Cvoice24.com

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মার্কিন বিশেষ দূত, নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জোরালো দাবি

উখিয়া-টেকনাফ প্রতিনিধি, সিভয়েস২৪
১৯:১০, ৩১ জুলাই ২০২৬
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মার্কিন বিশেষ দূত, নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জোরালো দাবি

মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গার মানবিক পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত অ্যাম্বাসেডর সার্জিও গোর। শুক্রবার (৩১ জুলাই) কক্সবাজারের উখিয়ার বিভিন্ন রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির পরিদর্শনকালে প্ল্যাকার্ড হাতে শান্তিপূর্ণভাবে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের দাবি জানান রোহিঙ্গারা। 

শুক্রবার সকাল ১১টা ৫০ মিনিটে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ঢাকা থেকে কক্সবাজার বিমানবন্দরে পৌঁছান সার্জিও গোরের নেতৃত্বাধীন আট সদস্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল। বিমানবন্দরে তাদের স্বাগত জানান জেলা প্রশাসন, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) কার্যালয়ের কর্মকর্তা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

প্রতিনিধি দলে ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত অ্যাম্বাসেডর ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাউন্সিলর এরিক গেলান, বিশেষ দূতের সিনিয়র উপদেষ্টা চার্লস হর্টন ও চেস্টার ক্রোগার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা অফিসের সহকারী কর্মকর্তা ক্রিস ওসবোর্ন ও ইয়ান ডিক, এবং সমন্বয়কারী কর্মকর্তা আহমদ হোসেন।

কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে প্রতিনিধি দলটি সরাসরি উখিয়ার ক্যাম্প-৪, ক্যাম্প-৪ এক্সটেনশন, ক্যাম্প-৮ ওয়েস্ট (৮-ডব্লিউ) এবং ক্যাম্প-৬ পরিদর্শন করেন। সফরকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পজুড়ে অতিরিক্ত পুলিশ, এপিবিএন, র‍্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। প্রবেশপথ, অভ্যন্তরীণ সড়ক ও আশপাশের এলাকায়ও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।

পরিদর্শনের সময় প্রতিনিধি দল রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের জীবনযাত্রার বাস্তব চিত্র সম্পর্কে ধারণা নেন। তারা খাদ্য সহায়তা, চিকিৎসাসেবা, শিশুদের শিক্ষা, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন, নারীদের নিরাপত্তা, অগ্নিকাণ্ড ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি, জীবিকার সীমাবদ্ধতা এবং ক্যাম্পের সার্বিক মানবিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নেন।

এ ছাড়া জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ও এনজিওগুলোর পরিচালিত স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা ও সুরক্ষা কার্যক্রমও পরিদর্শন করেন তারা। মানবিক সহায়তায় অর্থায়ন কমে যাওয়ায় সৃষ্ট চ্যালেঞ্জ নিয়েও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করেন প্রতিনিধি দলের সদস্যরা।

প্রতিনিধি দলের সফরকে কেন্দ্র করে শতাধিক রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও তরুণ প্ল্যাকার্ড হাতে শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের দাবি তুলে ধরেন। একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, "You have your home! We miss our home!" (আপনার নিজের ঘর আছে, আমরা আমাদের ঘরকে মিস করি)। এছাড়া "Safe Repatriation is Our Right", "We Want Justice" এবং "We Want Citizenship in Myanmar" লেখা প্ল্যাকার্ডও প্রদর্শন করা হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রহিম বলেন, ‘রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন ধরে নিজ দেশে ফিরতে পারছে না। তারা শান্তিপূর্ণভাবে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছে।’

রোহিঙ্গা নেতা মো. মাস্টার সৈয়দ উল্লাহ বলেন, ‘আমরা বছরের পর বছর ধরে ক্যাম্পে অনিশ্চিত জীবন কাটাচ্ছি। আমাদের সন্তানরা এখানেই বড় হচ্ছে, কিন্তু তাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। আমরা নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করে নিজ দেশে ফিরে যেতে চাই।’

উখিয়ার ৮ নম্বর ক্যাম্পের হেড মাঝি এনায়েত উল্লাহ বলেন, ‘বাংলাদেশ আমাদের আশ্রয় দিয়েছে, এজন্য আমরা কৃতজ্ঞ। কিন্তু কেউই চিরকাল নিজের দেশ ছেড়ে অন্যের আশ্রয়ে থাকতে চায় না। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসেছে।’

ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে প্রতিনিধি দলটি উখিয়া সদর দক্ষিণ স্টেশন এলাকায় নর্থ এন্ড কফি হাউজে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বৈঠক ও চা-চক্রে অংশ নেয়।

বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটের সর্বশেষ পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা, তহবিল সংকট, ক্যাম্পের আইনশৃঙ্খলা, সীমান্ত নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

সূত্র জানায়, প্রতিনিধি দলকে জানানো হয়েছে যে, বাংলাদেশ মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। তবে এত বড় জনগোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান স্থানীয় জনগোষ্ঠী, পরিবেশ, অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করছে। তাই নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের বিকল্প নেই।

সংশ্লিষ্টদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তায় অন্যতম বৃহৎ দাতা দেশ। ফলে সার্জিও গোরের এই সফর আন্তর্জাতিক সহায়তা বৃদ্ধি, কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার এবং মিয়ানমারের ওপর প্রত্যাবাসন ইস্যুতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

তিন দিনের সরকারি সফরের অংশ হিসেবে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে প্রতিনিধি দলটি বিকেল ৫টার দিকে কক্সবাজার ত্যাগ করেন।


 

কক্সবাজার সব খবর