বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থায় কৃষক কার্ড : প্রয়োজনীয়তা ও বাস্তবতা
আব্দুল্লাহ-আল-রায়হান (আলভী)
এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রতিশ্রুত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং ‘কৃষক কার্ড’ দেশব্যাপী ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ ও কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে। বিপরীতে বিরোধী পক্ষ এই কার্ডগুলোর বাস্তবতা, প্রয়োজনীয়তা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে এবং বিরুদ্ধ প্রচারণা চালাচ্ছে। আসুন আজকে আলোচনা করা যাক ‘কৃষক কার্ড’-এর বাস্তবতা ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই ছোট কিন্তু জনবহুল দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় কৃষি খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বর্তমান সময়ে এই খাত নানা ধরনের কাঠামোগত, পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে না পারলে টেকসই কৃষি উন্নয়ন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রথমত, আবাদি জমির ক্রমাগত হ্রাস বাংলাদেশের কৃষির অন্যতম বড় সমস্যা। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ন, শিল্পায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নের ফলে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কৃষিজমি অকৃষি খাতে রূপান্তরিত হচ্ছে। ফলে সীমিত জমিতে অধিক খাদ্য উৎপাদনের চাপ বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে কৃষির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব—অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, ঘনঘন বন্যা, খরা, নদীভাঙন এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার বিস্তার—ফসল উৎপাদনকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কৃষকের ঝুঁকি বেড়েছে এবং অনেক এলাকায় চাষাবাদ দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।
অন্যদিকে পানিসংকটে সেচের জন্য ব্যবহৃত বিদ্যুৎ ও ডিজেলের উচ্চমূল্য কৃষি উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও ন্যায্যমূল্যের অভাব কৃষকদের জন্য ‘মরার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সার, বীজ, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি ক্রমাগত বাড়লেও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের কারণে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না, যা কৃষকদের কৃষিতে নিরুৎসাহিত করছে।
এছাড়া বাজার ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ সুবিধার দুর্বলতা কৃষি খাতের আরেকটি বড় বাধা। পর্যাপ্ত কোল্ড স্টোরেজ, আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার অভাবে কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের বড় অংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব, কৃষিঋণ ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সীমাবদ্ধতা কৃষকদের উন্নয়নের আরেকটি প্রতিবন্ধকতা। অনেক প্রকৃত কৃষক সহজ শর্তে ঋণ পান না এবং জটিল প্রক্রিয়ার কারণে দালাল বা উচ্চ সুদের ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এতে কৃষকের আর্থিক ঝুঁকি বেড়ে যায়।
এসব সমস্যা মোকাবিলায় সমন্বিত নীতি, আধুনিক প্রযুক্তির বিস্তার, বাজার সংস্কার এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। তবেই কৃষি খাত দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও খাদ্যনিরাপত্তার ভিত্তি হিসেবে টেকসইভাবে এগিয়ে যেতে পারবে।
কৃষকদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং তাদের ন্যায্য সহায়তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিএনপি বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। এসবের মধ্যে অন্যতম হলো কৃষক কার্ডের ব্যবস্থা। এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের পরিচয় নিশ্চিত করে ভর্তুকি ও প্রণোদনা সরাসরি দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। তবে এই ব্যবস্থার যেমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপকারিতা রয়েছে, তেমনি কিছু সীমাবদ্ধতা ও অপকারিতাও বিদ্যমান।
কৃষক কার্ডের প্রধান উপকারিতা হলো—ভর্তুকি ও সরকারি সহায়তা সরাসরি কৃষকের হাতে পৌঁছানো। আগে সার, বীজ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণে ভর্তুকির বড় অংশ মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে চলে যেত। কৃষক কার্ড চালুর ফলে প্রকৃত কৃষকের ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে সরাসরি অর্থ পৌঁছে যাবে, ফলে দুর্নীতি ও অনিয়ম অনেকাংশে কমবে। এর মাধ্যমে সরকারের সহায়তা আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর হবে।
এই কার্ডের আরেকটি বড় সুবিধা হলো—প্রকৃত কৃষক শনাক্ত করা সহজ হওয়া। কৃষক কার্ডের তথ্যভাণ্ডারে কৃষকের নাম, জমির পরিমাণ ও চাষাবাদের ধরন সংরক্ষিত থাকে। ফলে কে প্রকৃত কৃষক আর কে নন—তা নির্ধারণ সহজ হয়। এতে করে ভুয়া তালিকা কমে এবং সরকারি সুবিধা সঠিক ব্যক্তির কাছে পৌঁছায়। একই সঙ্গে এই তথ্য সরকারের কৃষিনীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কৃষক কার্ড ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষি খাতকে ধীরে ধীরে ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনা সম্ভব হবে। অনেক কৃষক প্রথমবারের মতো ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হবেন। ভবিষ্যতে এই কার্ড ব্যবহার করে সহজ কৃষিঋণ, ফসল বীমা ও আধুনিক কৃষি সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে কৃষকের আর্থিক সক্ষমতা বাড়বে এবং কৃষি খাত আরও আধুনিক হবে।
তবে কৃষক কার্ড ব্যবস্থার কিছু অপকারিতা ও সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অনেক প্রকৃত কৃষক হয়েও কার্ড পান না। বিশেষ করে বর্গাচাষি ও ভূমিহীন কৃষকরা জমির কাগজ না থাকায় তালিকাভুক্ত হতে পারেন না। এছাড়া তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণে ভুল থাকলে কৃষকদের ভোগান্তি পোহাতে হয়। নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর বা জমির তথ্যের সামান্য ভুলের কারণে অনেক কৃষক ভর্তুকি বা প্রণোদনা পান না। এসব ভুল সংশোধনের প্রক্রিয়া অনেক সময় জটিল ও সময়সাপেক্ষ হয়ে পড়ে। গ্রামাঞ্চলে ব্যাংকিং সুবিধা সীমিত হওয়ায় অনেক কৃষক তাদের প্রাপ্য অর্থ তুলতে সমস্যায় পড়েন। বয়স্ক ও অশিক্ষিত কৃষকদের জন্য ডিজিটাল লেনদেন বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।
কৃষকদের সহায়তা প্রদানে স্বচ্ছতা, প্রকৃত কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করা, তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করা এবং মাঠপর্যায়ে কার্যকর তদারকি বাড়ানো গেলে এই উদ্যোগের সুফল পুরোপুরি পাওয়া সম্ভব।
তাই নিঃসন্দেহে বলা যায়, কৃষক কার্ড একটি যুগোপযোগী ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, নেপালসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কৃষকদের জন্য এ ধরনের সুবিধা রয়েছে। সুষ্ঠু বাস্তবায়নের মাধ্যমে কৃষক কার্ড বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থায় একটি শক্তিশালী পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠবে—এ প্রত্যাশা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী সকল মানুষের।

লেখক
জয়েন্ট সেক্রেটারি
ভয়েজ ফর চট্টগ্রাম।
কলম সব খবর















