Cvoice24.com

প্রকৃতির রক্ষক ইমরান, লোকালয় থেকে সাপ উদ্ধার করে ফেরান বনে

অর্ণব মল্লিক, কাপ্তাই 
১৬:০৭, ১৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকৃতির রক্ষক ইমরান, লোকালয় থেকে সাপ উদ্ধার করে ফেরান বনে

সাপ দেখলেই আতঙ্ক। আর সেই আতঙ্ক থেকেই অনেক সময় পিটিয়ে মেরে ফেলা হয় সাপ। তবে কাপ্তাইয়ের তরুণ ইমরান হোসেন ইমনের কাছে সাপ মানে আতঙ্ক নয়, বরং প্রকৃতির গুরুত্বপূর্ণ এক প্রাণী। লোকালয়ে ঢুকে পড়া বিষধর কিংবা নির্বিষ সাপ উদ্ধার করে নিরাপদে বনে ফিরিয়ে দেওয়াই এখন তার নেশা।

রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার চন্দ্রঘোনা এলাকার বাসিন্দা ইমরান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি যুক্ত হয়েছেন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে। বর্তমানে তিনি ‘WildLife and Snake Rescue Team in Bangladesh’-এর সক্রিয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন।

গত প্রায় তিন বছর ধরে কাপ্তাই ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সাপ উদ্ধার করে আসছেন ইমরান। দিন কিংবা রাত—যেকোনো সময় লোকালয়ে সাপ ঢোকার খবর পেলেই উদ্ধার সরঞ্জাম নিয়ে ছুটে যান তিনি। শুধু সাপ উদ্ধার করেই দায়িত্ব শেষ করেন না; আতঙ্কিত মানুষকে শান্ত করেন এবং সাপটিকে যাতে কেউ আঘাত না করে, সে বিষয়েও সচেতন করেন।

ছোটবেলায় সাপকে ভয় পাওয়ার পাশাপাশি কৌতূহলও ছিল ইমরানের। তবে সময়ের সঙ্গে সেই ভয়ই বদলে যায় ভালোবাসায়।

ইমরান হোসেন ইমন বলেন, ‘ছোটবেলায় সাপ নিয়ে আমার মনে ভয় আর কৌতূহল দুটোই কাজ করত। সাপের প্রতি ভালোলাগা ছিল, কারণ মনে হতো সাপ অনেক অবহেলিত প্রাণী। মানুষ সাপ দেখলেই মারতে চাইত। মূলত এই ধারণা থেকেই সাপ নিয়ে কাজ করার ইচ্ছে জাগে।’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর এক সিনিয়রের মাধ্যমে ‘WildLife and Snake Rescue Team in Bangladesh’ গ্রুপে যুক্ত হন ইমরান। সেখানে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর শুরু করেন নিয়মিত সাপ উদ্ধার।

তিন বছরের এই যাত্রায় বিভিন্ন প্রজাতির সাপ উদ্ধার করেছেন ইমরান। এর মধ্যে রয়েছে বিষধর শঙ্খিনী ও সবুজ বোড়া। নির্বিষ সাপের মধ্যে উদ্ধার করেছেন বার্মিজ অজগর, গোলবাহার অজগর, হেলে সাপ, দুধরাজ, দাঁড়াশ ও ঘরগিন্নি।

এমনকি বাংলাদেশের অপেক্ষাকৃত বিরল White-barred Kukri Snake বা পাকড়া উদয়কাল সাপও উদ্ধার করেছেন তিনি।

তার কাছে প্রতিটি উদ্ধার অভিযানই একেকটি অভিজ্ঞতা। কখনো বাড়ির উঠানে, কখনো ঘরের ভেতরে, আবার কখনো মানুষের চলাচলের জায়গায় পাওয়া যায় সাপ। আর প্রতিবারই চেষ্টা থাকে সাপটিকে নিরাপদে উদ্ধার করে তার প্রাকৃতিক আবাসস্থলে ফিরিয়ে দেওয়ার।

ইমরান মনে করেন, সাপকে রক্ষা করা মানে শুধু একটি প্রাণীকে বাঁচানো নয়; বরং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখা।

তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, সাপ পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইঁদুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রেখে ফসল রক্ষা করতে সাহায্য করে। তাছাড়া সাপের বিষ দিয়ে নানা ধরনের জীবনরক্ষাকারী ওষুধ বানানো হয়।’

তার মতে, মানুষের কারণে সাপের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস হওয়ায় অনেক সময় সাপ খাবার ও আশ্রয়ের সন্ধানে লোকালয়ে চলে আসে। তখন আতঙ্কিত হয়ে সাপটিকে মেরে ফেলা হয়।

ইমরানের আহ্বান—লোকালয়ে সাপ দেখা গেলে আতঙ্কিত না হয়ে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। সাপকে ধরতে বা মারতে না গিয়ে বন বিভাগ কিংবা প্রশিক্ষিত রেসকিউ টিমকে খবর দিতে হবে।

তার ভাষায়, ‘সাপ দেখলে না মেরে বন বিভাগ বা আমাদের মতো রেসকিউ টিমকে খবর দিতে হবে। এতে সাপ বাঁচে, মানুষও নিরাপদ থাকে। পরিবেশের ভারসাম্য ঠিক থাকে।’

ইমরানের এই উদ্যোগ ইতোমধ্যে কাপ্তাই ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রশংসা কুড়িয়েছে। প্রকৃতির প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে একজন তরুণের এমন উদ্যোগ শুধু সাপই নয়, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ নিয়েও মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।

তবে এমন কাজ ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে বিষধর সাপ উদ্ধারের ক্ষেত্রে প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা। তাই ইমরানের মতো তরুণদের আরও উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।