নিহত ১০ জনের মধ্যে একই পরিবারের ছয়জন
ইনানীর রিসোর্টে আগুনে প্রাণহানি, তদন্ত কমিটি গঠন
শহিদুল ইসলাম, কক্সবাজার প্রতিনিধি, সিভয়েস২৪
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানী বিচসংলগ্ন পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রেস্তোরাঁ অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ১০ পর্যটক নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের ছয়জন রয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীও। এ ঘটনায় আহত ছয়জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাদের মধ্যে দুজনকে প্রাথমিক চিকিৎসার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বাকি চারজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল ৭টার দিকে মেরিন ড্রাইভ-সংলগ্ন পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকায় কাঠের তৈরি তিনতলা রিসোর্টটিতে আগুন লাগে।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা ১০ জনের মরদেহ উদ্ধারের তথ্য নিশ্চিত করেছেন। প্রথমে ছয়টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে রিসোর্টের শৌচাগার থেকে আরও চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সর্বশেষ উদ্ধার করা চারজনের মধ্যে একজন পুরুষ, দুজন নারী ও একটি শিশু রয়েছে। তাদের পরিচয় এখনো শনাক্ত করা যায়নি।
ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, সকাল ৭টা ২৫ মিনিটে আগুন লাগার খবর পেয়ে উখিয়া ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের কর্মীরা সকাল ৮টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছান। ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় সকাল ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এরপর রিসোর্টে উদ্ধার অভিযান জোরদার করা হয়। সেখানে আর কেউ আটকা পড়েছেন কি না, তা জানতে তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, প্রাথমিকভাবে রিসোর্টের রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি আগুন লাগার কারণ, প্রাণহানির পরিস্থিতি এবং রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা খতিয়ে দেখবে।
নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের ছয়জন
পরিচয় শনাক্ত হওয়া নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), মেলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), লায়লা জাহান নাবিলা (২৭), নাফিজ তেহামী জেরিফ (২৭), চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) এবং পাঁচ বছর বয়সী ফায়িজান আহম্মেদ।
নিহতদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী নাফিজ তেহামী এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী লায়লা জাহান নাবিলাও রয়েছেন। ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মেলিতা মেহেজাবিন আলভীও অগ্নিকাণ্ডে মারা গেছেন।
পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নাফিজ তেহামী, নাবিলা, মালিহা ও আলভী পরস্পরের কাজিন। ফারিহা কবির ছিলেন নাফিজের বড় বোন এবং শিশু ফায়িজান তার ভাগ্নে। তাদের পরিবারের নয়জন সদস্য বেড়াতে গিয়ে ওই রিসোর্টে উঠেছিলেন। তাদের মধ্যে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহ-সভাপতি সাদিক কায়েম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে নাফিজ তেহামীসহ একই পরিবারের ছয়জনের মৃত্যুর তথ্য জানান। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও এক বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষার্থী লায়লা জাহান নাবিলার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে শোক প্রকাশ করেছে।
আহত চারজন হাসপাতালে
অগ্নিকাণ্ডে আহত ছয়জনকে উদ্ধার করে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। তাদের মধ্যে রয়েছেন মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তার স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা সবুক্তগীন মাহমুদ সোহেল জানান, আহতদের মধ্যে পাঁচজনের শরীরের প্রায় ৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। তাদের হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। অন্য একজন পড়ে গিয়ে আহত হয়েছিলেন। তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আহত ছয়জনের মধ্যে দুজনকে প্রাথমিক চিকিৎসার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বাকি চারজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন
রিসোর্টটির ইনচার্জ মো. সুমন ইসলাম জানান, আগুন লাগার পরপরই তা নেভানোর চেষ্টা করা হয়। তবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) ও সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হলে আগুন দ্রুত পুরো স্থাপনায় ছড়িয়ে পড়ে বলে তাদের ধারণা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের কয়েকজনের দাবি, রান্নাঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় কয়েকজন পর্যটক দরজা-জানালা ভেঙে বেরিয়ে আসেন। কেউ কেউ ভবন থেকে লাফ দিয়েও প্রাণে বাঁচার চেষ্টা করেন। স্থানীয় এক বাসিন্দা রিসোর্টটিতে আগুন নেভানোর প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখার দাবি জানিয়েছেন।
ফায়ার সার্ভিসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দোলন আচার্য জানান, নতুন এই রিসোর্টটির জন্য ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন ছিল না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অগ্নিকাণ্ডের সময় রিসোর্টটিতে প্রায় ৩০ জন অবস্থান করছিলেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন বের হতে পারলেও মোট কতজন সেখানে ছিলেন, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের লোকজন ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে গেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব তথ্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে পুলিশ, কোস্টগার্ড, বিজিবি, গোয়েন্দা পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দারা উদ্ধারকাজে সহযোগিতা করেন। স্থানীয় সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী, জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান, পুলিশ সুপার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
কাঠের তৈরি তিনতলা রিসোর্টটিতে মোট নয়টি কক্ষ ছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। আগুনে পুরো স্থাপনা পুড়ে গেছে। উদ্ধার অভিযান ও তদন্ত শেষে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি এবং ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত জানা যাবে।
পুলিশের হেফাজতে রিসোর্ট ম্যানেজার
এদিকে, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় টুপটুপ রেস্তোরাঁ অ্যান্ড রিসোর্টের ম্যানেজার সুমন ইসলামকে পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। রিসোর্টের মালিক নিয়াজ মোরশেদ ও তানভীরকে ঘটনার পর থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানা গেছে।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার বলেন, ‘সুমন ইসলামকে থানায় নেওয়া হয়েছে। তাকে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এ বিষয়ে পরে বিস্তারিত জানানো হবে।’
জাতীয় সব খবর















