দুর্গামণ্ডপে দেবীবন্দনার আবহে বাবার ত্যাগ, ভালোবাসা ও অভিমানের গল্প
কাপ্তাই-রাঙ্গুনিয়া প্রতিনিধি, সিভয়েস২৪
বাবা- ছোট্ট একটি শব্দ, অথচ তার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে একটি পরিবারের হাজারো স্বপ্ন, নির্ঘুম রাত, নীরব কান্না আর সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর অসংখ্য গল্প। সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে গিয়ে যিনি নিজের ইচ্ছেগুলোকে আড়াল করেন, পরিবারের নিশ্চিন্ত জীবনের জন্য যিনি নিরন্তর সংগ্রাম করেন, সেই বাবার ভালোবাসা অনেক সময় প্রকাশের ভাষা খুঁজে পায় না। কখনো শাসনের আড়ালে, কখনো কঠোর মুখের অন্তরালে, আবার কখনো নিঃশব্দ আত্মত্যাগে মিশে থাকে তার গভীর মমতা।
এবার সেই না-বলা ভালোবাসা, জমে থাকা অভিমান আর কৃতজ্ঞতার অনুভূতিগুলোকে সামনে আনার ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার দক্ষিণ সাবেক রাঙ্গুনিয়ার সামাজিক সংগঠন ‘মা ভবানী একতা সংঘ’। শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দ ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার সঙ্গে পারিবারিক বন্ধন এবং মানবিক মূল্যবোধের বার্তা ছড়িয়ে দিতে সংগঠনটি এবারের আয়োজন সাজিয়েছে ‘শ্রীচরণেষু—বাবা’ প্রতিপাদ্যে।
ঐতিহ্যের ষষ্ঠ বর্ষে পদার্পণ উপলক্ষে নেওয়া এই উদ্যোগে পূজামণ্ডপ হয়ে উঠছে বাবাকে ঘিরে স্মৃতি, অনুভূতি ও না-বলা কথার এক আবেগঘন পরিসর। এখানে দেবী আরাধনার পাশাপাশি গুরুত্ব পাবে সেই মানুষটির প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের সুযোগ, যার ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে অনেক সন্তানের জীবনের ভিত্তি তৈরি হয়।
নীরব বাবার অজানা গল্প
সন্তানের কাছে বাবা কখনো নির্ভরতার ছায়া, কখনো সাহসের উৎস, আবার কখনো জীবনের কঠিন বাস্তবতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি। নিজের অভাবকে আড়াল করে সন্তানের চাহিদা পূরণ করা, ক্লান্ত শরীর নিয়েও পরিবারের দায়িত্ব পালন করা কিংবা সন্তানের স্বপ্ন পূরণে নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দেওয়া—বাবার জীবনের এমন অসংখ্য অধ্যায় পরিবারের কাছের মানুষদেরও অনেক সময় অজানা থেকে যায়।
বাবার ভালোবাসা সব সময় মুখের ভাষায় প্রকাশিত হয় না। কখনো তা শাসনে, কখনো উদ্বেগে, কখনো নীরবে পাশে দাঁড়ানোয়, আবার কখনো নিজের কষ্ট গোপন করে সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টায় প্রকাশ পায়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক সন্তান বাবার এই নীরব আত্মত্যাগের গভীরতা বুঝতে শেখে। কিন্তু তত দিনে মনের অনেক কথা বলা হয়ে ওঠে না।
‘শ্রীচরণেষু—বাবা’ আয়োজনের মধ্য দিয়ে সেই অপ্রকাশিত অনুভূতিগুলোকে ভাষা দেওয়ারই চেষ্টা করছে ‘মা ভবানী একতা সংঘ’। আয়োজকদের ভাবনায়, কিছু গল্প মুখে বলা যায় না, কিছু অনুভূতি শুধু হৃদয় দিয়েই অনুভব করতে হয়। সেই অনুভূতিগুলোকে লেখার মাধ্যমে প্রকাশের সুযোগ করে দেওয়াই এই আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
‘খোলা চিঠি’—বাবাকে বলা না-হওয়া কথার ঠিকানা
আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ ‘খোলা চিঠি’। পূজামণ্ডপে আসা দর্শনার্থীরা তাদের বাবাকে নিয়ে মনের ভেতর জমে থাকা অনুভূতিগুলো চিঠির মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারবেন। শৈশবে বাবার হাত ধরে হাঁটার স্মৃতি, স্কুলে যাওয়ার প্রথম দিনের কথা, বাবার শাসনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা স্নেহ, পরিবারের জন্য তার নিরলস সংগ্রাম কিংবা জীবনের কোনো বিশেষ মুহূর্তে বাবার পাশে থাকার স্মৃতি—সবই উঠে আসতে পারে এসব চিঠিতে।
কেউ হয়তো লিখবেন, ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে পথ চলার কথা। কেউ স্মরণ করবেন, নিজের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে বাবা কীভাবে তার সাধ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়েছেন। কেউ হয়তো প্রকাশ করবেন দীর্ঘদিনের জমে থাকা অভিমান। আবার কারও চিঠিতে থাকবে বাবার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা, ভালোবাসা কিংবা হারিয়ে যাওয়া কোনো স্মৃতির বিষণ্নতা।
যারা কখনো বাবাকে সরাসরি বলতে পারেননি, ‘তোমাকে অনেক ভালোবাসি’, তাদের জন্যও এই আয়োজন হতে পারে মনের কথা জানানোর একটি উপলক্ষ। আর যাদের বাবা আজ আর পাশে নেই, তাদের কাছে বাবাকে ঘিরে স্মৃতিচারণ হতে পারে ভালোবাসার মানুষটিকে নতুন করে অনুভব করার এক আবেগময় অভিজ্ঞতা।
দর্শনার্থীরা তাদের লেখা চিঠি নাম ও মোবাইল নম্বরসহ মণ্ডপে রাখা নির্ধারিত বক্সে জমা দিতে পারবেন। এভাবেই পূজামণ্ডপের এক কোণে তৈরি হবে অসংখ্য ব্যক্তিগত স্মৃতি, ভালোবাসা, অভিমান ও কৃতজ্ঞতার সম্মিলিত আখ্যান।
বিজয়া দশমীতে পুরস্কার, সেরা চিঠি প্রকাশ পাবে পত্রিকায়
আয়োজনকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে জমা পড়া চিঠিগুলোর মধ্য থেকে বিজয়া দশমীর দিন লটারির মাধ্যমে তিনজনকে বিজয়ী নির্বাচন করে পুরস্কৃত করা হবে। পাশাপাশি সেরা চিঠিটি লেখকের নাম ও ছবিসহ প্রকাশ করা হবে ‘পাক্ষিক চলমান রাঙ্গুনিয়া’র অনলাইন ও মুদ্রিত সংস্করণে।
এর ফলে ব্যক্তিগত অনুভূতির পরিসর ছাড়িয়ে বাবাকে নিয়ে লেখা একটি চিঠি হয়ে উঠতে পারে বৃহত্তর সমাজের আবেগ ও উপলব্ধির অংশ। একজন সন্তানের স্মৃতির ভেতর দিয়ে অন্য কোনো সন্তানও হয়তো নতুন করে উপলব্ধি করবেন নিজের বাবার ত্যাগ, ভালোবাসা ও অবদানের কথা।
উৎসবের আনন্দে পরিবারকে নতুন করে আবিষ্কার
শারদীয় দুর্গোৎসব বাঙালির জীবনে আনন্দ, সম্প্রীতি ও মিলনের এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। এই উৎসবের আবহে বাবাকে কেন্দ্র করে এমন উদ্যোগ ধর্মীয় আয়োজনের পাশাপাশি পারিবারিক সম্পর্কের গুরুত্বও স্মরণ করিয়ে দেয়। কারণ, উৎসবের প্রকৃত আনন্দ কেবল আলোকসজ্জা, প্রতিমা দর্শন কিংবা আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ নয়; প্রিয়জনের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ, সম্পর্কের দূরত্ব কমানো এবং একে অপরের অনুভূতিকে উপলব্ধি করার মধ্যেও উৎসবের গভীর তাৎপর্য নিহিত।
‘শ্রীচরণেষু—বাবা’ তাই কেবল একটি পূজার প্রতিপাদ্য নয়; এটি হতে পারে সন্তানের হৃদয়ে জমে থাকা কথাগুলো বাবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি উপলক্ষ। যে বাবা সারাজীবন সন্তানের মুখে হাসি দেখতে চেয়েছেন, তার মুখেও হয়তো সন্তানের লেখা একটি চিঠি এনে দেবে অন্য রকম আনন্দ, আবেগ কিংবা নীরব অশ্রু।
দক্ষিণ সাবেক রাঙ্গুনিয়ার ‘মা ভবানী একতা সংঘ’র এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে তাই উঠে আসছে এক সহজ অথচ গভীর মানবিক বার্তা—ভালোবাসার মানুষটিকে ভালোবাসার কথা জানাতে খুব বেশি আয়োজনের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন শুধু মনের কথাগুলো বলার সাহস।
হয়তো একটি চিঠিই বদলে দিতে পারে বাবা-সন্তানের বহুদিনের নীরবতা। হয়তো কয়েকটি বাক্যই ফিরিয়ে আনতে পারে হারিয়ে যাওয়া ঘনিষ্ঠতা। আর সেই চিঠির শুরুতে যদি লেখা থাকে ‘শ্রীচরণেষু—বাবা’, তবে তার প্রতিটি শব্দ হয়ে উঠতে পারে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার এক অনন্য দলিল।
চট্টগ্রাম (মহানগর, উত্তর, দক্ষিণ) সব খবর













