Cvoice24.com

কানাডা ভ্রমণ
ম্যাপল পাতার দেশে ১১২ দিনের রঙিন স্বপ্নযাত্রা 

লিখেছেন : ফারুক মোঃ সিদ্দিকী 
১১:৩৮, ২০ অক্টোবর ২০২৫
ম্যাপল পাতার দেশে ১১২ দিনের রঙিন স্বপ্নযাত্রা 

আলহামদুলিল্লাহ! এটি ছিল আমার জীবনের পঞ্চম কানাডা ভ্রমণ। কিন্তু অনুভূতিতে সবচেয়ে গভীর, সবচেয়ে বিস্তৃত। 

জীবনের পথে কিছু ভ্রমণ থাকে যা শুধু স্থান বদলের নয়— আত্মার পরিবর্তনের। আমার এবারের কানাডা সফর ছিল অনেকটা তেমনই।
 আমার মূল অবস্থান ছিলো রাজধানী অটোয়ায় আমার স্নেহের ছোট বোনের বাসায়। তিনমাস দশ দিনের এ আনন্দময় ভ্রমণে আমার সার্বক্ষনিক সহচর ছিলো আমার প্রিয় ভগ্নিপতি মোহাম্মদ ইকবাল, যে ছোট বোনের স্বামী হলেও অনেকটা বন্ধুর মত । ছায়ার মত আমার সাথে লেগে থাকত বলে সমস্যা একটা ছিলো এই যে, আমি পকেট থেকে কোন টাকা পয়সা বের করতে পারতাম না । তার মতে, বোনের কাছে বেড়াতে এসেছি, আমি রিটায়ার্ড মানুষ, আমার কোন ইনকাম নেই,তাই কোন খরচের দায়িত্ব আমার নয় ।  এ এক দিল দরিয়া লোক,জীবনে আমি দ্বিতীয়টি দেখেনি।  সারাক্ষণ মহান আল্লাহর কাছে তাদের মঙ্গল কামনা করি । 
প্রসঙ্গত: আমার ৪র্থ এবং সর্ব কনিষ্ঠ বোনও থাকে কানাডার মন্ট্রিল শহরে । তারা অতি সম্প্রতি অটোয়া থেকে মন্ট্রিল শিফট করেছে বিধায় এখনও বাসা গুছিয়ে উঠতে পারেনি । তাই ওর বাসায় যাওয়া হলেও থাকার সুযোগ হয়ে উঠেনি ।তবে ও দুইবার এসে আমার সাথে এক সপ্তাহ করে কাটিয়ে গেছে ।
প্রসঙ্গে ফিরা যাক । 
এবারের ভ্রমণের মূল আকর্ষণ ছিলো অটোয়া থেকে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার বিমান ভ্রমণে প্রায় পাঁচ হাজার কিলো মিটার দূরত্বে (অনেকটা ঢাকা থেকে জেদ্দার দূরত্ব) অবস্থিত কানাডার সৌন্দর্যের ঘাটি ভ্যাঙ্কুভার (Vancouver) ভ্রমণ।এমন এক স্থানে এক রঙিন যাত্রা যেখানে সভ্যতা ও প্রকৃতির সুরেলা মেলবন্ধন রচিত হয়েছে । স্ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার এই মায়াবী শহরটি কানাডার সবচেয়ে প্রাণবন্ত নগরী, যেখানে পাহাড়, সমুদ্র আর নগরজীবন পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে চলেছে ।
ভ্যাঙ্কুভার,যেন প্রকৃতির কবিতার নাম। যেখানে আকাশ নীল, সাগর সোনালি, আর পাহাড় সবুজের চাদরে মোড়া;
যেখানে সকাল শুরু হয় কুয়াশার পর্দা সরিয়ে, আর সন্ধ্যা নামে সূর্যের রঙিন আঁচড়ে—
এক অনুপম নৈসর্গিক সুরে,
যা হৃদয়ের তারে বাজে নীরবে।
ভ্যাঙ্কুভারের সৌন্দর্য যেন এক জীবন্ত চিত্রকর্ম।
একদিকে উঁচু স্কাইস্ক্র্যাপার, অন্যদিকে তুষারঢাকা পাহাড়—
দুইয়ের মাঝে নীল সমুদ্র যেন আয়না হয়ে দাঁড়িয়ে আছে,
প্রকৃতি আর আধুনিকতার মিলনের সাক্ষী।
ভ্রমণকৃত স্থান সমূহের ঝলক (ছিটে ফোঁটা) বর্ণনা :
Mont-Tremblant — আকাশ ছোঁয়া নীরবতা ।Quebec প্রদেশে অবস্থিত বিশ্ববিখ্যাত একটি স্কি রিসোর্ট ও পার্বত্য শহর। শীতের বরফ, গ্রীষ্মের সবুজ— দুই ঋতুতেই এটি অপূর্ব সুন্দর।কেবল (Cable)রাইডে উঠছিলাম ধীরে ধীরে। নীচে পাইনবনে ছায়া, দূরে নীল লেক, আর মাথার ওপর সাদা মেঘ— মনে হচ্ছিল পৃথিবী নয়, কোনো স্বপ্নরাজ্যে যাচ্ছি।চূড়ায় পৌঁছে যখন চারদিকে তাকালাম, মনে হলো প্রকৃতি তার সমস্ত প্রশান্তি দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরেছে।

Quebec City — ইতিহাসের কবিতায় মোড়া এক নগরী,
 কানাডার প্রাচীনতম শহর, ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান। পুরনো দুর্গ, পাথরের রাস্তা, নদীতীরের ঝলমলে দৃশ্য— শহরটি যেন এক জীবন্ত রূপকথা।পুরনো শহরের সরু গলিতে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, আমি যেন ইউরোপের কোনো রাজপথে হারিয়ে গেছি। 

High Water Falls — প্রকৃতির এক গর্জনময় শিল্পকর্ম, যেখানে শক্তি আর সৌন্দর্য একসাথে নৃত্য করে! দূর থেকে শোনা যায় তার বজ্রনিনাদের মতো গর্জন, যেন পাহাড়ের বুক ফুঁড়ে বেরিয়ে আসছে পৃথিবীর প্রাণস্পন্দন। অসংখ্য ঝর্নাধারা মিলেমিশে তৈরি করেছে এক অনন্ত স্রোতের সংগীত, যার প্রতিটি বিন্দুতে লুকিয়ে আছে জীবন, ছন্দ, আর চিরন্তন গতি।আকাশ ছুঁয়ে নিচে নেমে আসা অগনিত জলধারা পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা খাওয়ার ফলে তৈরি হওয়া বাষ্প বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে তৈরী করে সাদা কুয়াশার পর্দা— যেন প্রকৃতির নিজস্ব পর্দা, যেখানে সূর্যের আলো এসে আঁকে এক রঙিন স্বপ্নচিত্র। সেই কুয়াশায় জন্ম নেয় রঙধনু, এক ক্ষণস্থায়ী অথচ অবিনশ্বর অলৌকিকতা, যা মনে করিয়ে দেয়— সৌন্দর্য কখনও স্থির নয়, সে চিরচলমান, চিররূপান্তরিত।

High Water Falls -কেবল একটি জলপ্রপাত নয়; এটি প্রকৃতির হৃদস্পন্দনের প্রতিধ্বনি, যেখানে প্রতিটি জলের কণা বলে যায় এক অনন্ত গল্প— সৃষ্টির, ধ্বংসের, আর পুনর্জন্মের।

 Stanley Park -কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া প্রদেশের ভ্যাঙ্কুভার শহরের হৃদয়ে অবস্থিত এক বিস্তৃত, মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক উদ্যান। এটি উত্তর আমেরিকার অন্যতম বিখ্যাত শহুরে পার্ক— প্রায় ১,০০০ একর জুড়ে বিস্তৃত সবুজ বন, সমুদ্রতট, হ্রদ, বাগান, ও পথঘাটে ভরা ফুলেল চরাচর ।এটি কানাডার প্রথম ও সবচেয়ে প্রাচীন পাবলিক পার্কগুলির একটি।
 Stanley Park ঘেরা রয়েছে ঘন গাছ পালায় যেগুলি মধ্যে কিছু আছে শতাব্দী প্রাচীন। পার্কের মধ্যে রয়েছে মনোরম আর বিখ্যাত Seawall Walk— সমুদ্রের ধারে প্রায় ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ হাঁটার ও সাইক্লিংয়ের পথ, যা থেকে দেখা যায় পাহাড়, শহর ও প্রশান্ত মহাসাগরের অসাধারণ দৃশ্য।
 প্রাণ ও সংস্কৃতি:
পার্কে রয়েছে ফুলে ভরা বাগান, বসন্তে এখানে চেরি ব্লসম ফুটে ওঠে, আর শরতে পাতার রঙ বদলে যায় এক ক্যানভাসে পরিণত হয়ে।
 Stanley Park কেবল একটি পার্ক নয়, এটি ভ্যাঙ্কুভারের আত্মা— শহরের কোলাহলের ভেতরেও এক নিস্তব্ধ প্রকৃতির আশ্রয়। এখানে হাঁটলে মনে হয়, নগরের ভেতরেই যেন প্রবাহিত হচ্ছে বনের, সমুদ্রের, আর বাতাসের মিলিত কবিতা।
Stanley Park-এর সবুজ আর ফুলে ফুলে ঢাকা পথে হাঁটছিলাম এক সোনালি বিকেলে। বাতাসে মিশে ছিল পাইনগাছের গন্ধ আর দূরের সাগরের লবণাক্ত ছোঁয়া। পায়ের নিচে মচমচে পাতার শব্দ যেন এক নীরব সুর বাজাচ্ছিল, আর গাছের ফাঁক দিয়ে জমিনে পড়া ফোঁটা ফোঁটা সূর্যালোক তৈরি করছিল ছায়ার নকশা— প্রকৃতির নিজের আঁকা এক জীবন্ত চিত্রপট।
দূরে, জলের বুকে ভেসে উঠল এক সি-প্লেন। নদীর আয়নায় তার প্রতিচ্ছবি দুলে উঠল, তারপর হঠাৎ ডানায় আলো লেগে সে উড়ে গেল নীল আকাশের কোলে— যেন পাখির মতো মুক্ত, কিংবা স্বপ্নের মতো অদৃশ্য। জলের বুকে ছোট ছোট ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল, যেন তার বিদায়ের স্মৃতি ধরে রাখার চেষ্টা করছে নদী।
চারপাশের নীরবতার ভেতরেও ছিল এক অদ্ভুত সঙ্গীত— গাঙচিলের ডাক, পাতার ফিসফিস, আর দূরের তরঙ্গের মৃদু গর্জন। সেই মুহূর্তে মনে হল, সময় থেমে গেছে— আমি, প্রকৃতি, আর সেই উড়ে যাওয়া সি-প্লেন— তিনজনই এক নিঃশব্দ কবিতার অংশ, যেখানে প্রতিটি নিঃশ্বাসই এক ছন্দ, প্রতিটি দৃষ্টি এক স্বপ্ন।

Canada Place - Vancouver শহরের হৃদয়ে, Burrard Inlet-এর তীরে দাঁড়িয়ে আছে কানাডার অন্যতম প্রতীক Canada Place.  ভ্যাঙ্কুভার শহরের অন্যতম প্রতীকী নিদর্শন— সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা এক স্থাপত্যকলা ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন। দূর থেকে এর সাদা “পালতোলা” ছাদের নকশা একে অনন্য করে তুলেছে ।
এই স্থাপনাটি এখন ভ্যাঙ্কুভারের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। এখানে রয়েছে cruise ship terminal, যেখান থেকে আলাস্কা যাওয়া ক্রুজ জাহাজগুলি যাত্রা শুরু করে।
দিনে সূর্যের আলোয় আর রাতে আলোকসজ্জায় Canada Place ঝলমল করে ওঠে— যেন ভ্যাঙ্কুভারের সমুদ্রবুকে ভাসমান এক স্বপ্নের জাহাজ।
সাদা পাল-আকৃতির ছাদ দেখে মনে হয়, যেন সমুদ্রের বুকে ভেসে থাকা এক বিশাল জাহাজ। ১৯৮৬ সালের World Expo উপলক্ষে নির্মিত এই স্থান এখন শহরের গর্ব— যেখানে ভোরে সূর্যের আলো ছুঁয়ে যায় পালগুলোকে, আর রাতে আলোয় ঝলমল করে ওঠে পুরো তটরেখা।

Canada Place শুধু একটি স্থাপনা নয়— এটি ভ্যাঙ্কুভারের মুখচ্ছবি, আতিথ্যের প্রতীক, আর জলের বুকে লেখা এক চিরন্তন কবিতা।
দিনে সূর্যের আলোয় জলের ওপর ঝিকমিক করে প্রতিফলন,
আর সন্ধ্যায় রঙিন আলোয় জেগে ওঠে গোটা পরিবেশ 
আকাশ, জল আর স্থাপত্য মিলে যেন এক অদ্ভুত সঙ্গীত সৃষ্টি করে।
সেই মুহূর্তে মনে হয় যেন 
Vancouver নীরবে ফিসফিসিয়ে বলছে—
“স্থিরতা নয়, গতিই জীবনের ভাষা;
আর সেই গতির মধ্যেই লুকিয়ে আছে সৌন্দর্যের চিরন্তন অর্থ।”

Harrison Hot Springs — উষ্ণতার নিঃশব্দ প্রশান্তি।
Fraser Valley অঞ্চলে অবস্থিত উষ্ণ প্রস্রবণের শহর, যা আরাম ও নীরবতার এক আশ্রয়স্থল।চারপাশে পাহাড়, আকাশ নীল, বাতাসে প্রশান্তি। মনে হচ্ছিল, সময় থেমে গেছে। প্রকৃতি যেন বলছে— “কিছুক্ষণ থেমে যাও, নিজেকে শোনো।”

Cultus Lake — সন্ধ্যার নীল প্রশান্তি ।Chilliwack অঞ্চলের এক জনপ্রিয় লেক। সাঁতার, নৌকা, ক্যাম্পিং— সব মিলিয়ে এটি এক শান্ত আনন্দভূমি।সন্ধ্যায় সূর্য যখন ডুবে যাচ্ছিল, লেকের জলে তার প্রতিফলনে রঙ বদলাচ্ছিল— সোনালি থেকে কমলা, কমলা থেকে রক্তিম। দূরে হাসির শব্দ, পাশে ঢেউয়ের ছন্দ— সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, জীবনের আনন্দ আসলে কত সহজ লভ্য ।

White Rock — সাগরপাড়ের নিস্তব্ধতা।Vancouver-এর কাছেই এই ছোট শহরটি, বিখ্যাত এর বিশাল সাদা শিলাখণ্ড।প্রশান্ত মহাসাগরের কোলে এর ঘাটি ।সূর্যাস্তের সময় White Rock-এর বালুকাবেলায় দাঁড়িয়েছিলাম। সামনে প্রশান্ত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ জলরাশি । প্রশান্ত মহাসাগরের সৌন্দর্য বর্ণনা করতে গেলে, শব্দের ভান্ডার যেন অপ্রতুল হয়ে পড়ে; তার বিশালতা ও শান্ত রূপকে ধারণ করার ক্ষমতা ভাষার বাইরে।
এর নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে তার প্রকৃত সত্তা। অপরিসীম বিস্তৃত সেই নীল জলরাশি যেন পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে থাকা শান্তির এক অনন্ত প্রতীক। সূর্য ওঠার সাথে সাথে যখন সোনালি আলো তার ঢেউয়ের গায়ে খেলে যায়, তখন মনে হয়, আকাশ আর সমুদ্র মিলে গেছে এক রঙিন সীমানায়।

দুপুরে তার রূপ অন্যরকম— ঝলমলে নীল, চোখ জুড়ানো শান্ত। কিন্তু সন্ধ্যায় যখন সূর্য ধীরে ধীরে অস্ত যায়, সমুদ্রের বুক রাঙিয়ে তোলে আগুনে কমলা আর বেগুনি আলোয়, তখন মনে হয় প্রকৃতি যেন নিজেই এক কবিতা লিখছে রঙের ভাষায়।

প্রশান্ত মহাসাগরের বাতাসে আছে এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতা— কখনও লবণাক্ত জলের ঘ্রাণে জেগে ওঠে সমুদ্রের প্রাণ, কখনও সেই বাতাসে মিশে থাকে মুক্ত আকাশের আহ্বান, যা মনকে করে দেয় অদ্ভুতভাবে হালকা ও মুক্ত।

 তার ঢেউয়ের শব্দ এক অবিরাম সংগীত, যা মনে করিয়ে দেয় জীবনের চলমানতা, উত্থান-পতনের ছন্দ।

এই মহাসাগর শুধু জল নয়, এটি এক আত্মার প্রতিচ্ছবি— গভীর, রহস্যময়, অথচ অসীমভাবে শান্ত ও সুন্দর। আকাশ লাল হয়ে উঠেছে, জলে পড়েছে প্রতিচ্ছবি। মনে হলো, প্রকৃতি আজ নিজেই ধ্যান করছে নিজের সৌন্দর্যে।

Whistler — বরফে লেখা রোমাঞ্চ। বিশ্ববিখ্যাত স্কি রিসোর্ট টাউন, যেখানে বরফ ও পাহাড় একে অপরের পরিপূরক। চারপাশে সাদা রূপালি জগত। বাতাস কানে ফিসফিস করে বলছিল, “জীবন থেমে থাকলে নয়, বয়ে গেলে তবেই সুন্দর।”

Victoria —রঙের স্বপ্নরাজ্য ।
British Columbia-র রাজধানী, স্বপ্নের শহর, সমুদ্রের কোলে এক পরীর রাজ্য।
শহরে পৌঁছেই মনে হলো, আমি যেন বাস্তবের সীমা পেরিয়ে এক অলৌকিক জগতে এসে পড়েছি।
রাস্তার দু’ধারে ঝুলছে রঙিন ফুলের ঝাঁপি, হাওয়ায় ভেসে আসছে ল্যাভেন্ডারের গন্ধ,
আর দূরে, Parliament ভবনের গম্বুজগুলো সোনালি আলোয় ঝলমল করছে—
যেন প্রাচীন কোনো প্রাসাদ, এখনও জেগে আছে সময়ের প্রহর গুনে।
Victoria তখন কেবল একটি শহর নয়, এক অনুভূতি—
এক নরম বিকেলের আলোয় মিশে থাকা সৌন্দর্যের পরম প্রকাশ ।
নদীর ধারে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম—
নীলজল কেটে উঠছে নামছে যাত্রীবাহী সি-প্লেন,তার ডানায় সূর্যের আলো ঝিলিক দিচ্ছে,
আর নিচে তরঙ্গের বুকে পড়ছে তার ছায়া,যেন আকাশ ও জল মিলে খেলছে এক চিরন্তন খেলা।
দৃশ্যটি শুধু মুগ্ধকর নয়,
একটা অদ্ভুত রোমাঞ্চও ছড়িয়ে দিল বুকের ভেতর—
যেন কোনো অচেনা দেশে প্রথমবার নিজের স্বপ্নকে ছুঁয়ে ফেললাম।

White Rock — সাগরপাড়ের নিস্তব্ধ স্বপ্ন।Vancouver-এর একেবারে কাছে, ছোট্ট এই শহর যেন শান্তির এক আশ্রয়।
বিখ্যাত তার সেই বিশাল সাদা শিলাখণ্ড—
যেন সাগরের বুকে ধ্যানমগ্ন কোনো ঋষি, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নীরবে তাকিয়ে আছে অনন্ত জলে।
প্রশান্ত মহাসাগরের কোলে এ শহরের ঘরবসতি,
আর আমি দাঁড়িয়ে আছি White Rock-এর বালুকাবেলায়,
যখন সূর্যাস্তের আগুনে আকাশ রঙিন হয়ে উঠছে।
রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়েছে তরঙ্গের বুক জুড়ে—
জল আর আকাশ মিলেমিশে গেছে এক অপার্থিব রঙে।
এই নিস্তব্ধতা, এই আলোছায়ার খেলা, মনে হয় সময়ও এখানে থেমে গেছে, শুধু সাগরের ঢেউ গুনগুন করে বলছে—
“ফিরে এসো, আবার এসো…”

Butchart Garden — এক স্বপ্নিল ফুলের জগৎ, ফুলের রঙ, সুবাস, আলো— যেন রঙের, গন্ধের ও সৌন্দর্যের মিলনমেলা - সব মিলিয়ে এক স্বপ্নরাজ্য। রাতে যখন আলো জ্বলে ওঠে, তখন মনে হয়, আকাশের নক্ষত্রগুলো নেমে এসেছে ফুল হয়ে।
এমন এক বাগান, যেখানে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশের ফুল যেন নিজেদের সৌন্দর্য নিয়ে একত্রিত হয়েছে,
এক বিশাল ক্যানভাসে প্রকৃতি নিজে তুলির আঁচড় দিয়েছে অসংখ্য রঙে।
বাগানের প্রতিটি পথে, প্রতিটি বাঁকে নতুন বিস্ময়—
কোথাও টিউলিপের সারি বাতাসে দুলছে, হাজার রঙ এর গোলাপের মিষ্টি সুবাসে ভরে উঠেছে সকাল।নানা বর্ণের, নানা জাতের, নানান সৌরভের, নানা আকারের বিস্ময়কর সব পুস্প প্রস্ফুটিত হয়ে মৌ মৌ সৌরভ ছড়িয়ে পুরো এলাকাটিকে মতোয়ারা করে তুলেছে ।
মনে মনে খুঁজছিলাম এবং 
এক সময় এক ক্ষুদ্র জলাশয়ের ধারে আবিষ্কার ও করে ফেললাম 
আমার দেশের প্রিয় শাপলা ফুল !
সেই পরিচিত সাদা পাপড়ি, সবুজ পাতার কোলে নিঃশব্দে ফুটে আছে বিদেশের মাটিতে।
মুহূর্তেই মনে হলো, প্রবাসের মাঝেও যেন একটু বাংলাদেশকে ছুঁয়ে ফেললাম।
হৃদয়ের গভীরে বয়ে গেল এক অচেনা আনন্দস্রোত—
নির্মল, স্নিগ্ধ, আর একটু নস্টালজিকও বটে।
কিন্তু বিস্ময় এখানেই শেষ নয়।
এই বাগানে যত দেশের ফুল ফুটেছে, তত দেশের পতাকাও সাজানো রয়েছে পরিপাটি করে।
রঙিন পতাকার সারির মধ্যে যখন খুঁজে পেলাম লাল-সবুজের পতাকা,
তার মৃদু পতপত নড়ায় যেন কানে ভেসে এল— “চির উন্নত মম শির, শির নেহারি আমারি নত শির….”
সেই মুহূর্তে Butchart Garden কেবল একটি বাগান নয়,
হয়ে উঠল বিশ্বের বুকে ঐক্যের, সৌন্দর্যের এবং গর্বের এক প্রতীক।
ফুলের রঙ,পাতার নড়াচড়া, বাতাসের মৃদু গুঞ্জন, আলোর খেলা, আর প্রকৃতির অফুরন্ত মায়া ভরা এই বাগান সম্পূর্ণ ঘুরে দেখতে সময় লাগে প্রায় দুই দিন—ততটা সময় না হোক,কয়েক ঘণ্টা সময় কাটলেই মনে হয়, মানুষ নয়, এখানে প্রকৃতি নিজেই কথা বলে—
কানাডার রঙিন রাজধানী অটোয়া ।অটোয়া সম্পর্কে প্রায় সবারই জানা, বিস্তারিত বর্ণনা নিষ্প্রয়োজন। অটোয়া — কানাডার নবীন অথচ গর্বিত রাজধানী। সাম্প্রতিক সময়ে গড়ে ওঠা এই শহরটি যেন আধুনিকতা আর প্রকৃতির নিখুঁত সমন্বয়। যদিও পুরোপুরি নির্মিত এখনো হয়ে ওঠেনি, তবুও এর প্রতিটি রাস্তাঘাট, ভবন ও সেতুর নকশায় ফুটে উঠেছে পরিকল্পিত সৌন্দর্য আর নতুন যুগের স্থাপত্যশৈলীর রুচিশীল ছাপ। শহরের কেন্দ্রভাগ জুড়ে উঁচু কাচের অট্টালিকা, আধুনিক সরকারি ভবন, আর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাস্তায় প্রতিফলিত হয় এক উদীয়মান রাজধানীর স্পন্দন।
কিন্তু down town এর সীমানা ছাড়িয়ে গেলেই চিত্রটা বদলে যায়। দূরদূরান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত প্রান্তর যেন সযত্নে বিছানো সবুজ গালিচায় মোড়ানো— গ্রীষ্মে সেই সবুজে দোলে হাওয়া, শরতে বদলে যায় সোনালি-লাল রঙের মায়ায়। নদী আর ছোট ছোট লেকের ধার ঘেঁষে গড়ে উঠেছে পার্ক ও পথ, যেখানে নাগরিক জীবনের কোলাহলের মাঝেও শোনা যায় পাখির গান, বাতাসের মৃদু ফিসফিস।
অটোয়া যেন আধুনিক নগর আর প্রকৃতির নিস্তব্ধতার এক অনবদ্য বন্ধন— একদিকে প্রযুক্তির আলো, অন্যদিকে প্রান্তরের শান্ত সবুজ ছায়া। এই শহর শুধু কানাডার রাজধানী নয়, এটি এক প্রতিশ্রুতি— এক উদীয়মান ভবিষ্যতের প্রতীক, যেখানে উন্নয়ন ও সৌন্দর্য হাতে হাত রেখে এগিয়ে চলেছে । এখানে কাটালাম দীর্ঘ সাড়ে তিন মাস । সময়টা ছিল গ্রীষ্মের শেষ থেকে শরতের শুরু— যখন গাছের প্রতিটি পাতা রঙিন হয়ে ওঠেছে,সবুজ থেকে হলুদ, হলুদ থেকে লাল— পুরো শহর যেন রঙের উৎসবে মেতেছে ।

দেখতে দেখতে ফুরিয়ে এল কানাডা র জন্য বরাদ্দকৃত সময়। এবার ফিরে যাবার পালা। মনে পড়ে— বর্ণিল Vancouver-এর উদ্দীপনা, সৌন্দর্য আর মায়া; নীল আকাশের নিচে সমুদ্র, পাহাড় আর আলো-ছায়ার খেলা। সেইসব মুহূর্ত গুলি এখন আমার হৃদয়ের ক্যানভাসে চিরস্থায়ী রঙে আঁকা এক গুচ্ছ স্মৃতি ।
১১২ দিনের এই সফর ছিল শুধু ভ্রমণ নয়— ছিল আত্মার এক পরিক্রমা, যেখানে প্রতিটি শহর, প্রতিটি মুহূর্ত আমাকে শিখিয়েছে নতুন করে দেখা, অনুভব করা, আর জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া।
৪ অক্টোবর Air Canada এর লন্ডন গামী ফিরতি ফ্লাইটে চড়ে বসলাম।  লন্ডনে আমার মেঝ মেয়ের সাথে এক মাস কাটানোর ছক কাটা আছে । বিমানের জানালা দিয়ে অটোয়ার summer এর হরেক রঙে রঞ্জিত ভূখণ্ড যখন ছোট হতে লাগল, মনে হচ্ছিল— আমি কিছু হারাচ্ছি না, বরং কিছু রেখে যাচ্ছি ওখানে । সৌন্দর্যের টুকরো, প্রশান্তির স্মৃতি, আর কৃতজ্ঞতার অনুভব। 

আলহামদুলিল্লাহ! এই যাত্রা থাকবে আমার জীবনের পাতায় চিরকাল— এক দীপ্ত স্মৃতি হয়ে, এক কবিতার মতো। বর্ননার সাথে ছবির মিল খোঁজা যায়।

লেখক : সাবেক কন্ট্রোলার জেনারেল অব একাউন্টস (সিজিএ)।