর্থিক সংকটে পড়ে। চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র দেখে জেলা প্রশাসক মেয়ের চিকিৎসার জন্য তাকে আর্থিক সহায়তা দেন।
আব্দুল্লাহ আল মামুন নামে আরেক আবেদনকারী জানান, ২০২২ সালে চাকরি হারানোর পর সংসার চালাতে গিয়ে তাকে ঋণ করতে হয়েছে। সন্তানদের পড়াশোনা ও দৈনন্দিন খরচের পাশাপাশি পরিবারের একজনের ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি চট্টগ্রামে পড়াশোনার ব্যয়ও রয়েছে। তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাকেও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।
নিজের চিকিৎসার জন্য সহায়তা চাইতে আসেন অমলা দাস। তার সঙ্গে থাকা আলট্রাসনোগ্রাম প্রতিবেদনে লিভার বড় হয়ে যাওয়া, গ্রেড-২ ফ্যাটি লিভার ও সিস্টাইটিসের কথা উল্লেখ ছিল। চিকিৎসা ও ওষুধের ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়ায় তিনি জেলা প্রশাসকের কাছে সহায়তা চান। তার আবেদন বিবেচনা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।
হাটহাজারী থেকে আসা এক ব্যক্তি অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য আড়াই লাখ টাকা সহায়তা চেয়েছিলেন। দীর্ঘদিনের চিকিৎসা, পরীক্ষা ও ওষুধের খরচ চালাতে গিয়ে আর্থিক সংকটে পড়েছেন বলে জানান তিনি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় হয়ে আসা তার আবেদন শুনে জেলা প্রশাসক তাকেও আর্থিক সহায়তা দেন।
ক্যানসারে আক্রান্ত মা লক্ষ্মী দত্তের চিকিৎসার জন্য সহায়তা চাইতে আসেন মানসী দত্ত। এভারকেয়ার হাসপাতাল চট্টগ্রামের হিস্টোপ্যাথলজি প্রতিবেদনে তার বাম টনসিলের বায়োপসি পরীক্ষায় লিম্ফোপ্রোলিফারেটিভ ডিজঅর্ডার, ফেভারস নন-হজকিন লিম্ফোমা উল্লেখ রয়েছে। চিকিৎসা ও কেমোথেরাপির ব্যয় বহন করতে গিয়ে পরিবারটি আর্থিক সংকটে পড়েছে বলে আবেদনে জানানো হয়। মায়ের চিকিৎসা চালিয়ে যেতে মানসী দত্তকেও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।
রাউজান থেকে আসা আরেক ব্যক্তি দীর্ঘদিনের অসুস্থতার চিকিৎসা চালাতে গিয়ে আর্থিক সংকটে পড়ার কথা জানান। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে সহায়তা চান তিনি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় হয়ে আসা তার আবেদনও বিবেচনা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।
প্রবাসীদের সম্পত্তি নিয়ে অভিযোগ
গণশুনানিতে সরাসরি উপস্থিত মানুষের পাশাপাশি অনলাইনে যুক্ত হন বিদেশে থাকা চট্টগ্রামের চার বাসিন্দা। নেদারল্যান্ডস, ওমান, দুবাই ও কুয়েত থেকে তারা জমি, বাড়ি ও সম্পত্তি নিয়ে নিজেদের অভিযোগ তুলে ধরেন।
নেদারল্যান্ডসপ্রবাসী হাটহাজারীর নাছের ইসলামের অভিযোগ, তার মা ছকিনা খাতুনের কাছ থেকে হেবা সূত্রে পাওয়া সম্পত্তির বিপরীতে মোহাম্মদ ইব্রাহীম অবৈধভাবে নামজারি খতিয়ান সৃষ্টি করেছেন। সহকারী কমিশনার (ভূমি), হাটহাজারীর কাছে আবেদন করেও সমাধান না পাওয়ায় তিনি জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপ চান।
ওমানপ্রবাসী মিরসরাইয়ের মোহাম্মদ মোস্তফার অভিযোগ, প্রতিবেশী জাফর উল্লাহ ও তার সহযোগীরা তার কেনা সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করছেন। এ নিয়ে পরিবারের সদস্যদের ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। স্থানীয়ভাবে বৈঠক করেও সমস্যার সমাধান হয়নি বলে জানান মোস্তফা।
দুবাইপ্রবাসী ফটিকছড়ির মামুনুল হকের অভিযোগ, তার মালিকানাধীন জায়গা ভাতিজা মাসুদ দখল করে ভাড়া দিয়েছেন। পরিবারের সদস্যদেরও হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। উপজেলা প্রশাসনের তদন্তের পর জায়গা বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও বিরোধের নিষ্পত্তি হয়নি বলে জানান মামুনুল।
কুয়েতপ্রবাসী হাটহাজারীর মোহাম্মদ ফোরকান তার কেনা একটি ভবন নিয়ে অভিযোগ করেন। ভবনটি দেখাশোনার জন্য বোন শিরু আক্তার ও রাসু আক্তারকে সেখানে থাকতে দিয়েছিলেন তিনি। তার অভিযোগ, তারা ও আরও কয়েকজন এখন ভবনটি দখলের চেষ্টা করছেন। তার তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকেও সেখানে থাকার সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন ফোরকান।
প্রবাসীদের এসব অভিযোগ শুনে জেলা প্রশাসক সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিষয়গুলো তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে নেওয়া ব্যবস্থার অগ্রগতি ও ফলাফল অভিযোগকারীদের জানাতে বলেন তিনি।
এদিন শারীরিকভাবে অসুস্থ ও অসহায় ২২ ব্যক্তিকে চিকিৎসা ও জীবিকার জন্য জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়। এছাড়া রোবোটিক্স অলিম্পিয়াডে অংশ নিতে যাওয়া এক মেধাবী শিক্ষার্থীকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পন্সরশিপ দেওয়া হয়।
চট্টগ্রাম (মহানগর, উত্তর, দক্ষিণ) সব খবর












