স্মরণ
রুপালি গিটারের জাদু, কৈশোরের নায়ক আইয়ুব বাচ্চু
লিখেছেন : অনুপম শীল
মধ্য নব্বইয়ে আমরা ছিলাম হাই স্কুলের গণ্ডিতে। কিশোর মনে দারুণ সব উচ্ছ্বাস জমা হতো। সেই সব আবার নানাভাবে প্রকাশও পেতো। গ্রামে বড়দের দেখে কিংবা আরও অনেকের মতো আমরা শুনতে শুরু করি রক-মিউজিক। তখন সময় ছিল টেপ রেকর্ডার আর ফিতের ক্যাসেটের। বেশি কিছু না বুঝেই আমরা শুনতাম। এক প্রলয় দোলা বইতো মনে।
সম্ভবত কোনো এক ঈদে আমরা হাতে পেলাম প্রিন্স মাহমুদের একটি মিক্সড অ্যালবাম ‘ওরা এগারো জন’। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে চলচ্চিত্র নয়, সেই সময়ের এগারো ব্যান্ড তারকার গান নিয়েই ছিল সেই অ্যালবাম। সেই অ্যালবাম থেকেই বাচ্চুকে আলাদা করে মনে রাখার শুরু। টেপ রেকর্ডারে অনবরত বাচ্চুই বেজেছে আমাদের। এরপর পিয়ানো, যন্ত্রণার মতো মিক্সড অ্যালবাম অথবা প্রেম তুমি কি, মন চাইলে মন পাবে, অচেনা জীবন। বাংলাদেশের পথে ঘাটে, চায়ের দোকানে কিংবা তারুণ্যের আড্ডায় প্রাসঙ্গিকভাবেই বেজেছে আইয়ুব বাচ্চু। সেইসময় বাংলাদেশে রক মিউজিকে এক উজ্জ্বল তারাই হয়ে জ্বলে উঠেছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। আমাদের কৈশোরকাল যাঁদের সুরে, ঝংকারে নিমগ্ন হয়েছিলো আইয়ুব বাচ্চু তাঁদের অন্যতম। কালো ফিতেয় মোড়া আইয়ুব বাচ্চুর সেই সুরের হাতছানিতে আমরা বুঁদ হয়েছিলাম। আমাদের আগে পরে আরও বেশ কয়েকটি প্রজন্মই এই সুরের সাক্ষী। বাচ্চুর রুপালি গিটারের সাক্ষী।
হোক সৌভাগ্যবশত: অথবা সুযোগে চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে আমাদের উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণীর নবীণবরণে গাইতে এসেছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। সেই প্রথম কৈশোরের নায়ককে কাছ থেকে দেখা। সামনাসামনি ঝাঁকড়া চুলের আর দরাজ গলা হাজার হাজার তরুণকে নিমিষে উন্মাদনায় ভাসিয়েছিলেন।
আইয়ুব বাচ্চু আমাদের কাছে আলাদা হয়েছেন সময়ের দাবি পূরণ করে। একটা আলাদা অনুরণন তুলে তিনি জানান দিয়েছেন। তাঁর গানের মাধ্যমেই ‘ঘুমন্ত শহরে’ ‘রুপালি গিটার’ হাতে অসংখ্য তরুণ-তরুণী প্রশ্ন করেছে ‘সেই তুমি কেন এতো অচেনা হলে’। আর তাতে অসংখ্য মানুষের ‘ফেরারি মন’ ‘একদিন ঘুম ভাঙ্গা শহরে’ গেয়ে উঠলো ‘আর বেশি কাঁদালে উড়াল দেব আকাশে’। গানের কথা ও সুরে এই অঞ্চলের তরুণ-তরুণীদের কাছে নিকটের মানুষ হিসেবে ধরা দিয়েছেন। সবাই তাঁকে ‘আপন মানুষ’ হিসেবে মনে নিয়েছেন।
অসংখ্য মানুষের মনের দাবি পূরণ করে ‘আপন মানুষ’ হিসেবে নিজেকে তৈরি করতে আইয়ুব বাচ্চু কি কি করেছেন, সেই হিসেব আমরা পরে অনেকবার শুনেছি। অধ্যবসায় আর একাগ্রতাকে সাথী করে তিনি ডুবেছিলেন সৃষ্টির উন্মাদনায়। তাঁর সতীর্থ অনেক অনেকবার এই গুণটির কথা বলেছেন।
গিটারের প্রসঙ্গে আইয়ুব বাচ্চুর চেয়ে বাংলাদেশে প্রাসঙ্গিক আর কে হতে পারে? এমন প্রতিভা সমকালীন বিশ্ব খুব কমই দেখেছে। আর এই উপমহাদেশের গিটার প্রেমীরা তো তাঁর সৃষ্টির উন্মাদনায় অসংখ্য দিন-রাত পার করেছে মুগ্ধতা নিয়ে। খুব কাছ থেকে অনেকবার আইয়ুব বাচ্চুর গিটারের ঝংকার শুনেছি। এতো নিবিষ্টতা আর মনোযোগ নিয়ে বাজাতেন তিনি। মনে হত তপস্যা করছেন।
শেষবার চট্টগ্রামের একটি পাঁচতারকা হোটেলে শুধু গিটার বাজানোর অনুষ্ঠানে খবর সংগ্রহ গিয়েছিলাম। যতোটা সংবাদ সংগ্রহে, তারচেয়ে কয়েক সহস্রগুন ছিল বাচ্চুর গিটারের টান। আমি অবাক হয়ে দেখেছি একটি শব্দও মুখে উচ্চারণ না করে শুধু গিটারের তারে কয়েকশো তরুণকে তিনি কখনও উন্মাতাল নাচিয়েছেন। আবার কখনও নিশ্চুপ করেছেন বিরহী গিটারের সুরে।
প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর আরেকটি কাজ নীরবে করেছেন আইয়ুব বাচ্চু। সেটি নবীনদের পথ দেখানো। যখনই কাউকে চোখে পড়েছে কিংবা তিনি মনে করেছেন ‘তাঁকে দিয়ে হবে’। তখনই সেই নবীন শিল্পীকে প্রাণান্ত সঙ্গ দিয়েছেন। পায়ের নিচে তৈরি করে দিয়েছেন শক্ত জমিন।
শেষ যেদিন আইয়ুব বাচ্চু চট্টগ্রাম এলেন কফিনে মোড়া। সেদিন চট্টগ্রামের পথঘাট জানে সমকালীন বাংলাদেশের তরুণেরা তাঁর জন্য কতটা ভালোবাসা বুকে এখানকার তরুণেরা বেঁচেছিল। কেউ ছুটে এসেছে পায়ে হেঁটে, কেউবা নিজের চিরসঙ্গী হুইল চেয়ারে করে। তাঁর জন্য ছুটে আসা প্রতিটি তরুণের চোখের জল হয়ত প্রমাণ করেছে কিংবদন্তীর মৃত্যু নেই।
ভালোবাসা, মন্দবাসা, প্রেম কিংবা বিরহে- ভীষণভাবে তারুণ্য ঘনিষ্ঠ ছিলেন এই সংগীতশিল্পী। এই তল্লাটে আমাদের বেড়ে উঠার কালে ভালোবাসার অমোঘ এই শিল্পীর প্রতি ভালোবাসা ভিন্ন আর কি দিতে পারে আমাদের প্রজন্ম...?
শুভ জন্মবার্ষিকী আইয়ুব বাচ্চু।

# লেখক : অনুপম শীল, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী।
সাহিত্য-সংস্কৃতি সব খবর















