অপেক্ষার প্রহর
মো. দিদারুল আলম
সকালবেলা অলি বারান্দায় গিয়ে বৃষ্টিময় আকাশ দেখে তার মনে শিহরণ জাগে, মন আনন্দে নেচে উঠে। অতীতে স্বপ্ন দেখার দিনগুলো বর্তমান হওয়ায় তার মনে আনন্দে ভেসে বেড়ায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন যে তার পূরণ হলো। তবে সাথে আছে গ্রামে ফেলে আসা স্মৃতিগুলো—বন্ধুদের সাথে আড্ডা আর খুনসুঁটি।
যদিও এসব স্মৃতি মনে করে তার মন খারাপ হয়, তবুও রিমঝিম বৃষ্টিতে কলেজ জীবনের দিনগুলো তাকে কিছুটা আনন্দ দেয়।
অলি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগে ২য় বর্ষে পড়ে। লেখাপড়ায় মেধাবী, শান্ত প্রকৃতির ছেলে। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান, শহরে বড় ভাইয়ের বাসায় থেকে পড়ে। গ্রামের স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করে শহরে এসে কষ্ট করে লেখাপড়া করছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত ক্লাস করার পাশাপাশি কয়েকটি টিউশনি করে নিজের খরচ নিজেই চালায়। বড় ভাই খরচ দিতে চাইলেও সে নেয় না। ১ম বর্ষে সে ভালো ফলাফল করেছে। তবে অন্যান্য ছাত্রদের মতো ক্লাস শেষে আড্ডা দিতে পারে না—কারণ তাকে টিউশনে ছুটতে হয়।
১ম বর্ষের মাঝামাঝি সময়ে অলি একটি মেয়েকে খুব ভালো লাগতে শুরু করে। ভালো লাগাটা গভীর পর্যায়ে চলে যায়। কিন্তু এখনো সে বিষয়টি তাকে বলতে পারেনি। মেয়েটির নাম অর্ষা।
দেখতে আহামরি সুন্দর না হলেও তার শ্যামবর্ণের চেহারায় একধরনের মায়াবী সৌন্দর্য আছে। প্রথম দেখায় ভালো না লাগলেও দ্বিতীয় দেখায় প্রায় সবাই তাকে পছন্দ করবে। আর অলির পছন্দ হয় তৃতীয় দেখায়—সেই থেকে জন্ম নেয় গভীর মায়া ও ভালোবাসা।
তার ভালোলাগা বুঝতে পারে অর্ষাও। অর্ষাও তাকে পছন্দ করে। টুকটাক কথা হয়, কিন্তু কেউ কারো কাছে মনের কথা প্রকাশ করে না। এভাবে সময় চলতে থাকে।
এক শ্রাবণের রাতে অলি মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয়, আজই সে অর্ষাকে তার ভালোবাসার কথা বলবে কি না—এই দোলাচলে ভুগতে থাকে। যদি সে ফিরিয়ে দেয়? যদি অপমান করে?
অলি: “অর্ষা, তোমার সাথে আমার একটু কথা আছে। চল, জারুল তলায় গিয়ে একটু বসি। তোমার কি একটু সময় হবে?”
অর্ষা: “সময় হবে, তবে কী কথা বলবে?”
অলি: “চল, তারপর বলছি। কী বলব বুঝতে পারছি না। তোমাকে খুব ভালো লেগে গেছে। এক মুহূর্তও ভুলতে পারছি না। তুমি কি আমাকে ভালোবাসবে?”
অর্ষা এক মুহূর্তও দেরি না করে সোজাসাপ্টা ‘না’ বলে দেয়।
“আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি লেখাপড়ার জন্য, প্রেম-ভালোবাসার জন্য নয়। তুমি না হয়ে অন্য কেউ হলে আমি অপমান করতাম। তোমাকে তো ভালো ছেলে মনে করতাম।”
অলি: “দুঃখিত, আমার ভুল হয়ে গেছে।”
অর্ষার কাছে অপমানিত হয়ে অলি নিজেকে অপরাধী ভাবে। বাসায় কারো সাথে তেমন কথা বলে না, ক্যাম্পাসে যায় না।
পাঁচ দিন পর সে ক্লাসে ফিরলেও অর্ষার দিকে তাকায় না। অর্ষাও আগের মতো নয়। তারা আর কথা বলে না। তবে অলি এক মুহূর্তের জন্যও অর্ষাকে ভুলতে পারে না। সে পারতপক্ষে তার দিকে তাকায় না, কিন্তু মনজুড়ে থাকে কেবল অর্ষা।
অর্ষাও ভাবে, অলিকে সেদিন এত কটু কথা বলা ঠিক হয়নি। তার মনে হয়, ফিরিয়ে দেওয়া আরও নরমভাবে বলা যেত। এরপর থেকে তার মধ্যে অলির প্রতি এক ধরনের গভীর অনুভূতি জন্ম নেয়। সে ক্ষমা চাইতে চায়, কিন্তু সাহস পায় না।
অলি প্রতিজ্ঞা করে, সে আর কোনোদিন অর্ষার সামনে যাবে না, কথা বলবে না। তবুও সব জায়গায় সে কেবল অর্ষাকেই দেখতে পায়—স্বপ্নে, অক্ষরে, চিন্তায়।
এভাবে চলতে থাকে বিরহ-ভালোবাসার এক কঠিন দোলাচল।
দুজনেই চায় কাছাকাছি আসতে, কিন্তু একজন মান-অভিমানে দূরে থাকে, আরেকজন কষ্টের কথা বলার সাহস পায় না।
সময় গড়িয়ে যায়। প্রায় দেড় বছর কেটে যায়।
অর্ষা নিজেকে আর সামলাতে পারে না। বিরহে কাতর তার আনন্দময় জীবন বিষাদের সুরে ভরে ওঠে। খাবার-ঘুমে অস্থিরতা, চোখে অলি—সব সময়, সবখানে। এই অস্বাভাবিকতা তার ভাবির চোখ এড়ায় না।
ভাবি: “কী হয়েছে তোমার?”
অর্ষা: “না ভাবি, তেমন কিছু না।”
ভাবি: “কিছু একটা তো হয়েছে।”
অর্ষা: “ভাবি, ভুলতে পারছি না তার কথা।”
ভাবি: “অলির কথা?”
অর্ষা: “শয়নে-স্বপনে, হাঁটাচলায়, লেখাপড়ায়—সবসময় তার কথা মনে পড়ে। কী করব, বুঝতে পারছি না।”
ভাবি: “তাহলে তাড়াতাড়ি তার সাথে কথা বলো। দেরি করলে হবে না। যা করার তাড়াতাড়ি করো।”
ভাবির সঙ্গে কথা বলে অর্ষার কিছুটা সাহস আসে। সব সাহস এক করে একদিন সে অলির সঙ্গে কথা বলে।
অর্ষা: “অলি, আমি সেদিন তোমাকে যে কথা বলেছিলাম, তার জন্য দুঃখিত। আমি ভুল করেছি। আমি বুঝতে পারি নাই তখন… আজ বুঝি, আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
অলি নিজেকে সামলাতে পারে না।
“ঠিক দু’বছর আগে আমি তোমাকে প্রস্তাব দিয়েছিলাম। এই দু’বছর আমি অনেক কষ্ট পেয়েছি। তোমাকে এক মুহূর্তও ভুলতে পারি নাই।”
অর্ষা: “তাহলে দেরি কেন?”
অলি: “তোমাকে আরও দেরি করতে হবে।”
অর্ষা: “মানে?”
অলি: “আমি জানতাম তুমি আমায় ভালোবাসো। তাই সাহস করে প্রস্তাব দিয়েছিলাম। কিন্তু আমি যে কষ্ট পেয়েছি, তাও কম নয়। আমি এখনো তোমাকে ভালোবাসি। কাছে পেতে চাই, কিন্তু তার আগে তোমাকে আমার সেই অপেক্ষার অনুভূতিটা বুঝতে হবে।”
অর্ষা: “আমি সবকিছুর জন্য তোমার কাছে ক্ষমা চাই। আমাকে ক্ষমা করে কাছে টেনে নাও।”
অলি: “আমি সত্যিই তোমাকে ভালোবাসি। তবে এবার তোমার অপেক্ষার প্রহর শুরু হোক… দু’বছর।
মো. দিদারুল আলম
(কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষক)
সাহিত্য-সংস্কৃতি সব খবর















