রাসুল ﷺ-এর প্রতি সাহাবাদের সম্মান ও আনুগত্য
লিখেছেন : সৈয়দ মুহাম্মদ আরফাতুর রহমান
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সাহাবায়ে কেরামের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা ছিল মানবসমাজে সম্মানের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁরা যে মর্যাদা ও ভক্তি প্রদর্শন করেছিলেন, তা সত্যিই সম্মানের শিখর স্পর্শ করেছিল। তাঁদের অন্তরের নিবেদন ও জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে নবীর প্রতি অবিচল ভক্তি সত্যিই এক অনুপম দৃষ্টান্ত। মহানবী ﷺ এর সঙ্গে থাকা প্রতিটি মুহূর্তই সাহাবারা শ্রদ্ধা ও সম্মানের সঙ্গে অতিবাহিত করতেন।
সাহাবা (রাঃ)রা বারবার ওনার চেহারা মোবারকের দিকে তাকিয়ে থাকতেন অবাক দৃষ্টিতে। হযরত জাবের ইবনে সামুরা (রাঃ) বর্ণনা করেন, “আমি একবার আকাশের পূর্ণিমা চাঁদের দিকে তাকালাম এবং একবার নবীজি ﷺ-এর মোবারক চেহারার দিকে। মনে হলো, তিনি পূর্ণিমার চাঁদের চেয়েও বেশি সুন্দর।”
রাসুল ﷺ-এর শরীরের ঘাম মোবারকও ওনাদের কাছে পবিত্র ছিল। হযরত আনাস ইবন মালিক (রাঃ) বর্ণনা করেন, “রাসুলে আকরাম ﷺ যখন আমাদের ঘরে প্রবেশ করতেন এবং ঘুমাতেন, আমরা তাঁর ঘাম মোবারক সংগ্রহ করতাম এবং সেটি সুগন্ধিতে মিশিয়ে নিতাম। তাঁর ঘামের সুগন্ধ কস্তুরীর থেকেও উৎকৃষ্ট ছিল।”
সাহাবাদের আনুগত্য ছিল অসাধারণ। রাসুল ﷺ-এর নির্দেশিত কাজ তারা অবিলম্বে পালন করতেন এবং কখনো কোনো আদেশ প্রশ্ন করতেন না। এমনকি তিঁনি আদেশ করলে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তও ছেড়ে দিয়ে যুদ্ধের ময়দানে ঝাপিয়ে পড়তেন এবং শহীদ হতেন ।
উদাহরণ হিসেবে হযরত হানজালা (রাঃ) উল্লেখযোগ্য। উহুদের যুদ্ধের আগের রাতে তাঁর বিয়ে হয়েছিল, কিন্তু পরদিন সকালেই রাসুল ﷺ-এর আহ্বানে তিনি যুদ্ধের জন্য রওনা হন নববধু রেখে এবং শহীদ হন। রাসুল ﷺ পরবর্তীতে সাহাবাদের জানালেন, ফেরেশতারা হানজালাকে শহীদ হওয়ার পর জান্নাতের ঝর্ণার পানি দিয় গোসল দিয়েছেন। যাকে বলা হয় “গাসিলুল মালায়িকা।”
সাহাবাদের রাসুল ﷺ-এর প্রতি এই শ্রদ্ধা কুরাইশদেরও বিস্ময় সৃষ্টি করেছিল। হুদাইবিয়ার চুক্তির সময় কুরাইশদের পক্ষ থেকে আলোচক হযরত উরওয়া ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন, “আমি বহু রাজা-বাদশাহর দরবারে গিয়েছি কিন্তু কখনোই কোনো রাজাকে তার অনুসারীদের পক্ষ থেকে এত সম্মান পেতে দেখিনি, যতটা মুহাম্মদ ﷺ তাঁর সাহাবাদের কাছ থেকে পান। আমি দেখেছি, তিনি যখন অজু করেন, সাহাবারা তার ফোঁটা ফোঁটা পানি নিজেদের শরীরে মাখে। তিনি যখন কথা বলেন, সবাই নীরব হয়ে যায়। তিনি যখন কোনো নির্দেশ দেন, সাথে সাথে তা পালন করা হয়। তার সামনে কেউ উচ্চস্বরে কথা বলে না। তার চুল বা ঘাম থেকেও তারা বরকত নিতে চেষ্টা করে।
এমন ভালোবাসা ও আনুগত্য আমি অন্য কোথাও দেখিনি।” সুবহানাল্লাহ !
তাঁর কথার প্রতিটি অক্ষরও তাদের কাছে ছিল আখাংকিত, সম্মানিত এবং অনুকরণীয়। বিদায় হজ্বের সময় রাসুল ﷺ সমস্ত সাহাবাদের একত্র করে কথা প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করেছিলেন “এটি কোন মাস?” সাহাবারা উত্তর দেন, “আল্লাহ ওনার রাসুল ﷺ ভাল জানেন।” এরপর প্রশ্ন করেছিলেন “এই শহর কোন শহর?” উত্তর “আল্লাহ ওনার রাসুল ﷺ ভাল জানেন।” তারপর প্রশ্ন করেছিলেন “আজ কোন দিন?” উত্তর “আল্লাহ ওনার রাসুল ﷺ ভাল জানেন।”
একবার ভেবে দেখুন হজ্বের মাসে দাঁড়িয়ে কোন মাস, হজ্বের শহরে দাঁড়িয়ে কোন শহর, এবং কোরবানির দিন জিজ্ঞেস করেছিলেন কোন দিন। উত্তর ছিল জিলহজ্ব, মক্কা শহর, এবং কোরবানির দিন। কিন্তু রাসুল ﷺ-এর সামনে সাহাবারা এতই বেশি আদব এবং শ্রদ্ধা এতই ছিল যে, এমন সরল প্রশ্নের উত্তরও তারা সরাসরি বলতেন না, বরং তাঁর নূরাণি জবান থেকে শুনতে চেয়েছিলেন।
সাহাবা (রাঃ)রা আমার রাসুল ﷺ- কে কেমন ভালবাসতেন এবং আদর করতেন তা ছিল অকল্পনীয়। মিশকাত শরীফে উল্লেখ আছে, আব্দুল কায়েস গোত্রের প্রতিনিধি দল মদিনায় এসে নবী ﷺ-এর হাত এবং পা চুম্বন করেছিলেন। "একদিন হযরত আসিদ ইবনে হুদায়র (রা) রাসূল ﷺ এর সাথে মজা করছিলেন এবং সবাইকে হাসাচ্ছিলেন। তখন রাসূল ﷺ তাঁকে একটি লাঠি দিয়ে কোমরে আঘাত করেন। তিনি বলেন, 'আমাকে প্রতিশোধ নিতে দিন।' রাসূল ﷺ বলেন, 'নাও, প্রতিশোধ নাও।' তিনি বলেন, 'আপনার গায়ে জামা আছে, কিন্তু আমার গায়ে জামা নেই।' তখন রাসূল ﷺ তাঁর জামা উঠিয়ে তাঁর গায়ে চুমু খেতে দেন। তিনি বলেন,“ইয়া রাসূলাল্লাহ ﷺ, এটিই আমি চেয়েছিলাম।”
একবার ভাবুন কি অসাধারণ মর্যাদা, কি গভীর সম্মান আর কি নিখাদ ভালোবাসার দৃষ্টি সাহাবারা রাসুল ﷺ-এর প্রতি দেখাতেন এবং জীবনের সর্বোচ্চ স্তরে আনুগত্য দেখাতেন। । ভাবুন, আগে কি কোথাও লিখিত ছিল কোথায় কী করতে হবে বা কিভাবে সম্মান প্রদর্শন করতে হবে? না, কিছুই লেখা ছিল না। তবুও তারা ঈমানের সংরক্ষণ করে সর্বোচ্চ সম্মান দেখাতেন। অথচ আজকাল অনেকে রাসুল ﷺ-এর মর্যাদা নিয়ে সীমারেখা টানতে চায়, কলম বসিয়ে ফুলস্টপ দিতে চায়। কিন্তু সাহাবারা জীবন উৎসর্গ করতে, সর্বোচ্চ সম্মান দেখাতে, কোনো কৃপণতা দেখাতেন না। এবং সাহাবারা তা দেখিয়েছেন, জীবন দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে, শ্রদ্ধা দিয়ে সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করা সম্ভব। কারণ এতে তাদের ঈমান ও আনুগত্যকে আরও শানিত হত।
এই মিলাদুন্নবীর মাসে আমাদের উচিত সাহাবাদের মতোই আমাদের প্রিয় নবী ﷺ-এর প্রতি ভাবা, তাঁর প্রতি আনুগত্য এবং তাঁর আদর্শ অনুসরণ করা। কারণ সাহাবাদের দৃষ্টান্ত আমাদের শিক্ষা দেয়, কিভাবে রাসুল ﷺ-এর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া যায়।
হিজরতের দিনের মদিনার বাসির সেই বিখ্যাত কবিতা দিয়ে শেষ করতে চাই,
পূর্ণিমার চাঁদ আমাদের উপর এসেছে,
ওদা‘উপত্যকা থেকে ঝলমল আলো ছড়িয়েছে।
শুকরিয়া প্রকাশ করা আমাদের অবশ্য কর্তব্য, যতদিন আল্লাহকে ডাকার মত কেউ থাকবে।
লেখক : গবেষণা সহযোগী, আইডিয়া ফাউন্ডেশন।
কলম সব খবর















