Cvoice24.com

বাংলাদেশে মেডিকেল ট্যুরিজম: সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ

দাউদ আরমান
২০:২৬, ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫
বাংলাদেশে মেডিকেল ট্যুরিজম: সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ

বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত বিভ্রান্তি, দুশ্চিন্তা ও আতঙ্ক বহু পরিবারকে অসহায় করে তোলে। রোগীদের সঠিক তথ্য ও পরামর্শের অভাবে চিকিৎসার আগে ভুল সিদ্ধান্ত, সময় ও অর্থের অপচয় ঘটে। এমন বাস্তবতার মধ্যে মেডিকেল ট্যুরিজম বা আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যসেবা খাত দেশ ও রোগীর জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। ‘প্রাইম মিডিয়াকেয়ার’ আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যসেবা পরামর্শক হিসেবে গত পাঁচ বছর ধরে মানুষের সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে তাদের আলোর পথ দেখাতে কাজ করে যাচ্ছে। বন্দরনগরী চট্টগ্রামে মেডিকেল ভ্যালু ট্রাভেল কনসালট্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি বাংলাদেশ মেডিকেল ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশন (বিএমটিএ)-এর প্রেস সেক্রেটারি হিসেবে দেশের মেডিকেল ট্যুরিজম খাতে কাজ করার সুযোগ হয়েছে।

২০২১ সালে ‘প্রাইম মিডিয়াকেয়ার’ প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট—ভরসাহীন চিকিৎসা বিভ্রান্তির মধ্য থেকে রোগীকে বের করে এনে সঠিক চিকিৎসা গ্রহণে সহায়তা করা। প্রথম দিকে মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি করা সহজ ছিল না। অনেকেই প্রচলিত অনুমান বা শোনা তথ্যের ভিত্তিতে চিকিৎসা নেওয়ার চেষ্টা করতেন। কিন্তু প্রতিটি রোগীর ক্ষেত্রে আমি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সঙ্গে পরামর্শ করে একটি সম্পূর্ণ চিকিৎসা পরিকল্পনা প্রস্তুত করতাম এবং রোগীকে বিস্তারিত জানাতাম। এতে রোগী সচেতনভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

সময় যতো বাড়তে থাকে, রোগীরা আমার পরামর্শ অনুসরণ করে সুফল পেতে থাকেন এবং আস্থা ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে দেশের দূর-দূরান্ত থেকে রোগীরা পরামর্শ নিতে আসছেন। একই সঙ্গে তরুণরা মেডিকেল ভ্যালু ট্রাভেল ও মেডিকেল ট্যুরিজম খাতে ক্যারিয়ার গড়ার জন্য আগ্রহী হচ্ছে। তাদের এই আগ্রহ আমাকে সচেতন করেছে যে বাংলাদেশ এখনো বৈশ্বিক মেডিকেল ট্যুরিজম ইন্ডাস্ট্রিতে পিছিয়ে আছে।

২০২৪ সালের ক্রিসিল গ্লোবাল ইনসাইট রিপোর্ট অনুযায়ী, মালয়েশিয়া মেডিকেল ট্যুরিজম থেকে ৫,২৯০ কোটি টাকা আয় করেছে, থাইল্যান্ড ৪,৮১৭ কোটি টাকা, আর ভারত ১,১৫,৭৭৬ কোটি টাকা আয় করেছে। 

এই তথ্য স্পষ্টভাবে দেখায় স্বাস্থ্যসেবা শুধু সামাজিক খাত নয়, এটি রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির একটি শক্তিশালী রাজস্ব উৎস। অথচ বাংলাদেশ এই খাত থেকে মাত্র সীমিত আয় করছে। কারণ দেশের বিশ্বমানের হাসপাতালের সংখ্যা সীমিত, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি (যেমন JCI) নেই, ব্র্যান্ডিং ও লজিস্টিক সুবিধা দুর্বল এবং বিদেশি রোগী আকর্ষণে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেই। ফলে বাংলাদেশের রোগীরাই প্রতিবছর হাজার কোটি টাকা চিকিৎসার জন্য বিদেশে ব্যয় করছেন, যা দেশের অর্থনীতি থেকে বের হয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ মেডিকেল ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশন (বিএমটিএ) এই পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিদেশি হাসপাতালগুলো বিএমটিএর সঙ্গে কাজ করে বাংলাদেশে নিজেদের ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা করছে। একই সঙ্গে, বিএমটিএ দেশীয় হাসপাতালকে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যমান অর্জনে সহায়তা করছে এবং বিদেশি রোগী আনার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে। বিদেশি রোগী এলে শুধু হাসপাতাল নয়, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, পরিবহন, পর্যটন ও শপিং—সব খাতে অর্থপ্রবাহ বৃদ্ধি পায়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশে বিশ্বমানের চিকিৎসা সেবা গড়ে উঠলে দেশি রোগীদের বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন হবে না। এভাবে দেশের বাইরে চলে যাওয়া বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা দেশে থাকবে, স্বাস্থ্যসেবা উন্নত হবে, এবং বাংলাদেশ এই অঞ্চলের পরবর্তী মেডিকেল হাব হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে।

সুতরাং তরুণদের এটাই অবগত করা— সঠিক নীতি ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে চিকিৎসা গ্রহণের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে একটি কেন্দ্র বা মেডিকেল হাব হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। মেডিকেল ট্যুরিজমের মাধ্যমে দেশি রোগীরাই সঠিক চিকিৎসা পাবে, বৈদেশিক মুদ্রা দেশে থাকবে, এবং দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান বাড়বে। তরুণদের আগ্রহ ও উদ্যোগ এই খাতকে শক্তিশালী করে ভবিষ্যতে নেতৃত্ব দেবে এবং বাংলাদেশকে এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ মেডিকেল হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।


লেখক: সাংবাদিক