গাউছে ভাণ্ডার শাহ্ কেবলার সংস্পর্শে দেখা কিছু স্মৃতি
লিখেছেন : আবুল মনছুর
মজজুবে ছালেক গাউছে ভাণ্ডার হজরত মওলানা মতিয়র রহমান শাহ (ক:) কেবলা কাবাকে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। আমার নানা জনাব ছগির আহম্মদ সাহেব, শাহ সাহেব কেবলার যে কয়জন কাছের ভক্ত ছিলেন তাঁদের মধ্যে তিনি অন্যতম। সে সূত্রে তাঁর মাধ্যমে বাবাজানের সংস্পর্শ পাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে এবং তাঁর দয়া পেয়েছি। তিনি এমন একজন আল্লাহর অলি যে একবারের জন্য তাঁর সংস্পর্শ বা দর্শন লাভ করেছেন, তিনি ধন্য ও দয়াপ্রাপ্ত হয়েছেন।
ছোটবেলা থেকেই প্রতিনিয়ত বাবাজানের নিকট আসা-যাওয়া করতাম। আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। পড়ালেখায় ভালো ছাত্র ছিলাম না। কিন্তু তিনি এমন দয়া করেছেন যে ছাত্রজীবনে কোনো পরীক্ষায় সেকেন্ড হইনি এবং ডিস্টিংশন নিয়ে পাস করি। চাকরি জীবনেও অতি সুনামের সঙ্গে অতিবাহিত করেছি।
তিনি ছিলেন ভদ্রতা ও বিনয়ের মূর্ত প্রতীক, ছিলেন আদবের সম্রাট। সবার সঙ্গে তিনি ‘আপনি’ সম্বোধন করে কথা বলতেন—এমনকি বাচ্চাদের সঙ্গেও। পাতার বিড়ি খেতেন। আমি পাতার বিড়ি ও ম্যাচ নিয়ে যেতাম। দর্শন হতেই তিনি জিজ্ঞেস করতেন, “কি বুদ্ধি?” উত্তরও তিনি দিতেন— ‘সু-বুদ্ধি।’ সুবুদ্ধি কী জিজ্ঞেস করলে তিনি বলতেন, ‘সুবুদ্ধিতে খোদা, সুবুদ্ধিতে রাসুল (দ.), সুবুদ্ধিতে কোরআন, সুবুদ্ধিতে ইসলাম, সুবুদ্ধিতে ঈমান, সুবুদ্ধিতে মানবতা।’
প্রায়ই দেখতাম পরনের লুঙ্গি খুলে হালদা নদীর পানিতে ডুবাতেন আর তুলতেন। তখন বিনা মেঘে অঝোর ধারায় বৃষ্টি নেমে আসত। তখন একটি শিশুও বুঝত যে এখন অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামবে। তিনি ঢোলবাদ্য খুব পছন্দ করতেন, কাওয়ালি শুনতেন।
তখন প্রতি বৃহস্পতিবার ঢোলবাদ্যের আসর বসত। সেমা মাহফিলে কিংবা ঢোলবাদ্য বাজানোর সময় মাঝে মাঝে শাহ সাহেব কেবলা ‘বাজাও, বাজাও’ বলে চিৎকার দিতেন।
আরেকটি ঘটনা—একদিন আমি মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ জিয়ারতে যাই। হজরত কেবলা সৈয়দ আহম্মদ উল্লাহ (ক:) আল মাইজভাণ্ডারী ও ইউসুফে সানি হজরত সৈয়দ গোলামুর রহমান শাহ (ক:) আল মাইজভাণ্ডারীর মাজার শরীফ জিয়ারত করে ফেরার সময় দেখলাম, গাউসিয়া আহমদিয়া মঞ্জিলের শাহ সাহেব কেবলা ও অছিয়ে গাউছুল আযম সৈয়দ দেলাওয়ার হোসাইন মাইজভাণ্ডারী চেয়ারে উপবিষ্ট। দেখি, অছিয়ে গাউছুল আযম শাহ সাহেব কেবলাকে মিষ্টি, শরবত ও অন্যান্য খাবার দিয়ে আপ্যায়ন করাচ্ছেন। আমি সামনে এগিয়ে গিয়ে উভয়ের পা মোবারক ছুঁয়ে সালাম করি এবং আসার সময় আছিয়ে সাহেব কেবলা মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
১৯৬৪ সালে তাঁর ওফাতের খবর পেয়ে ছুটে যাই। পরের দিন জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার নামাজে শরিক হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। তখন মাইক বা আধুনিক যোগাযোগের মাধ্যম না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে যে এত লোক জানাজার নামাজে শরিক হলো, কোথা থেকে আসলেন— এর উত্তর এখনও খুঁজে পাইনি। পরপর তিনবার জানাজা হয়। প্রধান জানাজার ইমাম ছিলেন আওলাদে গাউছে ভাণ্ডার, এককালের পরবর্তী আধ্যাত্মিক ফয়েজপ্রাপ্ত উত্তরসূরি হজরত শাহ সুফি মওলানা আবুল ফয়েজ শাহ (রহ:)।
তিনি প্রায়শ আমাদের বাড়িতে আসতেন। যার ঘরে একবার প্রবেশ করেছেন, তিনি ধন্য হয়েছেন। এমনকি বাড়ি গিয়েও মানুষকে দয়া করতেন। কোনো ভক্তকে কোনোদিন খালি হাতে ফেরাননি। আমার জানামতে তাঁর অসংখ্য কেরামত আছে, যা বলে শেষ করা যাবে না।
বাবাজানের জীবদ্দশায় যেভাবে মানুষকে অকাতরে দয়া বিতরণ করেছেন, ফয়েজপ্রাপ্ত হয়েছেন—এখনও একইভাবে তাঁর মাজার শরীফ থেকে দয়া পাচ্ছেন। সে জন্যই আমি ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম এলেই তাঁর মাজার শরীফে ছুটে যাই, আত্মার মধ্যে পরম শান্তি পাই।
লেখক : আবুল মনছুর, অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ।
কলম সব খবর















