Cvoice24.com

অদম্য কলম ও দ্রোহের কারিগর : কথাশিল্পী শওকত ওসমানের জীবনদর্শন ও প্রাসঙ্গিকতা

লিখেছেন : অধ্যাপক ডক্টর দিপু সিদ্দিকী
২০:২৩, ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫
অদম্য কলম ও দ্রোহের কারিগর : কথাশিল্পী শওকত ওসমানের জীবনদর্শন ও প্রাসঙ্গিকতা

২০২৬ সালের ২ জানুয়ারি আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান পুরুষ, সমাজ-বিপ্লবী এবং আজীবন দ্রোহী চেতনার ধারক কথাশিল্পী শওকত ওসমানের ১০৯তম জন্মবার্ষিকী। তিনি কেবল শব্দ দিয়ে গল্প বুনতেন না, বরং শব্দের আঁচড়ে সমকালীন অন্যায় ও শাসকের রক্তচক্ষুকে বিদ্ধ করতেন। শওকত ওসমান এমন এক বিরল ব্যক্তিত্ব, যিনি সাহিত্যের আঙিনায় চিরকালই ফ্যাসিবাদ এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এক অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে দণ্ডায়মান ছিলেন। আজ এই বিশেষ দিনে তাঁকে স্মরণ করা মানেই হলো— সত্য, ন্যায় এবং মানবিক মূল্যবোধের চর্চাকে পুনরুজ্জীবিত করা। শওকত ওসমান স্মৃতি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আমি মনে করি, বর্তমান প্রজন্মের কাছে তাঁর জীবনদর্শন পৌঁছে দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

শওকত ওসমানের সাহিত্যের মূল চালিকাশক্তি ছিল প্রতিবাদ। তিনি বিশ্বাস করতেন, শাসকের শোষণ যখন চরম আকার ধারণ করে, তখন জনগণের নীরবতা সেই জুলুমের মাত্রাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তাই তিনি কখনোই নীরবতাকে বেছে নেননি। তাঁর কাছে সাহিত্য ছিল এক রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা। তিনি মনে করতেন, সমাজ যখন পচে যায়, তখন সাহিত্যিকের কলমকে হতে হয় শল্যবিদের ছুরির মতো ধারালো। শাসকের প্রতিটি অন্যায়কে তিনি সাহসের সঙ্গে প্রশ্নবিদ্ধ করতেন এবং ক্ষমতাধরদের সরাসরি সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাতেন। এই নির্ভীকতা তাঁকে বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য উচ্চতা দান করেছে। তিনি নিছক বিনোদনধর্মী কোনো রচনায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং প্রতিটি অক্ষরের আড়ালে সমাজ পরিবর্তনের একটি করে বীজ বুনে গেছেন।

হাস্যরস ও স্যাটায়ার ছিল শওকত ওসমানের প্রতিবাদের প্রধান অস্ত্র। তিনি জানতেন, সরাসরি আক্রমণের চেয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক উপহাস স্বৈরশাসকের ভিতকে বেশি নাড়িয়ে দিতে পারে। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘ক্রীতদাসের হাসি’ উপন্যাসে তিনি বাগদাদের খলিফা হারুনুর রশীদের কাহিনির আড়ালে সমকালীন আইয়ুব খানের সামরিক জান্তাকে যে সূক্ষ্ম অথচ তীব্র চড় মেরেছিলেন, তা বিশ্বসাহিত্যে এক অনন্য নজির। এই উপন্যাসের মাধ্যমে তিনি বিশ্বকে দেখিয়েছেন যে, মানুষের শারীরিক সত্তাকে বন্দী করা গেলেও তার ভেতরের অদম্য হাসিকে— যা স্বাধীনতার প্রতীক— কখনো শিকল পরানো সম্ভব নয়। শওকত ওসমান মনে করতেন, হাস্যরসের মাধ্যমে মানুষকে যে চেতনায় জাগ্রত করা যায়, তা অনেক সময় গুরুগম্ভীর আলোচনায় সম্ভব হয় না। তাঁর ব্যঙ্গাত্মক রচনাগুলো ছিল মূলত ঘুমন্ত বিবেককে জাগিয়ে তোলার এক একটি নকিব।

শওকত ওসমানের লেখনীর আরেকটি উজ্জ্বল দিক হলো তাঁর প্রখর বিজ্ঞানমনস্কতা ও আধুনিকতা। তিনি কুসংস্কারমুক্ত একটি নতুন সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখতেন। ধর্মের অপব্যাখ্যা, সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প এবং মধ্যযুগীয় বর্বরতার বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল অত্যন্ত কঠোর। তিনি চাইতেন বাংলার মানুষ যেন যুক্তিবাদী চিন্তায় শিক্ষিত হয়। তাঁর সাহিত্যে বারবার উঠে এসেছে মানবতার জয়গান। তিনি মনে করতেন, কুসংস্কার কেবল মানুষকে অন্ধই করে না, বরং শোষকের হাতকে শক্তিশালী করে। তাই তাঁর ‘জননী’ থেকে শুরু করে ‘বনী আদম’ পর্যন্ত প্রতিটি রচনায় আমরা দেখি সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার ও মানবিক মর্যাদার লড়াই। তিনি কেবল সমস্যার কথা বলেই ক্ষান্ত হননি, বরং উত্তরণের পথ হিসেবে আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক চেতনার কথা বলেছেন।

ব্যক্তিজীবনেও শওকত ওসমান ছিলেন এক বিপ্লবী সত্তা। ১৯১৭ সালে জন্ম নেওয়া এই মহান শিল্পী ১৯৪৭-এর দেশভাগ, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি পর্যায়ে ছিলেন সক্রিয়। একাত্তরে তিনি কেবল একজন শরণার্থী লেখক ছিলেন না, বরং যুদ্ধের ময়দানে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের মানসিক শক্তি জুগিয়েছেন। স্বাধীন বাংলাদেশেও যখনই গণতন্ত্রের সংকট এসেছে কিংবা অসাম্প্রদায়িক চেতনা আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, তখনই শওকত ওসমান কলম ধরেছেন। তিনি মনে করতেন, একজন লেখকের প্রকৃত পুরস্কার কোনো পদক বা উপাধি নয়, বরং শোষিত মানুষের হৃদয়ে তাঁর স্থান করে নেওয়া।

আজ ১০৯তম জন্মবার্ষিকীতে আমাদের চারপাশে যখন নতুন করে নানারূপ বৈষম্য ও শোষণের কালো ছায়া দৃশ্যমান, তখন শওকত ওসমান আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন। তাঁর সাহিত্য আমাদের শেখায় যে, ক্ষমতার সামনে সত্য বলা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং তা একজন সচেতন মানুষের আবশ্যিক কর্তব্য। শওকত ওসমান স্মৃতি পরিষদের পক্ষ থেকে আমরা শপথ নেই—একটি বিজ্ঞানমনস্ক, অসাম্প্রদায়িক এবং মানবিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে আমরা তাঁর আদর্শকে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেব। শওকত ওসমানের জীবনদর্শন আমাদের শিক্ষা দেয় যে, ভয় নয়, বরং প্রশ্নই মুক্তির একমাত্র পথ।

শওকত ওসমান কোনো কালখণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকা কোনো লেখকের নাম নয়, তিনি একটি অবিনাশী চেতনার নাম। যতক্ষণ পৃথিবীতে একজন মানুষও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকবে, যতক্ষণ পর্যন্ত কলম শাসকের বিরুদ্ধে লড়বে, ততক্ষণ শওকত ওসমান বেঁচে থাকবেন আমাদের মিছিলে, আমাদের স্লোগানে এবং আমাদের প্রতিটি প্রতিবাদী হরফে। এই মহান কথাশিল্পীর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। জয় হোক মেহনতি মানুষের, জয় হোক শওকত ওসমানের চিরন্তন কলমের।

লেখক: অধ্যাপক ডক্টর দিপু সিদ্দিকী
ডিন, কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ
রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা।