Cvoice24.com

টুপটুপ রিসোর্টে আগুন: ঘটনাস্থলে তদন্ত কমিটি, নিখোঁজ আরও একজন

কক্সবাজার প্রতিনিধি
১৭:২৩, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
টুপটুপ রিসোর্টে আগুন: ঘটনাস্থলে তদন্ত কমিটি, নিখোঁজ আরও একজন

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রেস্ট্রো অ্যান্ড রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। রোববার সকালে কমিটির সদস্যরা পুড়ে যাওয়া স্থাপনা ঘুরে দেখেন এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলেন। রিসোর্টটির নির্মাণে অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর তদারকি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে কমিটি।

এদিকে অগ্নিকাণ্ডে উদ্ধার হওয়া ১০টি মরদেহের পরিচয় শনাক্তের কাজ চলছে। স্বজনদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও একজন নিখোঁজ থাকতে পারেন বলে ধারণা করছে ফায়ার সার্ভিস। তাঁর সন্ধানে রোববার সকাল থেকে ধ্বংসস্তূপে নতুন করে তল্লাশি শুরু হয়েছে। মরদেহগুলো পুড়ে বিকৃত হয়ে যাওয়ায় ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া পরিচয় নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহানের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটির সদস্যরা রোববার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধান ও রিসোর্টটির নিরাপত্তাব্যবস্থা যাচাই করতে কমিটিকে পাঁচ দিন সময় দেওয়া হয়েছে।

ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া পরিচয় নিশ্চিত নয়

ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা ১০টি মরদেহ উদ্ধার করেছি। এর মধ্যে অনেকের নিকটাত্মীয় আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তাঁদের নাম-ঠিকানাসহ বিস্তারিত তথ্য পেয়েছি। তবে মরদেহগুলো যে অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে, তাতে ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না, কোন মরদেহ কার।”

তিনি বলেন, “আরও একজনের বিষয়ে তথ্য পেয়েছি। তবে দুর্ঘটনার সময় তিনি এখানে ছিলেন, নাকি বাইরে ছিলেন, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারিনি।”

তাসনীম জাহান জানান, ওই ব্যক্তির অবস্থান নিশ্চিত করতে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) ও তদন্তকারী দল কাজ করছে। মোবাইল ফোন নম্বরের মাধ্যমে তাঁকে শনাক্ত করা বা তাঁর অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায় কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।

তদন্ত কমিটির সদস্যরা রিসোর্টটির নির্মাণে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনুমোদন ছিল কি না এবং অগ্নিনিরাপত্তাসহ অন্যান্য নিরাপত্তাব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের সঙ্গে রিসোর্টসংক্রান্ত নথিপত্র ও অন্যান্য তথ্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।

কমিটিতে বিভিন্ন দপ্তরের প্রতিনিধিরা রয়েছেন। তাঁরা নিজ নিজ ক্ষেত্র থেকে কারিগরি বিষয়গুলো মূল্যায়ন করবেন। পাশাপাশি বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন, তদারকি ও সমন্বয়ের বিষয়ও তদন্তের আওতায় রয়েছে।

অনুমোদনহীন স্থাপনা নিয়ে কউকের বক্তব্য

কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) অথরাইজড অফিসার ফজলে রাব্বি ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের বলেন, “অনেক জায়গায় দেখবেন, তাদের ব্যবসা করার পারমিশনই নাই, তারপরও তারা এখানে ব্যবসা করছে। এটা অপরাধ।”

তিনি বলেন, “২০২৩ ও ২০২৪ সালে তাদের স্থাপনাগুলো অপসারণের নির্দেশ দিয়েছি। এতবার বলার পরও যখন কেউ তা মানে না, তখন সমস্যা তৈরি হয়। এখানে যে অবস্থায় স্থাপনাটি রয়েছে, তা কোনোভাবেই কোনো স্ট্যান্ডার্ড স্ট্রাকচার নয়।”

ফজলে রাব্বির বক্তব্য অনুযায়ী, অনুমোদনহীন স্থাপনা ও নির্দেশনা অমান্য করে ব্যবসা পরিচালনার বিষয়ে আগে থেকেই ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করেছে কউক। তদন্তে রিসোর্টটির অনুমোদন ও নির্মাণসংক্রান্ত বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ফায়ার সার্ভিসের কক্সবাজারের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসেন বলেন, রিসোর্ট নির্মাণে ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন নেওয়া হয়নি। সেখানে অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থাও ছিল না। সমুদ্রের তীব্র বাতাসে কাঠের স্থাপনাটিতে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে।

ফায়ার সার্ভিসের তথ্যমতে, অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা না থাকায় চার মাস আগে রিসোর্টটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল।

ধ্বংসস্তূপে আরও একজনের সন্ধানে তল্লাশি

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ আজাদ আনোয়ার বলেন, “হিসাব অনুযায়ী এখনও একজন ব্যক্তি নিখোঁজ রয়েছেন। গতকাল (শনিবার) অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে ধ্বংসস্তূপের সব জায়গায় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খোঁজা সম্ভব হয়নি।”

তিনি জানান, শনিবার অগ্নিকাণ্ডের পর ১০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে স্বজনদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ১১ জন নিখোঁজ থাকার বিষয়টি সামনে আসে। রিসোর্টটির ওপরের তলাগুলো কাঠের তৈরি হওয়ায় সেগুলো ভেঙে নিচে পড়েছে। ফলে নিচতলায় কেউ চাপা পড়ে থাকতে পারেন। এ কারণে নতুন করে তল্লাশি চালানো হচ্ছে।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মরদেহগুলো পুড়ে বিকৃত হয়ে যাওয়ায় ফরেনসিক পরীক্ষা ছাড়া সেগুলো ঠিক ১০ জনের, নাকি এর চেয়ে বেশি মানুষের, তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

হিমঘরে ১০ মরদেহ, স্বজনদের অপেক্ষা

অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ পর্যটকের মরদেহ কক্সবাজার সদর হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে। স্বজনেরা মরদেহ নিতে হাসপাতালে ভিড় করলেও পরিচয় নিশ্চিত না হওয়ায় সেগুলো হস্তান্তর করা হচ্ছে না। পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) সুবক্তগীন মাহমুদ সোহেল জানান, নিহত ১০ জনের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তবে কোন মরদেহ কার, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বাকি চারজনের পরিচয়ও শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, “মরদেহগুলো পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।”

নিখোঁজ ব্যক্তিদের একজন ঢাকার বাসিন্দা নাসরিন আক্তার। দুই বান্ধবীর সঙ্গে রিসোর্টটিতে উঠেছিলেন তিনি। তাঁর স্বামী দেওয়ান ফয়সাল কক্সবাজারে এসে রিসোর্ট ও হাসপাতালে খোঁজ নিয়েও স্ত্রীর সন্ধান পাননি।

২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার ম্যানেজার

টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে একই পরিবারের ছয়জনসহ ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। উখিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আশীষ সূত্রধর বাদী হয়ে মামলাটি করেন।

এ ঘটনায় রিসোর্টের ম্যানেজার জাহিদ হোসেন সুমনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে রিসোর্টের মালিক তানভীর আহমদ ও অংশীদার নিয়াজ মোরশেদসহ অন্য আসামিরা পলাতক রয়েছেন। রিসোর্টের মালিক মো. তানভিরের অবস্থান জানা যায়নি বলে আগের তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ছয়জন দগ্ধ হন। তাঁদের মধ্যে চারজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।

এর আগে শনিবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে উখিয়ার ইনানী মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকায় অবস্থিত টুপটুপ রেস্ট্রো অ্যান্ড রিসোর্টে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট সকাল ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

জেলা প্রশাসক জানান, অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, রিসোর্টটি অবৈধভাবে নির্মিত হয়েছিল এবং তা অপসারণে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল।