Cvoice24.com

জলাবদ্ধতা রোধে বিচ্ছিন্ন নয়, চাই সমন্বিত পরিকল্পনা: আমির খসরু

সিভয়েস প্রতিবেদক
২০:১৭, ৯ অক্টোবর ২০২৬
জলাবদ্ধতা রোধে বিচ্ছিন্ন নয়, চাই সমন্বিত পরিকল্পনা: আমির খসরু

চট্টগ্রাম মহানগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে সামষ্টিক পরিকল্পনা নিতে হবে, যাতে এক এলাকার সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে অন্য এলাকায় নতুন সমস্যা তৈরি না হয়।

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) বিকেলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) টাইগারপাস কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে করণীয় নির্ধারণে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।

আমির খসরু বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে বিভিন্ন সময়ে একাধিক প্রকল্প নেওয়া হলেও সামগ্রিক পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের অভাবে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত কাজ পর্যালোচনার পাশাপাশি যেসব কাজ বাকি রয়েছে, সেগুলো দ্রুত শেষ করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। 

প্রকল্পগুলো সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে অর্থের অপচয় কমবে, কাজের গতি বাড়বে এবং নগরবাসীর দুর্ভোগ কমানো সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, বড় খালগুলোর উন্নয়নের পাশাপাশি দুই পাড়ে হাঁটার উপযোগী পথ এবং সুযোগ থাকলে সাইকেল ট্র্যাক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। খালকেন্দ্রিক উন্নয়নকে শুধু পানি নিষ্কাশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নাগরিকদের হাঁটাচলা, শরীরচর্চা ও অবসর কাটানোর সুযোগ সৃষ্টির অংশ হিসেবে দেখতে হবে। নগরীর পরিবেশ ও সৌন্দর্য বাড়াতে বৃক্ষরোপণের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), পানি উন্নয়ন বোর্ড, চট্টগ্রাম ওয়াসা ও বন্দর কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নিয়মিত সমন্বয় ও পর্যালোচনার মাধ্যমে কাজ করার আহ্বান জানান অর্থমন্ত্রী। এ লক্ষ্যে প্রতি মাসে কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

১৩০ খালের মধ্যে ৪১টির উন্নয়ন পরিকল্পনা
সভাপতির বক্তব্যে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, নগরীর নালা ও খাল পরিষ্কার এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সঙ্গে নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করা হচ্ছে। বর্ষার আগে নালা ও খালের উন্নয়ন ও পরিষ্কার কার্যক্রমের জন্য ৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ায় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

মেয়র বলেন, নগরীতে মোট ১৩০টি খাল চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটির উন্নয়নকাজ শেষ হয়েছে এবং আরও ৪১টি খাল উন্নয়নের জন্য প্রকল্প প্রণয়নের কাজ চলছে। উন্নয়নকাজ শেষ হওয়া খালগুলো চসিকের কাছে হস্তান্তরের পর প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা ও রক্ষণাবেক্ষণ সমন্বিতভাবে পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিমানবন্দর এলাকায় ২ দশমিক ২ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ সাইকেল ট্র্যাক নির্মাণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে খালকেন্দ্রিক উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে হাঁটার পথ ও সাইকেল ট্র্যাক যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। জলাবদ্ধতামুক্ত, পরিচ্ছন্ন ও পর্যটনবান্ধব চট্টগ্রাম গড়ে তুলতে খালগুলোর উন্নয়ন ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি।

চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ বলেন, তাঁর নির্বাচনী এলাকার কিছু স্থানে ভারী বৃষ্টির পর দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকে। এর পেছনে ড্রেনেজ ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতা ও পানি নিষ্কাশনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল ও পানি সংরক্ষণের স্থানগুলোকে সমন্বিত ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার পাশাপাশি পানি নিষ্কাশনের পথে প্রতিবন্ধকতা দূর করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএ, চসিক, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ওয়াসাসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় আরও বাড়াতে হবে। নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সমন্বিতভাবে কাজ করা গেলে চলমান প্রকল্পগুলোর সুফল দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা সম্ভব হবে।

সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, নগরীর ১৩০টি খালের মধ্যে ৩৭টি সংস্কার করা হয়েছে। পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখা এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে অবশিষ্ট খালগুলোও প্রয়োজন অনুযায়ী সংস্কার করতে হবে। নগরীতে স্থাপিত স্লুইসগেট ও রেগুলেটরগুলোর কার্যকর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে বিশেষ প্রকল্প নেওয়া এবং দক্ষ প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালনার বিষয়টি বিবেচনার প্রস্তাব দেন তিনি।

আউটার রিং রোড প্রকল্পের অগ্রগতি তুলে ধরে সিডিএ চেয়ারম্যান বলেন, কালুরঘাট পর্যন্ত প্রকল্পের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার আশা করা হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নদীর তীরবর্তী এলাকার সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও নগরবাসীর বিনোদনের সুযোগ সম্প্রসারিত হবে।

সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামসুল আলম শামস বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনের চলমান মেগা প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষের পথে। প্রকল্পটি শেষ হলে নগরীর জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমবে। তবে প্রকল্পের বাইরে থাকা খালগুলোও খনন করতে হবে এবং সংস্কারের পর সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে জোর দিতে হবে।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে পাম্প ও স্লুইসগেট স্থাপন করলেই হবে না, সেগুলোর কার্যকর পরিচালনা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি জানান, সাম্প্রতিক বন্যায় সাতকানিয়া ও বাঁশখালীতে মানুষ ও যানবাহনের আশ্রয়ের উপযোগী উঁচু জায়গার সংকট দেখা গেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতিটি ইউনিয়নে অন্তত এক কিলোমিটার রাস্তা তুলনামূলক উঁচু করে নির্মাণের প্রস্তাব দেন তিনি। বন্যার সময় এসব রাস্তা মানুষ ও গবাদিপশুর আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। পাশাপাশি হেলিকপ্টার অবতরণ ও সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থাও রাখার প্রস্তাব দেন জেলা প্রশাসক। এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।

ক্রস খাল নির্মাণের প্রস্তাব ওয়াসার
চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম বলেন, স্লুইসগেট ও রেগুলেটর পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণে দক্ষ প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানকে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।

নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে অন্তত দুটি সংযোগকারী ‘ক্রস খাল’ নির্মাণের প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, মহেশখাল সম্প্রসারণসহ এ ধরনের খাল নির্মাণ ও সংযোগ নিশ্চিত করা গেলে পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা বাড়তে পারে। পাশাপাশি নৌচলাচলের সুযোগও সৃষ্টি হতে পারে।
খালের পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া রোধে ভবিষ্যতে সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে আর্চ ব্রিজের নকশা বিবেচনার পরামর্শ দেন ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক। 

তিনি আরও জানান, হালিশহরে সুয়ারেজ প্রকল্পের কাজ আগামী বছর শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে গৃহস্থালি বর্জ্যপানি সরাসরি ড্রেনে যাওয়ার প্রবণতা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এ ছাড়া আগামী ১০০ বছরের পানির চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। বাণিজ্যিক এলাকার জন্য সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে দৈনিক ১০০ কোটি লিটার পানি শোধনের একটি প্রকল্প গ্রহণের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

সভায় চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী, অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মনোয়ারা বেগম, জলাবদ্ধতা নিরসন মেগা প্রকল্পের পরিচালক লে. কর্নেল মোহাম্মদ মহসিন, চসিকের সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন, প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমান, বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধি, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

চট্টগ্রাম (মহানগর, উত্তর, দক্ষিণ) সব খবর