নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা, নিহত ২২, নিখোঁজ শতাধিক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় অন্তত ২২ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় শত শত মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। বন্যার পানির স্রোতে বেশ কয়েকটি গ্রাম ভেসে যাওয়ার পাশাপাশি সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তিব্বত সীমান্তবর্তী দেশটির পার্বত্য অঞ্চল রসুয়ায় এ বিপর্যয় ঘটেছে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বুধবারের আকস্মিক বন্যায় ৩৮৪ জন পর্যটক নিখোঁজ হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের ২৯১ জন পর্যটক রয়েছেন।
প্রবল স্রোতের কারণে রসুয়া জেলার শ্যাপ্রু বেসি ও তিমুরে হেলিকপ্টার অবতরণ করতে পারছে না। ওই জেলার জনসংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার।
রসুয়ার জেলা প্রশাসক নরেন্দ্র পারিয়ার রয়টার্সকে বলেন, ‘এতে ব্যাপক প্রাণহানি বা সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। তবে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।’
ভোটে কোশি নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদের উঁচু এলাকায় চলে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তাঁর কাছে খবর এসেছে, নদীর স্রোতে আশপাশের কয়েকটি গ্রাম ও অবকাঠামো প্রকল্পের স্থাপনা ভেসে গেছে।
নেপালের পাশাপাশি সীমান্তের ওপারে চীনের তিব্বতেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। চীনের সরকারি সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, নেপালের সীমান্তবর্তী গিরং কাউন্টিতে ভূমিধসের পর ‘বড় ধরনের হতাহত’ হয়েছে এবং কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন।
ভূমিধসে চীনের গিরং বন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে শিগাৎসে অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং নিখোঁজদের উদ্ধারে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি দ্বিতীয় দফার দুর্যোগ ঠেকাতে নজরদারি ও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
নেপালের জলবায়ু ন্যায়বিচারকর্মী প্রয়াশ অধিকারী বলেন, ভয়াবহ এই বন্যায় ‘পুরো পুরো গ্রাম’ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
নেপাল পুলিশের প্রকাশ করা ভিডিওসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে পাহাড়ি উপত্যকার মধ্য দিয়ে কাদামাটির প্রবল স্রোত নেমে আসতে দেখা গেছে।
নেপালের ইংরেজি দৈনিক রিপাবলিকা ডেইলির সম্পাদক কোশ রাজ কৈরালা বলেন, ভারী বৃষ্টিপাত না থাকায় অনেক মানুষ আকস্মিক বন্যার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, অনেক মানুষ তখন বাড়িতে ছিলেন এবং নদীর স্রোতে বেশ কয়েকটি বাড়ি ভেসে গেছে।
পরিস্থিতি পর্যালোচনায় জরুরি বৈঠক করেছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। তিনি জানিয়েছেন, চিকিৎসক দল, স্কাউট ও রেডক্রসের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে।
নেপাল সেনাবাহিনী ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় হেলিকপ্টার ও দুর্যোগ মোকাবিলায় বিশেষ দল পাঠিয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের কাজও চলছে।
নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জলবিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে।
এদিকে নেপালে একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত আটজন দক্ষিণ কোরীয় নাগরিক নিখোঁজ হয়েছেন। আরও ১০ জন সেখানে আটকা পড়েছেন বলে জানিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নিখোঁজদের উদ্ধারে নেপাল একটি উদ্ধারকারী দল পাঠিয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়া নেপালে সরকারি কর্মকর্তা, অগ্নিনির্বাপণ ও পুলিশ সদস্যদের সমন্বয়ে একটি দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
আকস্মিক বন্যার সঠিক কারণ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে নেপালের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের ধারণা, হিমবাহ থেকে বরফ ও পাথরের ধস থেকেই বন্যার সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, ভোতে কোশি নদীর শাখা লেন্দে খোলা নদীতে বুধবার সর্বোচ্চ মাত্রার পানির প্রবাহ দেখা যায়। দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস বিশেষজ্ঞ শাশ্বত সান্যাল বলেন, গত ১৪ মাসে লেন্দে খোলা নদীতে দুবার বড় ধরনের বন্যা হয়েছে। এবারের বন্যার পেছনে নেপালের দিকের একটি হিমবাহ থেকে বরফ-পাথরের ধসের ভূমিকা থাকতে পারে। এতে নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে পরে হঠাৎ বিপুল পানি নিচের দিকে নেমে আসে।
জলবায়ু ন্যায়বিচারকর্মী প্রয়াশ অধিকারী বলেন, এমন দুর্যোগে প্রাণ ও সম্পদ রক্ষায় আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু বিপর্যয়ের ঝুঁকি পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব না হলেও আগাম সতর্কতার মাধ্যমে জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করা সম্ভব।
ভোতে কোশি নদীর উৎপত্তি তিব্বতে। পরে এটি নেপালের ত্রিশূলী নদীতে গিয়ে মেশে, যা ভারতের মধ্য দিয়ে গঙ্গা অববাহিকার দিকে প্রবাহিত হয়েছে।
গত বছরও ভোতে কোশি নদীতে বন্যায় নয়জন নিহত এবং ২৪ জন নিখোঁজ হয়েছিলেন। সে সময় নেপাল-চীনকে সংযোগকারী ‘ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ’ ভেসে যাওয়ায় কয়েক মাস ধরে দুই দেশের যোগাযোগ ও বাণিজ্য ব্যাহত হয়েছিল।
দক্ষিণ এশিয়ায় জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্ষা মৌসুমে নিয়মিতই ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ অঞ্চলে চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন এবং তীব্র হচ্ছে।
সূত্র: আলজাজিরা
অন্যদেশ সব খবর















