Cvoice24.com

সীতাকুণ্ডে স্কুলে ‘ইয়াবা সেবন’ গুজব, আসলে যা ঘটেছিল

সীতাকুণ্ড প্রতিনিধি, সিভয়েস২৪
১৫:১৭, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সীতাকুণ্ডে স্কুলে ‘ইয়াবা সেবন’ গুজব, আসলে যা ঘটেছিল

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জাফরনগর অর্পণা চরণ উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির কয়েকজন ছাত্রী ইয়াবা সেবন করে অসুস্থ হয়ে পড়েছে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন খবরের সত্যতা পাওয়া যায়নি। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুসন্ধানে ইয়াবা সেবনের কোনো প্রমাণ মেলেনি। তবে অনুসন্ধানে ছয় ছাত্রীর ঘুমের ওষুধ সেবনের তথ্য পাওয়া গেছে।

বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের লিখিত বিবৃতি ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ২ সেপ্টেম্বর সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। বিষয়টি শিক্ষকের নজরে এলে তাকে প্রধান শিক্ষকের কার্যালয়ে নেওয়া হয়। সেখানে জিজ্ঞাসাবাদে ওই শিক্ষার্থী ঘুমের ওষুধ ‘সেডিল’ সেবনের কথা জানায়। পরে তার কাছ থেকে ওই ওষুধের পাতা উদ্ধার করা হয়।

পরে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুসন্ধানে আরও কয়েকজন ছাত্রীর ঘুমের ওষুধ সংগ্রহ ও সেবনের তথ্য পাওয়া যায়। মোট ছয়জন ছাত্রী এ ঘটনায় জড়িত বলে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের অভিভাবকদের বিদ্যালয়ে ডেকে বিষয়টি জানানো হয় এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়।

বিদ্যালয়ের গণিত শিক্ষক জাহেদ হোসেন বলেন, অনুসন্ধানে মোট ছয়জন ছাত্রীর ঘুমের ওষুধ সংগ্রহ ও সেবনের তথ্য পাওয়া গেছে। বিষয়টি তাদের অভিভাবকদের জানানো হয়েছে। পরে অভিভাবকদের বিদ্যালয়ে ডেকে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়।

প্রধান শিক্ষক শ্যামল কুমার নাথ বলেন, ‘এক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে সেডিল নামের ঘুমের ওষুধ উদ্ধার করা হয়েছে। ইয়াবা সেবনের যে খবর ছড়িয়েছে, সেটি সম্পূর্ণ অসত্য ও অপ্রমাণিত। বিষয়টি ঘুমের ওষুধ সেবনসংক্রান্ত।’

তিনি আরও বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলাবিধি অনুযায়ী সাময়িকভাবে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে বিদ্যালয়ের নিয়ম-শৃঙ্খলা ভঙ্গ বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে কোনো শিক্ষার্থী জড়িত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মো. নাসির উদ্দিন বলেন, ‘রবিবার শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠকে ইয়াবা সেবনের কোনো তথ্য আমাকে জানানো হয়নি। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি দেখে প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলি। তখন জানতে পারি, ঘটনাটি মূলত ঘুমের ওষুধ সেবনকে কেন্দ্র করে।’

তিনি বলেন, ‘তথ্য যাচাই না করে এ ধরনের স্পর্শকাতর খবর ছড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। এতে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পাশাপাশি তাদের পরিবারের সামাজিক মর্যাদাও ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে।’

সংশ্লিষ্ট এক ছাত্রীর মা বলেন, ‘তার মেয়ে কয়েকজন সহপাঠীর প্ররোচনায় ভুল করে ঘুমের ওষুধ খেয়েছে। পরে নিজের ভুল বুঝতে পেরে সে অনুতপ্ত। দিনভর না খেয়ে কান্নাকাটি করছে।’ 

তিনি আরোও বলেন, ‘আমি মেয়েকে নিয়ে আতঙ্কিত। এই অপরাধবোধ থেকে সে কোনো দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে কি না, সেই ভয় হচ্ছে। ভুল কিছু লিখে আমার মেয়ের জীবনটা ধ্বংস করে দেবেন না।’

ওই শিক্ষার্থীও জানায়, সে ওষুধগুলো ঘুমের ওষুধ বলে জানত না। একজন সহপাঠীর পরামর্শে না জেনে পাঁচটি ওষুধ খেয়েছিল। ভবিষ্যতে এমন কাজ আর করবে না বলেও জানায় সে।

বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী জানায়, শিক্ষকদের জিজ্ঞাসাবাদের পর এক শিক্ষার্থীর পোশাকের ভেতর থেকে ওষুধ উদ্ধার করা হয়। পরে ঘটনায় জড়িত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে সাময়িক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

বিদ্যালয়ের লিখিত বিবৃতিতেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘সাতজন শিক্ষার্থী মাদকাসক্ত’—এমন তথ্যকে সঠিক নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, যাচাইহীন ওই তথ্যের কারণে ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে।

তবে ইয়াবা সেবনের অভিযোগের সত্যতা না মিললেও শিক্ষার্থীদের কাছে ঘুমের ওষুধ কীভাবে পৌঁছাল এবং তারা কেন তা সেবন করল—এ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যালয়ের নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি অভিভাবকদেরও আরও সচেতন হওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।