Cvoice24.com

ফুলকির শিশু-কিশোরদের দারুণ পরিবেশনা
রবীন্দ্রনাথের ‘তাসের দেশ’, নতুন ধরন দেখলো চট্টগ্রাম

লিখেছেন : অনুপম শীল
২১:৩৫, ১০ আগস্ট ২০২৫
রবীন্দ্রনাথের ‘তাসের দেশ’, নতুন ধরন দেখলো চট্টগ্রাম

রবীন্দ্রনাথের 'তাসের দেশ'। চরিত্র, দৃশ্য আর গানের সমন্বয়ে এই নৃত্যনাট্য বহুল আলোচিত এবং প্রদর্শিত। জড়তা বা স্থবিরতা কিংবা সংস্কারের জাল ছিন্ন করে প্রাণের উচ্ছ্বাসের জয়গানই এই নৃত্যনাট্যের অন্ত:নির্হিত ভাব। মুক্তির প্রত্যাশায় থাকা মানুষকে নানা নিয়ম, শাস্ত্র, সংস্কারে আবদ্ধ করে প্রাণশক্তিকে স্থবির করে রাখার বিপরীতে মানবিক আবেগের শক্তির জয়গানই এই নৃত্যনাট্যে গেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। 

কবি এখানে সাংকেতিক বিন্যাসে এঁকেছেন ভয় আর জড়তাকে। আবার রূপকের আনন্দে ডিঙ্গিয়েছেন অন্ধ বিশ্বাস আর কুসংস্কারের জাল। বুঝিয়েছেন এই জীবন গতিশীল, এই জীবন সৃষ্টির আনন্দে চলতে ভালোবাসে। প্রাণের ভেতর প্রাণ সঞ্চার করে কবি জড়তার বিরুদ্ধে মুক্তির বারতা নিয়ে হাজির হয়েছেন। 

শুরুতেই জানিয়েছি, এই নৃত্যনাট্য বহুল প্রদর্শিত। একে ঘিরে নানা নিরীক্ষা, গবেষণা হয়েছে; চলছে। রবীন্দ্রনাথের বিশাল পৃথিবীতে সৃষ্টিশীল মানুষের এমন অবগাহন স্বাভাবিকই বটে। বাঙালি তাঁর অন্যতম মানুষটিকে অসংখ্যবার নিজের মতো করে ভেবেছে৷ মানুষটির সৃষ্টিকে নিজের মতো করে সাজিয়েছে। তাঁকে নিয়ে আলোচনা করেছে, তর্কও করেছে। বাঙালির এই কর্মকাণ্ড আরও বিস্তর সময় ধরে চলতে থাকবে। কারণ রবীন্দ্রনাথ এতোটাই নৈর্ব্যক্তিক যে, তাঁকে চির নূতনের সাজে বার বার সাজিয়েছে বাঙালি; ভবিষ্যতেও সাজাবে।

বহু সৃজনশীল মানুষের দ্বারা অসংখ্য দৃশ্যের অবতারণা যে 'তাসের দেশ' নৃত্যনাট্য নিয়ে হয়েছে, সেটির আরও একটি  নতুন ধরন দেখলো চট্টগ্রাম। গত শুক্র ও শনিবার চট্টগ্রামের থিয়েটার ইনিস্টিউট প্রাঙ্গণে এই নৃত্যনাট্য পরিবেশন করেছে 'ফুলকি'। ফুলকির এই পরিবেশনের পুরোটা জুড়েই ছিল শিশু-কিশোররা। আর এখানেই নতুনত্ব পেয়েছে 'তাসের দেশ'। 

মঞ্চে একই সাথে নৃত্য, কথা ও গানের সঙ্গত পুরো নৃত্যনাট্যটিকে নিয়ে নতুন করে ভাবনার রসদ জুগিয়েছে। শিশুদের কন্ঠ আর অভিনয়ে নিজেদের ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা, বার বার ভেঙ্গে নতুন করে তৈরির অধ্যবসায় দর্শকদের কাছে আলাদা চিন্তার উদ্রেক করেছে। পরিবেশনাটির ধরনে স্পষ্ট হয়েছে এসব শিশু-কিশোর কঠোর শ্রমেই নিজেদের তৈরি করেছে মঞ্চের জন্য। দর্শকের চোখে মাঝে মাঝেই চমকে উঠেছে। রাজা চরিত্রের নাট্যাংশে শারদ প্রত্যুষ বলের সংলাপের দৃঢতা, দহলানী চরিত্রে সুহিতা দে'র নাটকীয়তা, রাজপুত্রের কণ্ঠাভিনয়ে অর্জন চক্রবর্তীর সাবলীলতা অবশ্যই প্রণিধানযোগ্য।  সহশিল্পীকে সাথে নিয়ে মঞ্চে নিমগ্ন থাকার উদাহরণ প্রশংসনীয়। সঙ্গীতাংশে শুভার্থী ঋতবান পুরো সময় নিজেকেই ছাপিয়ে গেছেন। আয়মান তাহনিফ ভুঁইয়া, অগ্নিমিত্রা আচার্য্য, দেবপ্রিয়া চক্রবর্তীর স্বর ও সুর নিশ্চয়ই দীর্ঘ সময় ধরে আলাদা করে কানে বেজে চলবে দর্শকদের। সঙ্গীত পরিচালক সোমা রায় এক্ষেত্রে শিশু-কিশোরদের নিয়ে এক সাহসী নিরীক্ষা চালিয়েছেন। মঞ্চের বাইরে তাঁকে কতো লম্বা সময় ধরে এসব কুশীলবকে নিয়ে কাটাতে হয়েছে, সেটা আমরা দর্শকরা বুঝিনি। তবে সেটা দীর্ঘ সময় আর কঠোর শ্রমসাধ্য ছিল; সেটা অনুমেয়। 

নৃত্যনাট্যটি নির্দেশনা দিয়েছেন স্বনামে খ্যাত শিল্পী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ওয়ার্দা রিহাব। তাঁর চোখে চোখ রেখে নৃত্যাভিনয়ে অংশগ্রহণকারী শিল্পীরা শিখেছেন। ফুলকির শিশুরা এতো বড় একজন শিল্পীর কাছে এই আত্নস্থ প্রক্রিয়ায় নিজেদের মানিয়ে নিয়েছেন। তাঁর প্রজ্ঞা ও ধীশক্তিকে বোঝার চেষ্টা করেছেন। এটাও অনেক বড় একটা ব্যাপারই মনে হয়েছে। পাশাপাশি নিজেদের শিখন প্রক্রিয়ায় নন্দিত একজন শিল্পীর পাঠ যুক্ত হয়েছে। তাতে নবীণ শিল্পীরা অবশ্যই ঋদ্ধ হয়েছেন। রাজপুত্রের নৃত্যাভিনয়ে দীপা সিংহ, সওদাগর চরিত্রে দেবলীনা দাশ অনেক সময় জুড়ে দারুণ সক্ষমতার জানান দিয়েছেন। পাশাপাশি ইস্কাবনি চরিত্রে প্রিয়ন্তী দেবনাথ ও সেমন্তি শ্রেষ্ঠা, গোলাম চরিত্রে দীপ্র ওঙ্কার এবং রাজার চরিত্রে মুহ্তাসীম ইসলাম ধন্য মঞ্চে সাবলীল থেকে নজর কেড়েছেন। 

নৃত্যনাট্যে আবহ সঙ্গীত সমন্বয় করেছেন সত্যজিৎ ঘোষ। নাট্যাংশ পরিচালনায় ছিলেন সঞ্জয় ধর, আলোক সঞ্চার করেছেন মুবিদুর রহমান সুজাত। তাঁদের সাহচর্য দারুণ মুগ্ধতা যোগ করেছে পরিবেশনায়। তবে সেটে কুশীলবদের উপস্থাপন প্রক্রিয়ায় কিছুটা অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। বিশেষ করে পুরোটা সময় যেসব কুশীলব অত্যন্ত সুনিপুণ দক্ষতায় সঙ্গীত সঙ্গত করেছেন তাঁদের দেখা পাননি দর্শকেরা। হয়তো মঞ্চে জায়গা সংকুলানের একটা ব্যাপার ছিল। তবে শেষদিকে তাঁদের সামনে ডেকে আনার মুন্সিয়ানা সঞ্চালক দেখালে ভালো লাগতো। যেহেতু নিয়ম ভেঙ্গে প্রাণের উদ্ধোধনই এই নৃত্যনাট্যের মূল অনুরণন, তাই শেষদিকে গাম্ভীর্য্যের আগল ভেঙ্গে সঙ্গত শিল্পীদের অল্প সময়ের জন্য দর্শকদের সামনে আনাই যেতো। 

যাই হোক নিত্য ভারাক্রান্ত এই জীবনে হুট করে ফুলকির শিশু-কিশোররা দারুণ আলো ফুটিয়ে একটি সন্ধ্যা আমাদের জন্য রাঙিয়ে দিয়েছেন। এই অপার আনন্দ সাথে করে আমরা তাঁদের কাছে আরেকটি দারুণ পরিবেশনার আবদার করতেই পারি…!

# অনুপম শীল, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী।