নেপালে ভয়াবহ বন্যায় মৃত্যু ৯শ ছাড়ালো, নিখোঁজ ৪ হাজারের বেশি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও আকস্মিক পাহাড়ি ঢলের পর নতুন করে বন্যার আশঙ্কায় ক্ষতিগ্রস্ত জেলার বাসিন্দাদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে উদ্ধারকারীরা নিখোঁজদের সন্ধান, ধ্বংসস্তূপ সরানো এবং ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক যোগাযোগ পুনরুদ্ধারে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভয়াবহ এই দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯০৩ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ৪ হাজার ২৪৭ জন।
সোমবার (৩১ আগস্ট) নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এ তথ্য জানিয়েছে। একই সময়ে চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সীমান্তের চীনা অংশে বন্যায় ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫৪৬ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় রবিবার ভোরে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষের মোবাইল ফোনে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। ভোতে কোশি নদীর পানি বাড়তে থাকায় এ সতর্কতা জারি করা হয়। নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী ধরম রাজ উপ্রেতি জানান, উজানে পানির প্রবাহ বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে চীনা কর্তৃপক্ষ নেপালকে জানিয়েছে।
এদিকে কাঠমান্ডু থেকে ভয়াবহ বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত একটি এলাকার সঙ্গে সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কটি সচল করতে উদ্ধারকর্মীরা কাজ করছেন। বন্যার কাদা ও ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে সড়কটি যান চলাচলের উপযোগী করার চেষ্টা চলছে।
তবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। একের পর এক সতর্কবার্তা পাওয়ায় অনেকেই বুঝতে পারছেন না কখন আবার নিরাপদ স্থান ছেড়ে ছুটতে হবে।
ধাদিং জেলার বাসিন্দা গোবিন্দ শ্রেষ্ঠ বলেন, কখনো বন্যার সতর্কবার্তা দেওয়া হচ্ছে, আবার কখনো উঁচু এলাকায় ছুটে যেতে বলা হচ্ছে। রাতের বেলাতেও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তার ৭২ বছর বয়সী বাবা ও ৭০ বছর বয়সী মাকে সঙ্গে নিয়ে বারবার নিরাপদ স্থানে যেতে গিয়ে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।
নেপালের অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ধাদিংয়ে কিছু বাসিন্দা ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়িঘরে ফিরতে শুরু করেছেন। তারা কাদামাটি ও ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে ব্যবহারযোগ্য জিনিসপত্র উদ্ধারের চেষ্টা করছেন।
কোথাও বন্যার পানিতে ঘরের দেয়াল ভেঙে গেছে। কেউ বারান্দা ও জানালার ফ্রেম থেকে কাদা সরাচ্ছেন, আবার কেউ মাটির নিচ থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র খুঁজে বের করছেন। এক ব্যক্তি ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে জীবিত অবস্থায় নিজের মুরগিগুলো খুঁজে পান। পরে সেগুলো দড়ি দিয়ে বেঁধে ট্রাকের কেবিনে তুলে নেন।
ধাদিংয়ের বাসিন্দা শর্মিলা তামাং ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস উদ্ধারের সময় বলেন, ‘সবকিছু শেষ। কিছুই অবশিষ্ট নেই। এমনকি আমাদের বাড়িটিও নেই।’
বন্যায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎকেন্দ্রেও রবিবার থেকে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ শুরু হয়েছে। কেন্দ্রটি চার জেলার ২০ হাজারের বেশি মানুষকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে।
ভয়াবহ এই দুর্যোগে বিভিন্ন দেশের নাগরিকরাও নিখোঁজ হয়েছেন। কেউ সেখানে কাজ করছিলেন, কেউ পাহাড়ে ভ্রমণ করছিলেন, আবার কেউ পবিত্র একটি পর্বতশৃঙ্গে তীর্থযাত্রায় গিয়েছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র টমি পিগট জানিয়েছেন, নেপালে বর্তমানে ৮৫ জন মার্কিন নাগরিকের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। তবে এখন পর্যন্ত কোনো মার্কিন নাগরিকের মৃত্যুর খবর তাদের কাছে নেই। নয়জন মার্কিন নাগরিককে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
পিগট বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নেপাল সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে একটি দুর্যোগ মোকাবিলা পরামর্শক দল ইতোমধ্যে নেপালে কাজ করছে।
এর আগে, শনিবার (২৯ আগস্ট) যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছিল, জরুরি মানবিক সহায়তা হিসেবে ৩৬ লাখ ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে। এর আওতায় ১০ হাজার পরিবারকে সর্বোচ্চ তিন মাস পর্যন্ত খাদ্য সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, তিব্বতে ২৬১ জন বিদেশি নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে শতাধিক নেপালি নাগরিকও রয়েছেন।
বুধবারের (২৬ আগস্ট) ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার সূত্রপাত হয় হিমালয়ের উঁচু অঞ্চলে একটি হিমবাহ ধসে পড়ার পর। স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণকারী বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, হিমালয়ের উঁচু এলাকায় একটি হিমবাহের নিচের শিলাস্তর ধসে পড়ে। এর সঙ্গে হিমবাহের একটি বড় অংশও ধসে যায়।
ভয়াবহ ওই ভূমিধসের মাত্রা এতটাই বেশি ছিল যে তা ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের মতো কম্পন সৃষ্টি করে। বিপুল পরিমাণ পাথর ও গলিত পানি নিচের উপত্যকার নদীগুলোতে নেমে এসে ভয়াবহ স্রোতের সৃষ্টি করে। এতে তিব্বত ও নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকায় ঘরবাড়ি, সেতু ও মাটি ভেসে যায়।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিশ্বব্যাপী উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে নেপালের অবদান মাত্র শূন্য দশমিক এক শতাংশ হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হচ্ছে দেশটি।
তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, বুধবারের দুর্যোগের সঙ্গে সরাসরি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সম্পর্ক রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য এখনো সময় হয়নি। তবে মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়তে থাকায় এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে হিমালয় অঞ্চলে উষ্ণতা বিশ্বের অনেক এলাকার তুলনায় দ্রুত বাড়ছে।
এদিকে নেপালের উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে মালয়েশিয়া। দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রমে সহায়তার জন্য মালয়েশিয়া একটি উদ্ধারকারী দল পাঠাবে। একই সঙ্গে দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মালয়েশীয় নাগরিকদের সরিয়ে নিতেও দলটি কাজ করবে। নেপালের পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনে ১০ লাখ ডলার আর্থিক সহায়তারও ঘোষণা দিয়েছে মালয়েশিয়া ।
সূত্র : সিবিএস নিউজ
অন্যদেশ সব খবর















