Cvoice24.com

রসূলে পাক (দ.) কোনো সৃষ্টি নয়, সৃষ্টির মূল

লিখেছেন : ড. মোহাম্মদ আবদুল আজিম শাহ্
২২:০৮, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫
রসূলে পাক (দ.) কোনো সৃষ্টি নয়, সৃষ্টির মূল

সমগ্র সৃষ্টির কল্যাণকারী হয়ে মানবীয়রূপে প্রেরিত তাজেদারে মদীনা রহমতুল্লিল আলামিন হজরত আহমদ মোজতবা মোহাম্মদ মোস্তফা (দ.) পরিপূর্ণ নূর।

নূর অর্থ  আলো। অর্থাৎ - জ্ঞানশক্তি, অন্তঃআলোক শক্তি (Eternal light),আধ্যাত্মিক শক্তি, চেতনা। নূর মানে স্বীয় সত্তা, নূর মানে 'স্বধা' নামক 'আমিশক্তি' ( আদিশক্তি)।বিজ্ঞানের ভাষায় The ultimate power। তিনি আল্লাহ রব্বুল আলামিনের নূরের খন্ডিত অংশ; যে নূরকে আল্লাহ থেকে পৃথক করা যায় না। নূরের অংশ এবং নূর থেকে সৃষ্টি দুটোর অর্থ ও তাৎপর্যগত আসমান-জমিন ব্যবধান। কতকলোক বিশ্বাস করে তিনি মাটির তৈরি। আবার কেউ মনে করে  নূরের তৈরি (সৃষ্টি)। মাটির তৈরি মনে করা দুর্বল ঈমানের পরিচায়ক। তিনি মাটির সৃষ্টিও নয়, আবার নূরের সৃষ্টিও নয়- তিনি মূলত আল্লাহর  নূরের খন্ডিত অংশ। মূলত তিনি হলেন  সৃষ্টির মূল। এজন্য রসূলেপাক (দ.)'র অনেক নামের একটি নাম  উম্মিয়্যুন (সমগ্র সৃষ্টিজগতের মূল)। একটি উদাহরণের মাধ্যমে স্পষ্ট করা যায়-সৃষ্টি বা তৈরি করা মানে এক উপাদানের সাথে  অন্য উপাদান মিশ্রিত করে তৃতীয় (নতুন)  বস্তু সৃষ্টি করা।

যেমন -দুধ থেকে ঘি, দই, মাখন ইত্যাদি,যেটি নতুন সৃষ্টি। কিন্তু মূল উপাদান দুধ। আবার একটি বাটি থেকে দুধের কিছু অংশ পৃথক বাটিতে রাখলে তা মূলবাটির দুধের অংশ মাত্র।ভিন্ন উপাদান নয়। তদ্রুপ আল্লাহ খামচি দিয়ে নিজ থেকে একটি অংশ  আলাদা করেছেন। এই  অংশ হলো রসূলেপাক (দ.) এর 'আহমদী' রূপ। অতএব -রসূল (দ.) নূরের সৃষ্ট নয় বরং রসূলেপাক (দ.) এঁর নূর থেকেই সমগ্র সৃষ্টির বিকাশ হয়েছে। তিনি সৃষ্টির আদিতত্ত্ব। এখন আদিতত্ত্ব কী বুঝার জন্য সৃষ্টিতত্ত্ব সম্পর্কে ধারণা প্রয়োজন।

প্রকৃতিতে স্রষ্টার অস্তিত্ব বিদ্যমান। কারণ মূল প্রকৃতি স্রষ্টার অস্তিত্ব থেকে সৃষ্ট। আধুনিক বিজ্ঞান বিগব্যাংয়ের সময় থেকে সৃষ্টিতত্ত্বের কথা বলে থাকেন। কিন্তু এর পূর্ববর্তী সময়ে কী ছিল এই বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ধারণা দেয়নি। পূর্বের ঘটনাসমূহ ভারতবর্ষের প্রাচীন মুনি-ঋষিরা দিব্যজ্ঞান অর্জন করে গুরু-শিষ্য পরম্পরায় আমাদের দিয়ে গেছেন এবং পবিত্র কোরআন শরিফ ও পবিত্র বেদ গ্রন্থেও উল্লেখ আছে। বিগব্যাংয়ের অনেকবছর পূর্বে যখন চেতনা,স্বপ্নের জগৎ কল্পনা, রাত-দিন, গ্রহ-নক্ষত্র, ব্রহ্মাণ্ড-মহাকাশ কিছুই ছিল না। শুধু ঘোর অন্ধকার আর অন্ধকার। শুধু এক সে.মি.-কে একের সাথে সাতচল্লিশটি (১ সে.মি স্থানকে/১এর সাথে ৪৭টি শূন্য জোড়া লাগিয়ে তা দিয়ে  ভাগ করলে ফলাফল যা হয়, সেই পরিমাণ সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম স্থান ছিল।সুক্ষ্ম স্থানেই ছিল মূল প্রকৃতি। যা একটি আবরণে আবৃত ছিল।

সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম স্থানে স্রষ্টা  নিজেরভাবে নিজে বিভোর ছিলেন। ঐ সময়ে 'স্বধা' নামক  চেতনা স্পন্দিত হতে থাকে। ('সধা' অর্থ স্ব-স্বয়ং, ধা-ধারণকারী।অর্থাৎ  স্বয়ং ধারণকারী বা আমি শক্তি অর্থাৎ  যে শক্তি আল্লাহ  নিজে ধারণ করতেন। স্বধা শব্দ অবেস্তা ভাষায় পরিবর্তিত হয়ে 'খদা' হয়। যাহা পরবর্তীতে পেহলভী ভাষার মাধ্যমে ফারসি ভাষাতে 'খোদা' শব্দে পরিবর্তিত হয়। অর্থাৎ স্বধা শব্দ থেকে খোদা শব্দের উৎপত্তি। আমি শক্তিই মূলশক্তি। এটি  আধ্যাত্মিক শক্তি। সূক্ষ্মস্থানে আল্লাহ ও আল্লাহর রসূল (দ.) একে অপরের সাথে এমনভাবে মিশে থাকতেন  যে পৃথক করার কোনো সুযোগ নেই। দুইয়ে মিলে এক; যেরকম  ডালের দুটি অংশ অভিন্ন হয়ে একে অপরের সাথে আবদ্ধ হয়ে আবরণে আবৃত থাকে যে  আলাদা করার  সুযোগ নেই। ডালকে যখন ভাঙ্গা হয়  তখন দুটি অংশ দৃশ্যমান হয়। আল্লাহ রব্বুল আলামিন হঠাৎ  নিজেকে প্রকাশ দেওয়ার  ইচ্ছা 'জাগ্রত হয়। তখন নিজেকে খামচি দিয়ে একটি অংশ আলাদা করেন। অংশটি আল্লাহর প্রশংসা করতে করতে  প্রশংসাকারী (আহমদ) রূপ নেয়। মূলত এটি  আমিশক্তি (আধ্যাত্মিক শক্তি)। এ শক্তি থেকে সৃষ্টির নির্মাণ শুরু। 

আহমদ, আল্লাহর গুণকীর্তণ করতে করতে স্বয়ং প্রশংসিত (মোহাম্মদ) হয়ে যায় । অর্থাৎ মোহাম্মদে পরিণত হয়। তখনও সৃষ্টিজগৎ সৃজন হয়নি। সাহাবা হযরত জাবের (রা.), রসূলে পাক (দ.)-এঁর নিকট প্রশ্ন করেন, সবকিছুর পূর্বে আল্লাহ কী সৃষ্টি করেন? তিনি বলেন, 'সর্বপ্রথম আল্লাহর নূর হতে আপনার নবীর নূর উৎপত্তি হয়েছে।' এই নূর হল আধ্যাত্মিক শক্তি (জ্ঞানশক্তি)। জ্ঞানশক্তি থেকে সৃষ্টির নির্মাণ শুরু হয়। রসূলেপাক (দ.) বলেন, 'আমি আল্লাহর নূর (positive energy) আর সমগ্র সৃষ্টি আমার নূর (আলো) থেকে সৃষ্টি হয়েছে।' (তাফসিরে রুহুল বায়ান, ২য় খণ্ড)। 

স্রষ্টা যখন নিজেকে প্রকাশ দেয়ার ইচ্ছা পোষণ করলেন তখন চেতনা নামক শক্তি প্রতিনিয়ত স্পন্দিত হতে থাকে। স্পন্দনের ফলে মূলশক্তি (প্রকৃতি) তিন শক্তিতে পরিণত হয়। যথা-১) সত্ত্বঃ-সাদা বা প্রকাশ (নূর); জ্ঞানশক্তি। ২) রজঃ-গেরুয়া (লাল); ইচ্ছাশক্তি। ৩) তমঃ-শ্যাম (কালো); ক্রিয়াশক্তি। এই তিন শক্তি থেকে ধীরে ধীরে প্রকৃতির বিস্তার হয়। কোনো কিছু তৈরি করতে প্রথমে চেতনা (জ্ঞানশক্তি)। জ্ঞানশক্তি থেকে ইচ্ছা শক্তির উদ্য়, এরপর পরিকল্পনা করতে হয়। পরিকল্পনা ব্যতীত কিছু নির্মাণ সম্ভব নয়। পরিকল্পনাকে  কার্যকর শক্তিতে পরিনত করে কিছু নির্মাণ  করতে হয়। এই শিক্ষা আমরা স্রষ্টা থেকে পেয়েছি।

হাদিসে কুদসিতে আছে, 'কুন্‌তু কানান মাখপিয়ান ফাআহাব্বু আন-ওরাফা ফা-খালা কতুল খালফা লিউরাফা' অর্থাৎ- আমি সুপ্তস্থানে গুপ্ত ছিলাম, হঠাৎ নিজেকে প্রকাশ দেওয়ার  ইচ্ছা হলো, তখন নিজেকে প্রকাশ করলাম। প্রকাশ করা মানে সৃষ্টির নির্মাণ। তিনি ইচ্ছাশক্তিকে যখন ক্রিয়াশক্তিতে পরিণত করবেন তখন , পবিত্র কোরআন শরিফের ভাষায় 'কুন ফায়াকুন' অর্থাৎ হও, হয়ে যাও; পবিত্র বেদগ্রন্থের ভাষায় 'সু-কামেয়াত' অর্থাৎ এক নই অনেক হয়ে যাই, তখন প্রকৃতির নির্মাণ শুরু হয়, যা সম্পূর্ণ পজিটিভ এনার্জি থেকে। সৃষ্টিতত্ত্বের গবেষণা বলে- স্রষ্টা সূক্ষ্মস্থানে মিলিয়ন বিলিয়ন বছর গুপ্ত থাকার পর যখন নিজেকে প্রকাশ দেয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন তখন ১৩.৭ বিলিয়ন বছর পূর্বে (বিগব্যাংয়ের সময়) সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম স্পেসের বৃহৎ ধ্বনিতে বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের ফলে  মহাজাগতিক রশ্মির ধুম্র (ধোঁয়া),ধুম্র  থেকে ধূলিকণার (cosmic dust) বৃষ্টি আরম্ভ হয়। যাকে রজঃ বলে। রজঃ থেকে আকাশ (বৃহৎ স্পেস) সৃষ্টি হয়। পবিত্র কোরআনের ভাষায় সপ্তাকাশ।

আল্লাহ বলেন, 'ছুম্মাস তাওয়া ইলাস সামায়ি ওয়াহিদা দুখানুন ফা-খলা নাহা ওয়ালিল আরদ্ধি তিয়া তওয়াল আওকারহান খালা-তা আতাইনা তয়ইন। ফালা ইন্না সাবায়া সামা ওয়াতি ফি ইউও মা-য়নি ওয়াওহা ফিকুল্লি সামায়িন আমরাহা ওয়া জাইয়ানা সামা আদ দুনিয়া বিমাছো বিহা ওয়া হিফজন যা লিকা তাকদিরুল আজিজিল আলিম' (সুরা হামিম-১১ ও ১২) অর্থ- 'তিনি আকাশে মনোনিবেশ করেন, যা ছিল পূর্বে ধোঁয়া (ধুম্র কণা), এরপর আকাশ ও জমিনকে আদেশ করেন তোমরা এগিয়ে এসো ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়। তারা বলল, আমরা অনুগত আছি। অতএব তিনি দুদিনের মধ্যে ধোঁয়া থেকে সপ্তাকাশ নির্মাণ করেন এবং প্রতিটি আকাশে আদেশনামা প্রেরণ করেন। পরিশেষে আমি নিকটবর্তী আকাশকে নক্ষত্র দ্বারা সাজিয়ে দিলাম এবং শয়তান (নেগেটিভ এনার্জি) থেকে সংরক্ষিত করলাম। অতএব সৃষ্টি নির্মাণের প্রথম হল আকাশ। পজিটিভ এনার্জি (নূর) তথা মহাত্মা থেকে আত্মা, আত্মা থেকে আকাশ, আকাশ থেকে বায়ু, বায়ু থেকে অগ্নি, অগ্নি থেকে পানি, পানি থেকে সলিড বা মাটি (পৃথিবীতত্ত্ব) সৃষ্টি হয়। একে পঞ্চতত্ত্ব বলে।এরপর ব্যষ্টি (দেহ), ব্যষ্টি থেকে ব্যপ্তি, ব্যপ্তি থেকে সমষ্টি, সমষ্টি থেকে সৃষ্টি, সৃষ্টি থেকে পরমসৃষ্টি। আকাশ থেকে শুরু করে বৃহৎ গ্রহ, নক্ষত্র,

গ্যালাক্সি,গ্রহাণুপুঞ্জ,ব্রহ্মাণ্ড,পশুপাখি,বৃক্ষাদি,অগ্নি,বায়ু, পানি,পৃথিবী বা মাটি,সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অণু,পরমাণু, কোষসহ আঠারো আলম সৃষ্টি হয। এজন্য গ্রহ নক্ষত্র, আকাশ বাতাস, পঞ্চতত্ত্বসহ যখন কিছুই সৃষ্টি হয়নি তখনও রসূলপাক (দ.)-এঁর অস্তিত্ব ছিল। সমগ্র সৃষ্টিজগৎ সৃজন হওয়ার বহুবছর পর ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের ১২ রবিউল আউয়াল আধ্যাত্মিক ক্ষমতা নিয়ে  সৃষ্টিজগতের কল্যাণকারী হিসেবে  অবতার হয়ে মানবীয় আকৃতিতে 'আহম্মদ ও মোহাম্মদের সমন্বয়ে হজরত আহমদ মোজতবা মোহাম্মদ মোস্তফা (দ.) নামে  ধরাধমে আগমন করেন। সৃষ্টিকুলের জন্য  নেয়ামত হিসেবে তাঁর আগমনকে স্মরণপূর্বক প্রেমিকগণ বিভিন্ন তরিকার ভিন্নরীতি, সংস্কৃতি অনুসারে, আল্লাহর নিকট শোকরিয়া আদায়স্বরুপ আনন্দের দিন হিসেবে ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) পালন করেন।শুধু ঈদ নয় বরং সকল ঈদের সেরা ঈদ হিসেবে প্রেমিকগণ পালন করে থাকেন।
আকাশ, বাতাস ফেরেস্তাসহ সমগ্রকুলকায়েনাত আনন্দে নৃত্যরত থাকে এবং দরূদশরিফ পেশ করেন। ঐ দিন বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ। ঐ দিন ছাড়াও বছরের যেকোনো দিনে এই ঈদ উদযাপন করা যায়। এটি প্রেমিকদের হৃদয়ের খোরাক। আর এটি পালন করার জন্য কোনো দলিলের প্রয়োজন নেই। প্রেমিকদের কর্মকাণ্ড শৃঙ্খলিত ও সীমাবদ্ধ জ্ঞানের উর্ধ্বে। প্রেমিকরা রসূল (দ.)'র প্রেমের সুধা পান করে এতই বেহুশ থাকেন যে সর্বদা তাঁর ধ্যান-জ্ঞানে নিমগ্ন থাকেন। প্রেমিকগণ যার যার তরিকার রীতি -আনুষ্ঠানিকতা অনুসরণ করে ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) পালন করেন।

এই বিষয়ে বলা যায়- মাইজভান্ডারী দর্শন- উন্মুক্ত আধ্যাত্মবাদ দর্শন। এই দর্শনের স্বাধীন, স্বকীয় নিজস্ব কিছু রীতি রেওয়াজ, সংস্কৃতি  রয়েছে। যেমন-  সেমা, ঢোল, বাদ্য-বাজনার সহিত নৃত্যসহকারে হালকায়ে জিকির। অতএব মাইজভান্ডারী 'লেওয়ায়ে আহমদী'র অনুসারি প্রেমিকরা  ঢোল-বাদ্য-বাজনার দ্বারা নৃত্যসহকারে হালকায়ে জিকিরের মাধ্যমে রসূলেপাক (দ.)'র আগমনী দিনকে স্মরণপূর্বক  আনন্দসহকারে ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) পালন করতে পারে। এতে কে কী বলল, কে  সমালোচনা করল তাতে কিছু যায় আসে না। অনেকে নিজস্ব তরিকার রীতিনীতিকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে ভিন্নতরিকার রীতিনীতিকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে।ক্ষেত্রবিশেষে জোরপূর্বক নিজের মতকে চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টাও করে, যেটিকোনোভাবেই উচিত নয়। প্রেমিকগণ সবসময় উদার মানসিকতার পরিচয় দেয়। 
অতএব রসূলেপাক (দ.) কোনো সৃষ্টি নয় তিনি সৃষ্টির মূল এবং স্রষ্টার রূপ-গুণের বহিঃপ্রকাশ। তিনি প্রকৃতি নয়, প্রকৃতি তাঁর নূর থেকে সৃষ্টি হয়েছে। তিনি প্রকৃতির মূল। তিনি কেবল শক্তি নন বরং আদিশক্তি। তিনি 'স্বধা' নামক আমিশক্তি। তিনি নূরের তৈরি নয় বরং স্বয়ং পূর্ণনূর এবং নূরের ধারক।সৃষ্টিকুলকে  আলোকিত করার জন্য 'অবতার' হয়ে (ভৌত কাঠামো) মানবীয়রূপে ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে রবিউল আউয়াল মাসে এই নূর পৃথিবীতে আগমন করেন।

পবিত্র কোরআন শরিফে আল্লাহ বলেন, "নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে নূর" (সুরা মায়িদা, আয়াত-১৫)। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.)'র 'ইবনে আব্বাস'-এ আছে -এই নূর  হজরত আহমদ মোজতবা মোহাম্মদ মোস্তাফা (দ.)।যেহেতু আল্লাহ নিরাকার, নিরঞ্জন ও অসীম- আল্লাহকে দেখা ও পরিমাপ করা অসম্ভব কিন্তু  প্রেরিতকে দেখা যায়। তাই (দ.) আল্লাহর গুণ,শক্তি ও বেলায়তের ক্ষমতা নিয়ে অবতাররূপে প্রকাশিত হয়েছেন।সুবুদ্ধির অনুসারীগণ রসূলেপাক (দ.)-কে কখনো সৃষ্টি মনে করে না, স্রষ্টাও  মনে করে না। তবে মহাসত্ত্বা থেকে পৃথক কোনো সত্ত্বাও মনে করে না। সৃষ্টির আদিতেও তিনি, অন্তেও তিনি, গোপনেও তিনি, প্রকাশ্যেও তিনি। সহজ কথায় সৃষ্টি নির্মাণের পূর্ব থেকে যাঁর অস্তিত্ব, তিনি তো নিঃসন্দেহে মহাসত্ত্বার রূপ। 
তিনি সমগ্র সৃষ্টি জগতের রহমত হিসেবে আগমন করে  মানবকে সত্যের সন্ধান দিয়েছেন। দিয়েছেন শান্তির বার্তা। শুনিয়েছেন সাম্যের বাণী। ফিরিয়ে দিয়েছেন বঞ্চিত মানুষের অধিকার। জালিমের হাত থেকে বিশ্বমানবতাকে রক্ষা করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছেন। বলেছেন মানুষের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ, ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি না করতে সতর্ক করেছেন। জাগতিক লোভ, মোহ ত্যাগ করে স্রষ্টামুখি হওয়ার আহবান জানিয়েছেন।

অতএব,রসূলেপাক (দ.) মাটি কিংবা নূরের তৈরি নয়; তিনি স্বয়ং পূর্ণনূর। যারা বলেন, তিনি নূরের তৈরি; তারা তাঁর শান ও মর্যাদায় আঘাত করছে। একইভাবে যারা মাটির তৈরি বলে চিৎকার করছে তারা  রসূল (দ.)'র শান - মর্যাদাকে অধিকতর হেয় করার অপচেষ্টা করে যাচ্ছে। তিনি মানবীয়রূপে আগমন করলেও ভাবজগত, অনুভূতিতে আল্লাহর বেলায়তী শক্তির উৎসসহ স্বীয়সত্ত্বা হিসেবে হৃদয়ে ধারণ করা উচিত। এতে তাঁর শান নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আসবে। তিনি মোহাম্মদীরূপে নবুয়তের দায়িত্ব নিয়ে প্রেরিত হয়ে  আল্লাহর একত্ববাদ প্রচার করেছেন।আবার আল্লাহর বেলায়তের শক্তি নিয়ে আগমন করে মাধ্যমে 'আহমদী' রূপের বিকাশ দিয়েছেন। বেলায়তের শক্তি দিয়ে  তিনি দৃশ্য- অদৃশ্যসহ সমগ্র সৃষ্টিজগতকে পরিচালনা করেন। এজন্য মূলত বেলায়তই নবুয়তের প্রাণ, বেলায়তই নবুওয়তের  মূলভিত্তি।

অতএব নবুয়ত ও বেলায়তের সমন্বয়ে রসূলেপাক (দ.)'র আগমন। নবুয়ত রসূল (দ:)-এঁর বাহ্যিক কাঠামো (মানবীয়রূপ)।আর যে শক্তি তিনি ধারণ করেন তা হল বেলায়ত। রসূল (দ.) আল্লাহর ঘোষিত শেষ নবুয়তপ্রাপ্ত নবী। এরপরে আর কেউ নবুয়তপ্রাপ্ত হবে না (এটি চিরন্তন সত্য)। নবুওয়তের ধারা সমাপ্তি হলেও ত্রিবিধ  পন্থায় বেলায়তের ধারা বহমান রেখেছেন। রসূলেপাক (দ.)- এঁর পরে বেলায়তের সম্রাট মওলা আলী মুশকিল কোশা হজরত আলী (আ.), আশেকে রসূল) হজরত ওয়াইস করণি (রা.) এবং হজরত হাসান বসরী (রা.)-এই ত্রিবিধ ধারার মাধ্যমে বেলায়ত জারি আছে এবং থাকবে। সুবুদ্ধির চর্চা ও কঠোর সাধনা দ্বারা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করে যে কেউ এই বেলায়ত অর্জন করতে পারেন।

রসূল (দ.) বলেছেন- "আমার উম্মতদের মধ্যে কতক উম্মত রয়েছেন যাঁরা কর্ম ও গুণে আমার সমকক্ষ"। উম্মতদের মধ্যে কেউ -কেউ সাধনা গুণে রসূল (দ.)-এঁর  নূর ধারণ করে আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হয়েছেন।এমনকী কেউ কেউ  বেলায়তের সর্বোচ্চ স্তরে (মজ্জুবে সালেক্)  উন্নীত হয়ে পৃথিবী নয়, বিশ্ব নয়, গ্যালাক্সি নয় ব্রহ্মাণ্ড নয়; বরং দৃশ্য অদৃশ্যসহ সমগ্র সৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা অর্জন করেছেন। এঁদের মধ্যে -ফরদুল আফরাদ  শাহানশাহ্  -এ - বাগদাদ হজরত পীরানেপীর দস্তগীর শেখ সৈয়দ মহিউদ্দিন  আবদুল কাদের জিলানী (ক.), হিন্দেল অলি গরিবে নেওয়াজ হজরত  সৈয়দ মহিউদ্দিন চিশতি আজমেরী (ক.) (প্রকাশ খাজাবাবা),শৃঙ্খলিত বেলায়ত যুগের সমাপ্তকারী এবং মুক্ত সুফিবাদের সূচনাকারী ফরদুল আফরাদ হজরত শাহ্সুফি মওলানা সৈয়দ আহমদ উল্লাহ (ক.) মাইজভাণ্ডারী  (প্রকাশ হজরত কেবলা), প্রকৃতির গুণে গুণান্বিত, ইউসুফেসানি, জামালে মোস্তফা হজরত শাহ্সুফি মওলানা সৈয়দ গোলামুর রহমান শাহ্ (ক.) মাইজভাণ্ডারী (প্রকাশ- বাবাভাণ্ডারী), বাংলার গরীবে নেওয়াজ নামে খ্যাত কাশফ ও কারামতের খনি হজরত শাহ্সুফি মওলানা মতিয়র রহমান শাহ্ (ক.) ফরহাদাবাদী (প্রকাশ- শাহ্সাহেব), মারজাইল বাহরাইন শাহ্সুফি হজরত সৈয়দ জিয়াউল হক (ক.) মাইজভাণ্ডারী (প্রকাশ- শাহানশাহ্) উল্লেখযোগ্য। এঁরা বেলায়তের সর্বোচ্চস্তরে অধিষ্ঠিত হয়ে  আধ্যাত্মিক ক্ষমতার প্রয়োগ দ্বারা তাঁদের শ্রেষ্ঠত্বের বহিঃপ্রকাশ  ঘটিয়েছেন। এঁরাও  রসূলেপাক (দ.)-এঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে  যুগে যুগে পাপিষ্ট মানবকে আলোকিতসহ বিশ্বমানবতার কল্যাণে ভূমিকা রেখেছেন। অতএব যে সকল উম্মত রসূলেপাক (দ.)-এঁর বেলায়তের ধারাবাহিকতায়  স্রষ্টায়ি নূর ধারণ করে ব্যক্তি থেকে মহাসত্তায় পরিণত হয়েছেন তাঁদেরকেও ভৌতিকরূপে (Material Form) নয়; বরং আল্লাহর শক্তিরূপে  দেখা উচিত।
অতএব সকল ঈদের সেরা ঈদ ;ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.)'র ওসিলায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের ক্ষমাসহ অন্ধকার  আত্মাকে আলোকিত করুন এবং রসূলেপাক (দ.)কে দেখে দেখে মৃত্যু নসিব হোক; মালিকের দরবারে এই ফরিয়াদ জানাই। (আমিন)।

লেখক : সাজ্জাদানশীন, মতিভাণ্ডার দরবার শরিফ, ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম।