মানুষকে মূল্যায়ন এবং বর্ণবাদি আচরণ!
শাহারিয়ার আহম্মেদ চৌধুরী, নরওয়ে থেকে
আমাদের দেশের মানুষ যখন বিদেশে আসেন; তখন একটি বিষয় প্রায়ই আলোচনায় উঠে আসে তা হলো, বর্ণবাদ (Racism)।
আমরা বলি, ইউরোপ-আমেরিকার মানুষ বর্ণবাদি। তারা আমাদের রঙ, ভাষা, জাত বা ধর্ম দেখে বিচার করেন। কিন্তু একটু থেমে যদি আমরা নিজেদের দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাবো; আমরাও কম নই। বরং অনেক ক্ষেত্রেই আমরা আরও বেশি বর্ণবাদি।
বিদেশিরা হয়তো আমাদের মতকে পছন্দ নাও করতে পারেন, কিন্তু আমরা? আমরা তো নিজেদের দেশের মানুষকেই আলাদা করে ফেলি। আমরা বিচার করি, কে কোন এলাকা থেকে এসেছে, কেমন দেখতে, তার উচ্চতা কত, গায়ের রঙ কেমন, পরিবারের অবস্থা কেমন ইত্যাদি ।
এমনকি, কারো পোশাক-আশাক সুন্দর না হলে, তার চেহারা ভালো না হলে; তার সাথে মেশাতো দূরের কথা, কথাও বলতে আমরা অস্বস্তি বোধ করি।
এই বর্ণবাদ শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটা ছড়িয়ে পড়েছে আমাদের বাচ্চাদের আনন্দের মধ্যেও।
ঈদে বাচ্চাদের ‘ঈদি’ কিংবা গিফট দেওয়ার দেওয়ার ক্ষেত্রেও আমরা হিসাব করে ফেলি, 'ওর বাবা কত টাকার মালিক? আমি যদি ওর বাচ্চাকে ১০০ টাকা ঈদি দেই, ও আমার বাচ্চাকে কত দেবে?'
নিজের সুবিধা বুঝে ঈদি দেওয়া অথবা কাউকে কম দেওয়ার কারণ তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো না! এগুলোও তো বর্ণবাদি মানসিকতার অংশ।
আমার একবার মনে আছে, একজন ছোটবেলায় আমাকে ঈদি দিয়েছিলেন মাত্র ২ টাকা। আর আমার পাশের বন্ধুকে দিয়েছিলেন ২০ টাকা। কারণ তিনি জানতেন, আমার বাবার অবস্থা কী রকম!
এমন ছোট ছোট আচরণগুলো থেকেই বোঝা যায়, আমরা নিজেরা অজান্তেই মানুষকে শ্রেণিবিন্যাস করি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এর প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট। কেউ যদি আমাকে ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠায়, আপনি-আমি আগে দেখে নেয়, এই মানুষটা 'আমার লেভেলের' কিনা। যদি গ্রাম থেকে হয় বা একটু সাদামাটা দেখায়, সাথে সাথেই 'ডিলিট রিকুয়েস্ট' অথবা ঝুলিয়ে রাখি।
অথচ এই মানুষটাই হয়তো মনের দিক থেকে অনেক বেশি ভালো, অনেক বেশি যোগ্য।
এই মানসিকতা শুধুই বর্ণবাদ না, এটা একধরনের মানবতাবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি।
আমরা মানুষকে মানুষ হিসেবে না দেখে, দেখি তার আর্থ-সামাজিক অবস্থান, বাহ্যিক রূপ। কিংবা তার পেছনের ইতিহাসকে।
এই মানসিকতা পরিবর্তন সম্ভব, যদি আমরা আমাদের ধর্মীয় শিক্ষা মেনে চলি। সব ধর্মই মানুষকে ভালোবাসতে শেখায়। মানুষকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করতে শেখায়।
ইসলাম, হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম, খ্রিস্টান ধর্মসহ প্রতিটা ধর্মেই ‘সমতা’র গুরুত্ব অপরিসীম। কেউ কারও চেয়ে ছোট নয়, কেউই বড় নয়; সৃষ্টিকর্তার কাছে সবাই সমান।
নিজের ভেতরের ছোট ছোট বর্ণবাদি আচরণগুলোকে চিহ্নিত করা উচিত। আসুন, মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখা শুরু করি।
সে দেখতে কেমন, তার পরিবারে কত টাকা আছে! সে শহরের না গ্রামের! বরং সে একজন মানুষ, এটাই হোক আসল পরিচয়।
প্রবাস সব খবর















