Cvoice24.com

জ্বালানি তেলের বাড়তি দামের বোঝা যাত্রীর ঘাড়ে

শুভ্রজিৎ বড়ুয়া, সিভয়েস২৪
১৭:৪৫, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জ্বালানি তেলের বাড়তি দামের বোঝা যাত্রীর ঘাড়ে

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর চট্টগ্রাম নগরে এর প্রভাব পড়েছে গণপরিবহনের ভাড়ায়। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকেই বিভিন্ন রুটের বাস ও মিনিবাসে আগের ভাড়ার চেয়ে ৫ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। হঠাৎ ভাড়া বাড়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন যাত্রীরা, কোথাও কোথাও চালক-হেলপারের সঙ্গে তর্কেও জড়াচ্ছেন তারা।

এদিকে, নগরের বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, দুই নম্বর গেট, জিইসি, ওয়াসা, আগ্রাবাদ, দেওয়ানহাট, চকবাজার, নিউমার্কেট ও অলংকার মোড় এলাকায় সকাল থেকেই বাড়তি ভাড়া নেওয়ার চিত্র দেখা গেছে। নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ৫ টাকা বেশি চাওয়ায় কয়েকটি গাড়িতে চালক-হেলপারের সঙ্গে যাত্রীদের কথা কাটাকাটিও হয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে পরিবহন পরিচালনার খরচ বেড়েছে— এমন যুক্তিতে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার কথা বলছেন পরিবহন শ্রমিকরা।

এক রাতের ব্যবধানে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি সর্বোচ্চ ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। নতুন দর অনুযায়ী, সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দাম বাড়ার পর থেকেই নগরের বিভিন্ন সড়কে গণপরিবহনে বাড়তি ভাড়া আদায়ের চিত্র দেখা যায়।

হঠাৎ ভাড়া বাড়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন রুটের যাত্রীরা। বিশেষ করে প্রতিদিন কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িক কাজে গণপরিবহনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের মাসিক যাতায়াত ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। 

মুরাদপুরে গণপরিবহনে চলাচলকারী জুবায়ের বলেন, ‘এটা সবার জন্যই প্রেশার (চাপ) হয়ে যাচ্ছে। হুট করে ক্রাইসিসে পড়া, তেলের দাম বাড়া আমাদের জন্য ভোগান্তি ছাড়া আর কিছুই না। সরকার সবকিছুর দাম বাড়াচ্ছে। আমাদের ইনকামতো (আয়) বাড়ছে না।’

দুই নম্বর গেট থেকে নিয়মিত গণপরিবহনে যাতায়াত করেন সোহেল। তিনি বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে তা সরাসরি পরিবহন, শিল্প ও কৃষিতে প্রভাব পড়ে। তাই সবার আয় বাড়ার সম্ভবনাও কমে যায়। তাই সরকারের উচিত ছিল ধাপে ধাপে বাড়ানো। এক লাফে ২০ টাকা বাড়ানো তো কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়।’

আগ্রাবাদে গণপরিবহনে যাতায়াতকারী মিশুক বলেন, ‘আমি চাই আয় অনুযায়ী ব্যয় ঠিক রাখতে। এখন সরকারই যদি আমাদের ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনা করে তাহলে আমাদের বিকল্প চিন্তা করতে হবে। আর সৎভাবে আয়ের বিকল্প চুরি করা। রাজনীতিবিদের মতো তো ডাকাতি করতে পারবো না। তাই তারা আমাদের চোর বানানোর চেষ্টা করছে।’

পরিবহন শ্রমিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় গাড়ি পরিচালনার খরচ বেড়েছে। এ কারণে বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে বলে মন্তব্য করছেন পরিবহন শ্রমিকরা।

এ প্রসঙ্গে একে খান মোড়ের হিউম্যান হলার চালক মাকসুদ বলেন, ‘এর আগেও তো একবার তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। আমরা তো তখন ভাড়া বাড়াইনি। এখন আবার বাড়ানো হয়েছে। এক লাফে ২০ টাকা বেড়েছে। তাই ৫ টাকা করে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। অনেক যাত্রী বিষয়টি বুঝতে পারছেন। তারা তর্ক করছেন না। কিন্তু অনেকে এটা নিয়ে আমাদের গালাগাল করছেন। কিন্তু কি করবো! পেটের দায়ে সব করতে হচ্ছে।’

দেওয়ান হাট মোড়ে কথা হয় সোহেল নামে এক বাস সহকারীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমরা বাড়তি টাকায় তেল কিনছি। এ তেল পোড়া (খরচ) বাসে চড়ে আপনি বাড়তি ভাড়া দিবেন না? আমাদের তেল মাগনা (বিনামূল্যে) দিক, আমরাও মাগনা চড়াবো।’

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব শুধু গণপরিবহনের ভাড়াতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বলে আশঙ্কা করছেন সাধারণ মানুষ। পরিবহন ব্যয় বাড়লে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এবং সার্বিক জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়তে পারে— এমন চিন্তায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন পূর্বাঞ্চল (চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগ) কমিটির সভাপতি মৃণাল চৌধুরী বলেন, ‘কোনো আলাপ আলোচনা ছাড়া হঠাৎ করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো মানে যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের মুখোমুখি অবস্থানে ফেলা। যাত্রীরা হঠাৎ বাড়তি ভাড়া দিতে রাজি হবে না। আর পরিবহন শ্রমিকরা অপারগ হয়ে বাড়তি দামে তেল কিনছেন। তাই এটাকে এডজাস্ট (সমন্বয়) কিভাবে করা যায় তা নিয়ে আজ (সোমবার) সন্ধ্যায় আমরা বসবো। মিটিংয়ে কি সিদ্ধান্ত হয়, তা পরে জানানো হবে।’

সার্বিক বিষয়ে সরকারের বিকল্প চিন্তার প্রয়োজন উল্লেখ করে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘সরকার এখন বৈশ্বিক সংকটের কথা বলছে। কিন্তু বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) দীর্ঘদিন ধরে লাভ করেছে এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা দিয়েছে। সেই অর্থের একটি অংশ পড়ে ছিল। সংকটকালীন সময়ে সেই লাভের অর্থ ব্যবহার করা যেত কি না এবং বিকল্প কোনো পথ বের করা যেত কি না, সেটিও বিবেচনা করা প্রয়োজন ছিল।’

জ্বালানি তেলের কারণে সব খাতে খরচ বাড়ার শঙ্কা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে শিল্প-কলকারখানা, অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বাসাবাড়িসহ সব জায়গাতেই খরচ বাড়বে। গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনের খরচও বাড়বে। এসব খরচ বাড়লে শেষ পর্যন্ত বাড়তি টাকাটা ভোক্তার পকেট থেকেই যাবে। এতে মানুষের খরচের পাল্লা ভারী হবে। একইসঙ্গে অন্যান্য পণ্য ও সেবার সঙ্গে জ্বালানি তেলের সম্পর্ক থাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও আরেক দফা বাড়তে পারে।’

চট্টগ্রাম (মহানগর, উত্তর, দক্ষিণ) সব খবর